ভোট ও শক্ত হাতের গল্প
শামীমা আকতার
প্রথমজন আঙুল ইশারা করে বললেন, “দে, একটু দিয়ে দে।”
দ্বিতীয়জন, “একটু বলে দে না, কোথায় দিব?”
আর একজন বললেন, “এগুলো দিয়ে কী করব?”
বলছিলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তারা সারাদিন কাজের চাপে নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় পাননি। কারো খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত হয়নি। ভোট গণনা শেষে প্রিজাইডিং অফিসার যখন রেজাল্ট প্রস্তুত করছিলেন, তখন কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ ভোটারদের আচরণ নিয়ে হাসাহাসি করছিলেন।
কেন্দ্রটি ছিল মহিলা ভোটারদের। এ কেন্দ্রে আমি ও একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার । কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে চিন্তামুক্ত পরিবেশে ভোটগ্রহণের দায়িত্ব সম্পন্ন করলেও সারাদিন ভোটারদের অনভিজ্ঞতার কারণে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। পুরুষ ভোটকেন্দ্রে সাধারণত এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না।
একজন ভোটার বলেই বসলেন, “তোঁয়ারারে বোয়াইয়ি কিল্লায়, যদি আঁরারে কিছু হয় ন দ!” প্রায় সবার হাতেই এনআইডি কার্ড ও প্রার্থীদের দেওয়া ভোটার নম্বরের সাথে একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগ। শপিং ব্যাগ কেন আনলেন, ঠিক বুঝা গেল না। এ জিনিসগুলো নিয়ে তাঁদের দিশেহারা অবস্থা। বেশিরভাগ ভোটারই সবকিছু বাম হাতে রেখেছিলেন, ফলে অমোচনীয় কালি দেওয়া ও টিপসই নিতে সমস্যা হচ্ছিল। কেউ কেউ আবার ব্যালট বাক্সে এনআইডি কার্ড দিয়ে দিয়েছেন।
কাউকে কাউকে বারবার বলেও গোপন কক্ষে ঢোকানো যাচ্ছিল না। ঢুকলেও সেখান থেকে আবার ডাকাডাকি শুরু—
“এক্কানা হয় দেছো না কেনে দিয়ুম? হন্ডে সিল মাজ্জোম!”
আবার কখনো দু’জন একসাথে একটি গোপন কক্ষে ঢুকে যাচ্ছিলেন। গণভোটের ব্যালট নিয়ে সবার বিভ্রান্তি আরও বেশি ছিল। কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছিল না—কাকে ভোট দেবেন, সেটা তাঁদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত; এ বিষয়ে আমাদের বলার কোনো এখতিয়ার নেই। কখন যে প্রমিত, সাধু, চলিত সব ভাষা ভুলে আঞ্চলিক ভাষায় ফিরে গিয়েছি, নিজেই বুঝতে পারিনি। যাক, এ সুযোগে দীর্ঘদিন পর আদি অকৃত্রিম পৈত্রিক ভাষার চর্চাটা হয়ে গেল।
সবার হাসাহাসিতে আমি যোগ দিতে পারছিলাম না। ব্যাপারটা সত্যিই ভাববার বিষয়। কেন এমন হবে? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল না—এটা কোনো সিটি ভোটকেন্দ্র। ভোটারদের বেশিরভাগই ছিলেন মধ্যবয়সী ও বয়স্ক নারী।
বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী। তাঁদের এভাবে পিছিয়ে রেখে আদৌ কি দেশের কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সম্ভব? কেউ কেউ আবার বলে বসলেন, “মহিলারা কম বুঝেন।” আসলেই কি মহিলারা কম বুঝেন? নাকি তাঁদের বুঝতে দেওয়া হয় না?
কোন দল ক্ষমতায় এল, কোন দল পরাজিত হলো কিংবা কোন দল ক্ষমতাচ্যুত হলো—এসব কি তাঁদের কাছে কোনো অর্থ বহন করে? তাঁরা কি জুলাই সনদ বোঝেন? গণভোট কী, সেটাও কি জানেন? ভোটাধিকার প্রয়োগ—সেটা ও কি সত্যিকার অর্থে নিজের ইচ্ছায়? পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিজেদের প্রার্থীদের জেতানোর জন্য তাঁদের ভোটকেন্দ্রে পাঠিয়েছেন, কিন্তু পাঁচ মিনিট বসিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে বলার যোগ্য মনে করেননি।
প্রায় প্রত্যেকের হাতেই আলগা আস্তরন পড়েছে; শক্ত হাত ফেটে চৌচির, কারো নখ আস্ত নেই। টিপসই নেওয়ার সময় যখন তাঁদের হাত ধরছিলাম, তখন তাঁরা হাত এত শক্ত করে রেখেছিলেন আমার হাত ও ঘাড় রীতিমতো ব্যথা করছিল। এক পর্যায়ে বলতে বাধ্য হলাম—আমি মহিলা, আপনার হাত ধরলে কোনো সমস্যা নেই।
যে পেলব মেহেদি-রাঙানো হাত দু’টি ধরে তাঁদের শখের পুরুষটি একদিন মুগ্ধ হয়েছিলেন—খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখনো কি সেই হাত দু’টি ধরে তিনি একইভাবে মুগ্ধ হন? এখনো কি শক্ত, কঠিন, খসখসে হাত দু’টির উপর একইভাবে ভালোবাসার পরশ বুলিয়ে দেন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।