#নামায_না_পড়লে_কি_কোনো_মুসলিম_কাফের_হয়ে_যাবে?
কথিত আহলে হাদীসদের একটা বাতিল বৈশিষ্ট্য হলো
" এরা দু- একটা হাদীস পড়েই ফতোয়া দেওয়া শুরু করে এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করে "
তো আজকের পয়েন্ট হলো " নামায ত্যাগ করলে সে কাফের নাকি ফাসেক এই ব্যাপারে.."
তো চলুন শুরু করা যাক।
আমাদের প্রথমে একটা উসূল ( মূলনীতি) মনে রাখতে হবে আর তা হলো " কোনো একটা সহীহ হাদীস পেলেই তার উপর আমল করা বা সে হাদীসের আলোকে ফতোয়া প্রদান করা যাবে না, বরং তিনটা বিষয় মাথাই রাখতে হবে আর সেগুলো হলো-
১. হাদীসটা মানসূখ কিনা/ সুন্নাহ সাব্যস্ত করে কিনা
২. হাদীসটা সালাফরা কিভাবে ব্যাখ্যা করেছেন
৩. হাদীসের ভিতরে থাকা মূল হাকীকত কি!
যদি এতটুকু বুঝতে পারেন তাহলে এগিয়ে যাওয়া যাক...
এখন আসি তাদের ব্যাপারে যারা কিনা বলে " নামায ত্যাগকারী কাফের " তাদের দলীল এর ব্যাপারে -
হাদীসটা হলো -
حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ يَحْيَى التَّمِيمِيُّ، وَعُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، كِلاَهُمَا عَنْ جَرِيرٍ، قَالَ يَحْيَى أَخْبَرَنَا جَرِيرٌ، عَنِ الأَعْمَشِ، عَنْ أَبِي سُفْيَانَ، قَالَ سَمِعْتُ جَابِرًا، يَقُولُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ " إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ " .
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সলাত ছেড়ে দেয়া। (ই.ফা. ১৪৯; ই.সে. ১৫৪)
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৮
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ, irdfoundation․com
তো এটা হলে তাদের মতের অন্যতম ভিত্তি , যার দ্বারা তারা বলে " নামায ত্যাগকারী কাফের! "
পর্যালোচনা:
প্রথমেই আমরা দেখে নিবো পবিত্র কোরআনের একটা আয়াত
আল্লাহ রব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ لَا یَغۡفِرُ اَنۡ یُّشۡرَكَ بِهٖ وَ یَغۡفِرُ مَا دُوۡنَ ذٰلِكَ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ مَنۡ یُّشۡرِكۡ بِاللّٰهِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلٰلًۢا بَعِیۡدًا ﴿۱۱۶﴾ان الله لا یغفر ان یشرك بهٖ و یغفر ما دون ذلك لمن یشآء و من یشرك بالله فقد ضل ضللا بعیدا ﴿۱۱۶﴾
নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমা করেন না তাঁর সাথে শরীক করাকে এবং এ ছাড়া যাকে চান ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে তো ঘোর পথভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হল। আল-বায়ান ( নিসা-১১৬)
লক্ষ্য করুন আয়াত এতে সরাসরি বলা হচ্ছে যে শিরক ব্যাতিত আল্লাহ রব্বুল আলামিন সকল পাপ ক্ষমা করেন ( যদি সে খাস মনে তওবা করে..) । এখন যদি আমরা মুসলিম -৮২ ( আন্তর্জাতিক নাম্বার) অনুসারে বলি ' নামায ত্যাগকারী কাফের তাহলে উক্ত আয়াত এর সাথে হাদীস সরাসরি সাংঘর্ষিক কেননা আয়াত বলছে ' শিরক ব্যাতিত সব মাফ আর হাদীস বলছে ' নামায না পড়লে ( পাপ মূল উদ্দেশ্য ) সে কাফের ( যদিও হাদীসে তা উদ্দেশ্য না) । মানে কোরআন আয়াত অনুসারে সকল পাপ ক্ষমা করার কথা হাদীসের বেলায় ভঙ্গ হচ্ছে ! । তো এখন আমার সহীহ প্রো মাক্স কথিত আহলে হাদীস ভাইরা কোরআনের আয়াত মানবেন নাকি হাদীস? যদি হাদীস মানেন তাহলে কোরআনের আয়াত অস্বীকার করছেন, আর এর জন্য আপনি কাফের, আর হাদীস অস্বীকার করলেও আপনি কাফের!
এখন উপায়?
আমাদের বুঝতে হবে যে উক্ত হাদীস থেকে প্রমাণ হয় না যে সালাত ত্যাগকারী কাফের বা অমুসলিম । বরং হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য হলো " নামায এর গুরুত্ব বুঝানো এবং ত্যাগ করার ভয়াবহতা বুঝানো.."। আর এটা বুঝতে পারি অন্যন্য হাদীস পড়লে, যেমন -
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে।
সা‘ঈদ ও আবূ সালামা (রাঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে অনুরূপ বর্ণিত, তবে তাতে লুটতরাজের উল্লেখ নেই। ফিরাবরী (রহঃ) বলেন, আমি আবূ জা’ফর (রহ)-এর লেখা পান্ডুলিপিতে পেয়েছি যে, আবূ ‘আবদুল্লাহ্ (ইমাম বুখারী) (রহঃ) বলেন, এ হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, এর অর্থ হল, তার হতে ঈমানের নূর ছিনিয়ে নেয়া হয়।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ২৪৭৫
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ, irdfoundation․com
এই হাদীসে বলা হচ্ছে যে যিনাকারী যিনার সময় মুসলিম থাকে না, তো এখন যদি আপনি এই একটা হাদীস পড়েই ফতোয়া লাগিয়ে দেন যে যিনাকারী কাফের বা চুরিকারী কাফের তাহলে মহা সর্বনাশ, কেননা আমরা অন্যন্য রেওয়াত এতে দেখতে পাই যে " যিনাকারীর যিনা ক্ষনা করেছেন, ( সর্বোচ্চ তাকে যিনার শরীয়তি শাস্তি দিয়েছে, ) কিন্তু কাফের আখ্যায়িত করেন নি.. আর কোনো সাহাবী, তাবেঈ পর্যায়ের মুজতাহিদ থেকে শুরু করে এই পযন্ত জমহুর এবং মাশহুর মুজতাহিদরাও উক্ত হাদীসের উপর ভিত্তি করে কখনো বলেন নি যে " যিনাকারী, ব্যভিচারি কাফের... " । তো যেসব সুপার প্রো মাক্স সালাফিরা মুসলিম -১৪৮ ( হাদীস একাডেমি ) পড়ে নামায ত্যাগকারীকে কাফের ফতোয়া প্রদান করে তারা কি এখন ব্যভিচারি, চুকেও কাফের ফতোয়া দিবে নাকি যিনা বা চুরি করার কারণে?। আবার অন্য রেওয়াতে আছে যে " মনিবের অনুমতি ছাড়া গোলাম বিয়ে করলে সে ব্যভিচারি "( আবু দাউদ -২০৭৮, সহীহ হাদীস / হাদীস আ্যপ বিডি)। এখন কি কথিত আহলে হাদীসরা মনিবের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা ব্যক্তিকেও কাফের ফতোয়া দিবে? কেননা হাদীসে ব্যভিচারিকে অমুসলিম বলা হয়েছে ব্যভিচারের সময়! ।
এখন আরেকটা হাদীস লক্ষ্য করুন -
আবূ যার্ (গিফারী) (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ একজন আগন্তুক [জিব্রীল (আঃ)] আমার প্রতিপালকের নিকট হতে এসে আমাকে খবর দিলেন অথবা তিনি বলেছেন, আমাকে সুসংবাদ দিলেন, আমার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, যদিও সে যিনা করে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে? তিনি বললেনঃ যদিও সে যিনা করে থাকে এবং যদিও সে চুরি করে থাকে। [২]
ফুটনোট: [২] কৃত কর্মের শাস্তি ভোগ অথবা ক্ষমা লাভের পরই সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। কারণ কবীরাহ্ গুনাহে লিপ্ত হলেই মানুষ ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায় না। হাদীসটি মুসলিম নামধারী চরমপন্থী দল খারিজীদের আকীদার প্রতিবাদে একটি মযবুত দলীল। ওদের ধারনা মানুষ কবীরাহ্ গুনাহে লিপ্ত হলেই কাফির হয়ে যায় (নাউযুবিল্লাহ)।
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১২৩৭
হাদিসের মান: সহিহ হাদিস
সোর্স: আল হাদিস অ্যাপ, irdfoundation․com
প্রথমে একটা হাদীস দেখলাম যেখানে বলা হচ্ছে যিনাকারী আর চুরিকারী যিনা ও চুরির সময় মুসলিম থাকে না, আবার এখানে বলা হচ্ছে চুরি ও যিনা করলেও সে জান্নাতি যদি শিরক না করে! । তো এখন এখানে আমরা কোনটা মানবো?
জবাব : দ্বিতীয় হাদীসটাকেই মান্য করব, কেননা শিরক ছাড়া সকল পাপ ক্ষমা হয় এটা কোরআ সমর্থিত এবং মজবুত রেওয়াত দ্বারা প্রমাণিত , আর যে হাদীসে তাদের কর্মের সময় অমুসলিম বলা হয়েছে সে সম হাদীসের ব্যাখ্যা হলো -
" যিনা, চুরি চ মদ পান এগুলো চরম গুনাহ এর কাজ তা বুঝানোর জন্যও উক্ত হাদীসের অবতারণা, হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য এটা নয় যে সে মুসলিম থেকে খারিজ হয়ে যাবে....
সারাংশ : মূল কথা হলো মুসলিম -৮২ নং হাদীস বা এই রিলেটেড কোনো হাদীসের উদ্দেশ্য এটা নয় যে কোনো ব্যকৃতি নামায ত্যাগ করার কারণে সরাসরি কাফের হয়ে যায়, বরং সে ফাসিক হয়ে যায়, যেমনটা, ইমাম আজম আবু হানিফা, শাফেয়ি মালেকি এই তিন মহান ফকীহ বলেছেন.....
আর আমাদেরও বিশ্বাস হলো এই যে সালাত ত্যাগকারী কাফের না ফাসেক হয়ে থাকে, যেমনটা পূর্ববর্তী ইমাম ও নস থেকে বুঝা যায়...
[ বাঈ দা ওয়ে যারা খুব সহীহ হাদীস আর মানতে ওস্তাদ এবং দু- এক হাদীস পড়েই ফতোয়া + আমল করে তাদের বলব যে এখন থেকে দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা যিকির করতে, হোক সেটা টয়লেট এর সময় বা সহবাসের সময়.. কেননা নবীজি সব সময় যিকির করতেন (আবু দাউদ -১৮ : সহীহ হাদীস..) .. ]
বিঃ দ্র: নামাযকে অস্বীকার করলে সে কাফের,
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
লেখক : মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।