মেয়ের কাছে তার বাবার চিঠি(তৃতীয় খণ্ড)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
বার্ধক্য ও স্মৃতিভ্রংশের ভয়
প্রিয় মামনি,
আগের চিঠিতে আমি আমাদের দূরত্বের কথা বলেছিলাম। আজ বলব সময়ের কথা। সময় কাকে বলে, তা আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যখন আমার শরীর আমার কথা শোনেনি।
গত বছর, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি। মাঝরাতে হঠাৎ বুকে একটা চাপ অনুভূত হলো। মনে হলো কেউ যেন আমার বুকের হাড় দুটো চেপে ধরেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তুমি তখন চট্টগ্রামে, আমি ঢাকায় একা। প্রতিবেশী কামাল ভাই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। এভারকেয়ার হাসপাতালের সেই জরুরি বিভাগটা আজও আমার চোখের সামনে। সাদা দেয়াল, তীব্র নীল আলো, আর পাশের বেডে এক বৃদ্ধ লোকের আর্তনাদ। ডাক্তার বলেছিলেন, হার্টে ব্লকেজ। সেই মুহূর্তে আমার ভয় হয়নি, হয়েছিল একটা বিচ্ছি্রণ। ভাবলাম, যদি এখানেই শেষ হয়ে যায়, তবে তোমার কাছে কোনো কথাই থাকবে না। তোমাকে বলা হবে না যে, আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসতাম, আর কতটা অপরাধবোধ করতাম দূরে থাকার জন্য।
সেই রাতে ভাবলাম, আমাকে কিছু লিখে রাখতে হবে। কারণ বয়স আর শরীরের সাথে সাথে মনের পাল্লাও হালকা হয়ে যায়। আমার এখন হাঁটতে গেলেই শ্বাস উঠে আসে। গত মাসে যখন তুমি ঢাকায় এসেছিলে, তুমি দেখেছিলে আমি বারান্দা থেকে রান্নাঘরে যেতে তিনবার থামতে হয়েছিল। তুমি বলেছিলে, "আব্বু, ডাক্তার দেখাও।" আমি হেসে বলেছিলাম, "বার্ধক্য, মামনি, ওষুধে সারে না।" কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম এই ভেবে যে, আমি কি তোমার জন্য আর কাজের না?
আরেকটা কথা আছে, যা বলতে আমার খুব লজ্জা করছে। গত সপ্তাহে, একটা বিকেলে আমি বারান্দায় বসে ছিলাম। তোমার মায়ের কথা মনে করতে চেয়েছিলাম। তার নাম মনে ছিল, কিন্তু হঠাৎ তার মুখটা স্পষ্ট ভাবে মনে করতে পারলাম না। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, আমার মস্তিষ্কটা আমাকে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, মামনি। প্রথমবারের মতো মনে হলো—আমি সত্যিই বুড়ো হয়ে গেছি। পরে ভাবলাম, হয়তো ভুলে যাওয়াটাও জীবনের একটা অংশ। কিন্তু তোমাকে ভুলে যাওয়ার কথা ভাবলেই আমার বুক কেঁপে ওঠে।
জীবন খুব জটিল, মামনি। তুমি ছোটবেলায় ভাবতে, জীবন খুব সহজ—ভালো মানুষ হলেই হল। কিন্তু এখন বুঝি, ভালো থাকাটাই সবচেয়ে কঠিন। ঢাকায় একা থাকা সহজ নয়। এই নীরবতা কখনও কষ্ট দেয়, আবার কখনও শান্তিও দেয়। তুমি যখন ফোন করো, তখন এই নীরব ঘরটা যেন প্রাণ পায়।
আমি চাই, তুমি জীবনে ক্ষমা করতে শেখো। শুধু অন্যকে নয়, নিজেকেও। আমি তোমার মাকে ক্ষমা করেছি অনেক আগেই। কারণ আমি বুঝতে পেরেছিলাম, মানুষের সহ্য করার ক্ষমতারও একটা সীমা থাকে। তুমি যদি কখনও মনে করো, আমি ধীরে হাঁটছি বা ভুল করছি, তবে রাগ করো না। মনে রেখো, তুমি যখন ছোট ছিলে, তোমার অসংখ্য ভুল আমি হাসিমুখে মেনে নিয়েছি। এখন আমার পালা।
তোমার বিয়ের পর নতুন সংসারে মনে রেখো—জেতার চেয়ে টিকে থাকাটা বড় ব্যাপার। ঝগড়া হবে, কথা কাটাকাটি হবে। কিন্তু শেষে যেন দরজাটা খোলা থাকে। আমার মতো দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চলে যেও না।
আমার শেষ ইচ্ছে হলো, তুমি যেন কখনও ভুলে না যাও—আমি তোমার জন্য মন থেকে দোয়া করি। আর হ্যাঁ, তোমার মায়ের কথা যদি কখনও মনে করতে না পারি, তুমি আমাকে মনে করিয়ে দিও। কারণ তিনিও তোমাকে ভালোবাসতেন, শুধু তার ভালোবাসাটা ছিল একটু অন্যরকম—বেঁচে থাকার তাড়নায় হারিয়ে যাওয়া এক ভালোবাসা।
চলবে...
#তৃতীয়_খণ্ড #বাবা_মেয়ে #ছোটগল্প #বাংলা_সাহিত্য #ভালোবাসা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।