জীবনের এই দীর্ঘ সফরে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে কত কিছুই না আমাদের চাওয়ার থাকে! কখনো প্রয়োজনগুলো এমন হয় যে , মনে হয়, তা না পেলে হয়তো জীবন এখানেই থমকে যাবে। আবার কখনো তা হয় কেবল ভোগ-বিলাসের জন্য—মনের আকাঙ্ক্ষা বৈ কিছু নয়। জীবনের সুখময় দিনগুলোতে আমরা ভাবি, আমাদের জীবনের লাগাম তো আমাদের ইচ্ছার সাথেই সম্পৃক্ত। হৃদয় কোণে যখন যেটারই আকাঙ্ক্ষা করছি তাই পূর্ণতা পেয়ে যাচ্ছে । মনে হয়, এই সুখ আমার থেকে কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ভুলে যাই মহান রবকে, যার হাতে রয়েছে সুখ- দুঃখের চাবিকাঠি। ভুলে যাই, তাঁর হাতেই সকল ক্ষমতার উৎস। ভুলে যাই, তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কারণেই সুখময় জীবন অতিবাহিত করছি।
রবকে তখনই স্মরণ হয়, যখন সংকটের মুহূর্তগুলো এই সুখময় জীবনের চাদরকে টেনে খুলে ফেলে, আমাদেরকে দেখিয়ে দেয় এর প্রকৃত বাস্তবতাকে। আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট করে দেয়—এই সুখময় জীবন তোমার ইচ্ছাশক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়; এটা তো তোমার প্রতি তোমার রবের অনুগ্রহ ছিল। কেবল তখনই আমরা আমাদের রবকে স্মরণ করি।
তাঁকে আমরা তখনই স্মরণ করি, যখন কোনো অকল্পনীয় বিপদ এসে আমাদের সুখময় জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। যখন হতাশার গাঢ় চাদরে আবৃত হয়ে বিপদের গভীর অন্ধকার পথে হোঁচট খাই। সব বাহ্যিক উপায় গ্রহণ করেও যখন আমরা কোন পথ খুঁজে পাই না। তখনই মনে হয়, এই সমস্যার সমাধান কেবল তিনিই করতে পারবেন। তিনি ছাড়া আর কেউ এই সমাধান দিতে পারবে না। আল্লাহই আমার একমাত্র ভরসা । এই প্রয়োজন আমাদেরকে ইবাদতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ওজু করে মসজিদে যাই, নামাজ পড়ি। দোয়া, জিকিরগুলো আমাদের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই বিবেক কানে কানে প্রশ্ন তোলে: আমি কি আল্লাহর আদেশ পালনার্থেই নামাজ পড়ছি, নাকি আমার প্রয়োজনের টানই আমাকে তাঁর দরবারে হাজির করেছে? আমার এই ফিরে আসা কি কেবলই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য? প্রয়োজনের শেষে আবার কি পুরনো পথেই ফিরে যাব? ভুলে যাব, তিনি কেন আমাকে সৃষ্টি করেছেন?
মসজিদে প্রবেশ করতেই দেখি, অন্য মুসলিম ভাইয়েরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে যেন প্রশ্ন: এ ব্যক্তি আবার এখানে? লজ্জায় মাথা নত হয়। ভাবি, জিজ্ঞেস করবে বুঝি—কোন সমস্যায় পড়েছ নাকি? আমাদের সমাজে এই ধরনের প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক, কারণ আমরা তখনই রবের কাছে ফিরে যাই, যখন আমরা দুশ্চিন্তার গাঢ় চাদরে আচ্ছাদিত হই। দুনিয়াবি উপকরণগুলো যখন দুশ্চিন্তার নিকশ কালো আঁধারকে আলোতে রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয়। যখন ব্যাংক ব্যালেন্সের সংখ্যাগুলো শূন্যতে রূপান্তরিত হয়, আমাদের খ্যাতিগুলো যখন ম্লান হয়ে যায়। আমাদের সীমাবদ্ধতা যখন আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিবেক আবারো ধমকের সুরে বলে , আজ এখানে গুটিকয়েক লোকের সামনে লজ্জিত হচ্ছো, অথচ কেয়ামতের দিন যখন সকল মানবজাতির সম্মুখে তোমার রব তোমার নামাজের হিসাব চাইবেন, তখন কী জবাব দেবে? কী অজুহাত পেশ করবে তার নিকটে ?
নামাজ শেষে দুই হাত তুলে দোয়া শুরু করি: "হে আমার রব! তুমিই তো আমার একমাত্র অভিভাবক। তুমি ছাড়া আমার আর তো আপন কেউ নেই । তুমি পবিত্র কুরআনে বলেছ, ‘যারা ঈমান এনেছে, আমি তাদের অভিভাবক।’ হে রব, আমি তোমার এক নগণ্য বান্দা; তুমি না দিলে আমি কার কাছে যাব? হে দয়ালু, দয়ার সাগর! তোমার দয়াতেইতো আমরা বেঁচে আছি। যদি তুমি আমার এই প্রয়োজনটি পূরণ করো..." তাহলে আমি সম্পূর্ণরূপে তোমার দিকে ফিরে যাব ।
এভাবেই হাজারো কাকুতি-মিনতি করে হৃদয়ের গোপন ইচ্ছাটি তাঁর কাছে পেশ করি। কিন্তু মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর নিজের অজান্তেই আবার কখন যে দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যাই বুঝে উঠতেই পারি না। আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার সেই প্রতিশ্রুতি আড়ালে চলে যায়।
এভাবেই দিন গড়াতে থাকে । যখন দেখি, এত দোয়া করার পরেও আমার সেই চাওয়া পূরণ হচ্ছে না, তখন ভরসাহীনতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাই। মনে প্রশ্ন জাগে , তিনি কেন দিলেন না? তিনি কি আমার ডাক শুনলেন না? তিনি তো বলেছেন, তোমারা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।' তাহলে তিনি আমার এই চাওয়া কেন পূরণ করলেন না ? এই ক্ষোভে-হতাশায় ইবাদত ছেড়ে দিই। ভাবি, ইবাদত করে লাভই বা কী? আমার আকাঙ্ক্ষা তো অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। জীবন আবার আগের সেই রুটিনে ফিরে যায়—যেখানে নেই কোন নামাজ , নেই কোন জিকির, নেই দোয়ার আবদার। দুনিয়ার মিছে মায়ায় আবারো নিজেকে হারিয়ে ফেলি।
কিন্তু হঠাৎ একদিন এমন কিছু ঘটে যে, আমি আঁতকে উঠে অবাক হয়ে তাকাই! যে জিনিসটির জন্য এত কাকুতি-মিনতি করেছিলাম, সেই জিনিসটিই আজ আমার জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে! তিনি যদি সেই সময় আমাকে সেটা প্রদান করতেন তাহলে হয়তো আজ আমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম । আল্লাহ তাআলা আমাকে তা দেননি। বরং, তার বদলে দিয়েছেন এমন এক নেয়ামত, যা তার চেয়ে অনেক বেশি উৎকৃষ্ট, কল্যাণকর ও নিরাপদ।
তখনই উপলব্ধি করি: আমার রব আমাকে তখন তা কেন দেননি । কারণ তিনি সকল বিষয় সম্পর্কে অবগত । আমি না জানলেও তিনি জানতেন এই জিনিসটি আমার জন্য ক্ষতির কারণ হবে । তাই তিনি আমাকে অনুগ্রহ করে তা থেকে রক্ষা করেছেন। ওই দোয়ার বদৌলতে "আল্লাহ তাআলা আমাকে এমন এক নেয়ামত দান করেছেন, যা হৃদয়-নদীতে প্রশান্তির জলধারা বহিয়ে দেয়। যে নেয়ামত আমার জন্য ছিল সম্পূর্ণই অকল্পনীয়। তখনই মনের আয়নায় ভেসে উঠে তাঁর বাতলে দেওয়া সেই বাণী । আর তা হলো,
"সম্ভবত তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ কর, অথচ সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর তোমরা কোনো জিনিসকে পছন্দ কর, অথচ সেটিই তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না।" (সূরা আল-বাকারাহ, ২১৬)
ওই মুহূর্তে হৃদয়ে ফিরে আসে রবের প্রতি হারানো সেই বিশ্বাস সেই ভরসা আর তা এই যে , আল্লাহ যা কিছু করেন সকল কিছুই কল্যাণকর । এটি আর পূর্বের ন্যায় সাধারণ বিশ্বাস হিসেবে ফিরে আসে না এটি ফিরে আসে দৃঢ় বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়ে । এই দৃঢ় বিশ্বাস অন্তরবাগে এমন এক বৃক্ষ রোপন করে যার গোড়া অত্যন্ত সুদৃঢ়, যা বিপদকালে ভরসা হীনতার কারণে অন্তরে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়কেও হার মানিয়ে দেয়।
আল্লাহর অনুগ্রহে এখন আমি আর তাকে ভুলে যায় না । সুখে-দুঃখে সবসময় তাকে স্বরণ করি। তার পক্ষ থেকে যেই ফায়সালাই আসে না কেন প্রশান্তচিএে তা গ্রহণ করি কারণ তিনি মুমিনদের জন্য যেটাই নির্ধারণ করেন না কেন সবকিছুই তাদের জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে। যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَعَنْ أبي يَحْيَى صُهَيْبِ بْنِ سِنَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ االله صَلّى االلهُ عَلَيْهِ وسَلَّم : »عَجَباًلأمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ آُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ ، وَلَيْسَ ذَلِكَ لأِحَدٍ إِلاَّ للْمُؤْمِن : إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْراً لَهُ ، وَإِنْأَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خيْراً لَهُ « رواه مسلم
অনুবাদ : আবূ ইয়াহয়া সুহাইব ইবনু সিনান রাদিয়াল্লাহু ’আনহু থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ’’মুমিনের ব্যাপারটাই আশ্চর্যজনক। তার প্রতিটি কাজে তার জন্য মঙ্গল রয়েছে। এটা মু’মিন ব্যতীত অন্য কারো জন্য নয়। সুতরাং তার সুখ এলে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ফলে এটা তার জন্য মঙ্গলময় হয়। আর দুঃখ পৌঁছলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে এটাও তার জন্য মঙ্গলময় হয়। ( হাদিসটি সহীহ )
’’ মুসলিম ২৯৯৯, আহমাদ ১৮৪৫৫, ১৮৪৬০, ২৩৪০৬, ২৩৪১২, দারেমী ২৭৭৭
তবুও আমিতো একজন মানুষ। আর মানুষতো ভুলের উর্ধ্বে নয়। এত সতর্কতা অবলম্বনের পরেও ভুল হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে যখনই আমার দ্বারা আল্লাহর হুকুম ও তার রাসূলের সাঃ সূন্নতের বিপরীত কোন কাজ সংঘটিত হয়ে যায় তখনই আমি অনুতপ্ত হই । নিজের নাফসকে ধিক্কার দিতে থাকি । আর স্বরণ করি মহান রবের সেই কথাগুলো,
وَ هُوَ الَّذِیۡ یَقۡبَلُ التَّوۡبَۃَ عَنۡ عِبَادِهٖ وَ یَعۡفُوۡا عَنِ السَّیِّاٰتِ وَ یَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُوۡنَ ﴿ۙ۲۵﴾
অনুবাদ: আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবূল করেন এবং পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। আর তোমরা যা কর, তা তিনি জানেন। সূরাঃ আশ-শূরা (আয়াতঃ ২৫)
اِنَّمَا التَّوۡبَۃُ عَلَی اللّٰهِ لِلَّذِیۡنَ یَعۡمَلُوۡنَ السُّوۡٓءَ بِجَهَالَۃٍ ثُمَّ یَتُوۡبُوۡنَ مِنۡ قَرِیۡبٍ فَاُولٰٓئِكَ یَتُوۡبُ اللّٰهُ عَلَیۡهِمۡ ؕ وَ كَانَ اللّٰهُ عَلِیۡمًا حَكِیۡمًا ﴿۱۷﴾
অনুবাদ: নিশ্চয় তাওবা কবূল করা আল্লাহর জিম্মায় তাদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে। তারপর শীঘ্রই তাওবা করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবা কবুল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। সূরাঃ আন-নিসা (আয়াতঃ ১৭)
বিশুদ্ধ চিওাকাঙ্খী হয়ে আবারো ফিরে যাই মহান রবের দিকে। মনোনিবেশ করি তার বাতলে দেওয়া সরল পথের হেদায়েতের দিকে যেখানে নিহিত রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতের সকল কল্যাণ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।