আমাদের একটি পেইজ ছিল(শেষ পর্ব)
বন্ধুর সাথে যে বয়সেই যে অবস্থায় দেখা হোক না কেন মন আন্দোলিত হয়। দীর্ঘ একঘেয়েমী দায়িত্ব-কর্তব্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে বন্ধুদের সাথে যোগাযোগটা ছিলো আমার বেড়ার ফাঁকে এক মুঠো রোদ্দোর। আমি যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। এতদিন পর আবার নিজেকে খুঁজে পেলাম। যে অনুভুতি একান্তই আমার নিজের।
বন্ধুদের সাথে যোগাযোগে যে প্রবল ভাবাবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল তা ছিল খুবই ক্ষণস্থায়ী। ভুলেই গিয়েছিলাম ইতোমধ্যে গুটি গুটি পায়ে বার্ধক্যের দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়ে গিয়েছে।
আশে পাশে যে মুখগুলো নিয়ে আমরা এতোদিন বেঁচে ছিলাম, স্বপ্ন দেখতাম তারা আমদের ঘিরে ধরল। তাদের প্রতি যে আমাদের অনেক কিছু করার এখনও বাকি। সব কিছুকে ছাপিয়ে পরিবার শেষ পর্যন্ত আমাদের মানসিক ও আবেগিক নির্ভশীলতার জায়গা হয়ে উঠে। ।
এবার ধীরে ধীরে নিজেদের অজান্তে গল্পের বিষয় পাল্টালো। গল্পের বিষয় হলো কার ছেলে মেয়ে কতো বড় হলো, কার সন্তান টপ রেজাল্ট করলো, কার সন্তান খারাপ করলো। কে গর্বিত পিতা হলো, কে গর্বিত মাতা হলো কিংবা এ ক্ষেত্রে কে পরাজিত হলো।
এরপর শুরু হবে সন্তানদের সংসারে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম। একই সাথে বিভিন্ন জরা ব্যাধি সবাইকে গ্রাস করবে।তখনও হয়তো কাঁপা কাঁপা হাতে পেইজে শেয়ার করা হবে কার সুগার লেভেল কতো? কার প্রেশার কতটা নিয়ন্ত্রণে? কার হার্টের ব্লক ধরা পড়েছে? কার কোমড়ের ব্যথা কতখানি কিংবা বাতের ব্যথায় কে কষ্ট পাচ্ছে?
এরমধ্যে হয়তো কেউ কেউ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। এরপর একটা সময় আসবে আর কাঁপা কাঁপা হাতেও লিখতে পারবো না। নাতি নাতনিকে ঢেকে বলব- তোর দাদু মৌসুমীকে একটা মেসেজ দে। তার প্রেশারের অবস্থা এখন কেমন একটু জেনে নে। কিংবা বলবো একটু মেসেজ করে দেখতো তোর শাহজাহান দাদুর সুগার লেভেল কেমন আছে? বলব কলিম, খোকন, তাপস, বোরহান, অসীম, গৌতম, শহীদ,লিটন,বাপ্পা দাদুকে একটু মেসেজ দে। বার বার একই কাজের পুনরাবৃত্তি, অসময়ে জ্বালাতন, ছেলে-ছেলের বউ,মেয়ে - মেয়ের জামাই, নাতি-নাতনি সবাই বিরক্ত হবে। হয়তো বলবে বুড়ো বয়সে ভীমরতি। ছেলেকে মুখ কাঁচুমাচু করে বলব গতকাল তোমার নাসির আংকেলের ছেলে আমাদের পেইজে দিয়েছে সে অসুস্থ তাকে একটু দেখতে ইচ্ছে করছে। হয়তো বলব তোমার চন্দনা আন্টির নাতির মুখে ভাত- অনেক করে বলেছে। তোমার যদি একটু সময় থাকে-? চেহারা দেখে চুপসে যাব। বলব তোমার অসুবিধা হলে থাক। প্রচন্ড অভিমান হবে,মন খারাপ হবে । ছেলে বলবে তুমি নিজেই চলতে পারো না কীভাবে বার বার এদিক ওদিক যাওয়ার বায়না কর? মোবাইলটা যত নষ্টের গোড়া। তোমাকে আর মোবাইল দেওয়া যাবেনা। তুমি পেইজে দুনিয়ার সব দেখ আর অসুস্থ হয়ে পড়।
এভাবে ধীরে ধীরে আমাদের পেইজে লেখা বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা একজন একজন করে হারিয়ে যাব। সাথে সাথে আমাদের পেইজটাও স্মৃতির অতলে কালের গ্রাসে হারিয়ে যাবে। আমদের আবেগ অনুভুতি প্রকাশের এই প্ল্যাটফর্মের কথা কেউ কোনোদিন জানতে পারবেনা।
হয়তো আমাদের কারো না কারো বংশধরের চোখে একদিন আমাদের প্রাণের পেইজটা ধরা দিবে। সে হয়তো আমাদের সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝবে। পেইজে আমদের লেখাগুলো তাকে অভিভূত করবে, বিমোহিত করবে। কারণ তাদের জেনারেশনের কাছে আমাদের বলা কথাগুলো অদ্ভুত মনে হবে। হয়তো আমদের পেইজ দেখে তার গবেষণার বিষয় হবে ''মিলেনিয়ালস জেনারেশনের বন্ধুত্ব ও মানসিকতা"।
শামীমা আকতার
#enolej_idea104354,#eid3334,#Shamima_Akter,#Shamim_Shamu,
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।