মেয়ের কাছে তার বাবার চিঠি (দ্বিতীয় খণ্ড)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
দূরত্ব আর অপেক্ষা
প্রিয় মামনি,
মা চলে যাওয়ার পর আমার জীবনের একটা বড় অংশ যেন ধসে পড়েছিল। তোমার বয়স তখন মাত্র ছয় মাস। আমি একজন বাবা হিসেবে, একজন মা হিসেবে—সব দায়িত্ব একা কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। কিন্তু মামনি, সত্যিটা হলো—আমি তখন ভেঙে পড়েছিলাম। চট্টগ্রামে আমার কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না। তোমাকে নিয়ে ঢাকায় যাওয়া অসম্ভব ছিল। তাই আমি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যা আজও আমাকে কুড়ে কুড়ে খায়। তোমাকে চট্টগ্রামে নানুর বাড়িতে রেখে আমি একা ঢাকায় চলে এসেছিলাম।
ঢাকার সেই প্রথম দিনগুলো ছিল এক দুঃস্বপ্নের মতো। মগবাজারের একটা ছোট মেস রুমে উঠেছিলাম। ঘরটা ছিল এতটাই ছোট যে, একদিকে শোয়ালে অন্যদিকে দরজা খোলা যেত না। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে আমি তোমার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। চট্টগ্রামে তুমি কি কাঁদছ? নাকি ঘুমিয়ে পড়েছ? নানু তোমাকে গল্প শোনাচ্ছেন তো? এই সব প্রশ্ন আমাকে ভেতর থেকে খেতো।
মাসে একবার যখন চট্টগ্রামে যেতাম, তোমাকে দেখে মনে হতো তুমি আমাকে চিনছ না। তোমার চোখে একটা অপরিচিত ভাটা। সেই অনুভূতিটা ছিল এমন—যেন আমি নিজের হৃদয়টা হারিয়ে ফেলেছি। আমি ঢাকায় ফিরে এসে রান্না শিখলাম। প্রথম দিনে ভাতটা একদম পুড়ে গিয়েছিল, ডালে লবণের পরিমাণ বেশি হয়ে গিয়েছিল। একা বসে সেই ভাত খেতে খেতে চোখের জল পড়ে যেত। কাপড় ধোয়া শিখলাম। বারান্দায় তোমার ছোট ছোট জামাটা শুকিয়ে রাখতাম। ওগুলোর রঙ দেখলেই তোমার গায়ের গন্ধ মনে পড়ত।
তুমি যখন "অ আ ক খ" শিখছিলে, তখন আমি ঢাকা থেকে চিঠি লিখে পাঠাতাম। তুমি নানুর কাছে সেই চিঠি পড়তে। একবার ফোনে তুমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলে—"আব্বু, আমি 'ক' লিখতে পারছি না, 'ব' হয়ে যাচ্ছে।" সেদিন অফিসের টয়লেটে গিয়ে আমি অনেকক্ষণ কাঁদি। আমি ধৈর্য হারাইনি, মামনি, কিন্তু নিজেকে অসহায় মনে হয়েছিল। আমি চাইতাম তোমার হাত ধরে পেন্সিলটা ধরিয়ে দিই, কিন্তু দূরত্বটা আমাকে সেই সুযোগ দেয়নি।
স্কুলে যাওয়া শুরু করলে প্রতি শুক্রবার বাসায় যেতাম। তুমি বড় হচ্ছিলে, তোমার কথায় একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছিল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করলে—"আমার কি মা নেই?" তুমি তখন চার বছরের। আমি থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম—"আছে, শুধু দূরে।" সেদিন তুমি আমার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলে। সেই কান্নাটা আমার বুকের গভীরে একটা ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আমাদের দুজনের কষ্ট এক হয়ে গেছে। মানুষ সবসময় জেতে না, কখনও ভেঙে পড়ে। কিন্তু ভালোবাসার জন্যই মানুষ আবার উঠে দাঁড়ায়।
তুমি ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার খবরটা যখন দিলে, আমি অফিসে বসেই চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। সহকর্মীরা অবাক হয়ে দেখেছিল। এই কঠোর, নিরব মানুষটা কাঁদছে কেন? কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, ওই একটা খবরে আমি আমার সারাজীবনের অপমান আর হতাশা ধুয়ে মুছে ফেলেছি। তোমার সাফল্যই ছিল আমার একমাত্র শক্তি।
তুমি বড় হলে, শক্ত হলে। একদিন তোমার নানু ফোন করে বললেন, তুমি বাড়ির লোকজনকে বলেছ—"নতুন মা আসবে, কিন্তু আমার বাবার বছরগুলো কে ফিরিয়ে দেবে?" সেদিন বুঝেছিলাম, আমি একা নই। আমাদের সম্পর্কের ভেতর এক অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে, যা হাজার মাইল দূরত্বকেও জয় করতে পারে।
আজ তোমার বিয়ের কথা চলছে। তুমি নতুন জীবনে যাবে। আমার ভয় নেই, কিন্তু একটা আকুতি আছে। আমি যেভাবে ভুল করেছি, তুমি যেন সেই ভুলগুলো না করো। কথা বন্ধ করো না, দূরত্ব তৈরি করো না। প্রেমের বিয়ে হোক বা পরিবারের—সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে কথা বলতে হয়, বোঝার চেষ্টা করতে হয়। আমার মতো একা লড়ে যেও না।
চলবে...
#দ্বিতীয়_খণ্ড #বাবার_চিঠি #জীবনের_পাঠ #বাংলা_গল্প #ভালোবাসা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।