সূরা লাহাব নিয়ে নাস্তিকদের কিছু প্রশ্ন ও সংশয় নিরসন
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
এক নজরে অভিযোগ
* সূরা লাহাব প্রথম আয়াত নিয়ে সংশয়গত প্রশ্ন ও উত্তর
* আল্লাহ তো কুন বললেই সব সাথে সাথে হয়ে যায়, তাহলে আবু লাহাব এর মৃত্যু কেন এত পরে হলো??
* উক্ত ( সূরা- লাহাব) এতে বলা হয়েছে " ধ্বংস হোক আবু- লাহাব এর দু- হাত " কিন্তু আমরা জানি আবু- লাহাব এর দু- হাত এর কিছুই হয় নি, তাহলে কি উক্ত ভবিষ্যৎ বাণী ভুল??
* আবু লাহাব তো মারা গেছে, তাহলে এই সূরার মধ্যে কার জন্য ধ্বংসের দোয়া করি??
* উক্ত ( সূরা- লাহাব) কি আমাদের হিংস্রতা শিক্ষা দিয়ে থাকে??
★ অনেক দিন আগে লুপা রহমান( বাংলাদেশের কুখ্যাত অসভ্য এক মহিলা) নামে এক নাস্তিক এর ভিডিও ( সম্ভব্য তো ৫ মিনিট হবে) এরকম কিছু দাবি করে ( আমার ঠিক মনে নেই + কিছু প্রশ্ন নিজে থেকে যোগ করেছে, এরকম অনেকের মনেই আসে) তাই আজ কাউন্টার হিসাবে পোস্ট টা নিয়ে আসলাম।
তো চলুন শুরু করা যাক।
[ পয়েন্ট আকারে জবাব ]
পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান
____________________
প্রশ্ন : মানুষ দোয়া করলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, সূরা লাহাব এর প্রথম আয়াত একটা দোয়া বুঝাচ্ছে, যখন আমরা এই আয়াত পড়ি তখন আল্লাহর কাছে দোয়া করি, কিন্তু আল্লাহ যখন আয়াত নাযিল করে তখন তিনি কার কাছে দোয়া করে??
জবাব: কথাটা ঠিকই আছে, সূরা লাহাব এর প্রথম আয়াত না বরং সম্পূর্ণই আয়াত আবু লাহাব এর উপর বদ দোয়া( অভিশাপ রিলেটেড) কে বুঝাচ্ছে। কারণ এতে " তাব্বাত " শব্দ ব্যবহার হয়েছে, যেটা একটা past Tense এবং আরবি গ্রামারে এটা দুটো অর্থে ব্যবহিত হয়
১. দোয়া বা 'বদ-দোয়া'
২. ভবিষ্যৎ নিশ্চিয়তা দেওয়া
*** আয়াতটা দেখুন
- تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾
তাব্বাত ইয়াদাআবী লাহাবিওঁ ওয়া তাবব।
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও।
Perish the two hands of Abu Lahab (an uncle of the Prophet), and perish he!-
এখানে আয়াতটা যদি খেয়াল করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে " আরবি ইবারত এর ব্যাকরণ অনুসারে Past Tense কিন্তু অনুবাদ হচ্ছে Future tense এতে। এরকম করে পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াত আছে যেখানে ' অতীত- কাল ' ব্যবহৃত হয়েছে কিন্তু অনুবাদ এসেছে ' 'ভবিষ্যৎ-কাল' দিয়ে, উদাহরণ সরূপ সূরা তাকউইর এর ১,২,৩ আয়াতটা দেখতে পারেন, সেখানে কিয়ামতের কথা বর্ণনা দোওয়া হয়েছে, যেগুলো 'অতীত- কাল ' কিন্তু অনুবাদ করা হয়েছে ' ভবিষ্যৎ - কাল দিয়ে। তো এই রিলেটেড যেসব আয়াত আছে ওগুলোর দুটো অনুবাদ হবে
১. নিজেদের সাপেক্ষে এক রকম
২. আল্লাহ এর সাপেক্ষে অন্য রকম
সূরা লাহাব এর প্রথম আয়াটা দেখুন
- " تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾
তাব্বাত ইয়াদাআবী লাহাবিওঁ ওয়া তাবব।
ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। ( আমাদের সাপেক্ষে )
- تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّ تَبَّ ؕ﴿۱﴾
তাব্বাত ইয়াদাআবী লাহাবিওঁ ওয়া তাবব।
ধ্বংস হবে আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হবে সে নিজেও।( আল্লাহর সাপেক্ষে )
আমি এখানে দুটো অনুবাদ আনলাম। লক্ষ্য করুন প্রথম অনুবাদটা ( আমাদের সাপেক্ষে যেটা) সেই আয়াতটা যখন আমরা পড়ি তখন 'চাওয়া ' বা ' দোয়া ' অর্থে আসলেও দ্বিতীয় অনুবাদকৃত আয়াতটা ( আল্লাহর সাপেক্ষে ) কিন্তু 'চাওয়া ' বা ' দোয়া' অর্থে আসছে না ( আর আসার কথাও না) । এরকম করে যেসব আয়াত আছে সেগুলোতে আমাদের সাপেক্ষে যে অনুবাদ হবে সেটা আল্লাহর ক্ষেত্রে কখনো প্রযোজ্য হবে না, তাই তখন আর উক্ত ( নাস্তিকদের প্রশ্ন) এখানে......... । আমাদের বুঝতে হবে প্রত্যেক ভাষার একটা আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে কিছু, কোরআন যেহেতু আরবি ভাষার, তাই কোরআনকে বুঝতে হবে আরবি ব্যাকরণ দিয়ে। আমি যে ফর্মুলার উপর কথাগুলো বললাম( লেখলাম) সেগুলো আরবি এর একটা অলংকার । এরকম করে আরবিও লোকেরা ভবিষ্যৎ নিশ্চিতয়তা দেওয়ার জন্য অতীতবাচক শব্দ ব্যবহার করে কিন্তু নির্দেশ করে ভবিষ্যৎ কে। এটা একটা নরমাল বিষয়, আরবি না জানার কারণে বাংলায় কোরআন পড়ে বিভ্রান্ত হয় আর কি। আশা করি মূল বিষয়টা বুঝতে পেরেছেন ।
পয়েন্ট নাম্বার টু
______________
প্রশ্ন : কুন বললেই তো সাথে সাথে হয়ে যায়, তাহলে আবু লাহাব এর মৃত্যু হলো না কেন??
জবাব : প্রথম তো
এর সোজা- সাপ্টা উত্তর হলো " উক্ত আয়াতে কুন বলা হয় নি, তাই তার মৃত্যু সাথে সাথে হয় নি।
দ্বিতীয় তো
কুন বললেই যে সব সাথে সাথে হয় ( আমাদের সাপেক্ষে ) এটা কয় লেখা আছে??, দু- ভাবেই ঘটতে পারে, সেটা হোক সাথে সাথে অথবা নিদিষ্ট সময়ে অথবা দীর্ঘ সময় পর। আল্লাহ রব্বুল আলামীন কখন কি করবেন সেটা তাঁর ইচ্ছা, তিনি মন চাইলে সাথে সাথে হবে, না চাইলে হবে না, আমাদের মনে রাখতে হবে তাঁর ইচ্ছা ব্যাতিত কিছুই হয় না ( সূরা তাকবির -২৯) তাই কখন কার মৃত্যু দিবে সেটা তাঁর ইচ্ছা ।
তৃতীয় তো
আবু লাহাবকে বেঁধে দেওয়া আয়ু সেই সময়ে শেষ হয়নি তাই মৃত্যু হয় নি ( আবার বলতে পারেন যে ' আল্লাহ তো সব পারে তাহলে তাঁর মৃত্যু সময় শেষ হওয়ার আগে দিলেই তো হতো। কথাটা ঠিক, আল্লাহ চাইলে সবই পারে,তাঁর মানে এই না যে তিনি সব সাথে সাথেই করবে, ক্ষমতা থাকলেই তা ব্যবহার করা স্রষ্টার নীতি বিরুদ্ধ , ভারত চাইলেই পারমাণবিক মেরে আমাদের চান্দ্রের দেশে পাঠাতে পারে, তাঁর মানে এই না যে ভারত আমাদের....... । এছাড়াও আবু লাহাবকে যদি সাথে সাথে মারা হতো, তাহলে হাশরের মাঠে যখন সে পৰশ্ন করত, " আমার সময় শেষ হওয়ার আগে কেন মৃত্যু দিলেন,তখন...... । তাই আবু লাহাব এর দেওয়া আয়ু পযন্ত তাকে বাচিয়ে রাখা হয়েছে)
যদি সেই সময় মৃত্যু লেখা হতো তাহলে অবশ্যই হতো।
( সবই মহান রব আল্লাহ এর ইচ্ছা)
পয়েন্ট নাম্বার থ্রি
_________________
প্রশ্ন: উক্ত সূরার মধ্যে তো আবু লাহাব এর হস্তদ্বয় ধ্বংস হওয়ার কথা বলা আছে কিন্তু আমরা জানি তাঁর হাত..... তাহলে কি.......
জবাব: এখানে বুঝতে একটু ভুল হয় আমাদের। আল্লাহ রব্বুল আলামির এর উদ্দেশ্য ' হাত ' দ্বারা এটা ছিল না যে তাঁর ( আবু- লাহাব) এর হাত কেটে ফেলা হবে। এখানে হাত দ্বারা ক্ষমতাকে নির্দেশ করা হয়েছে ( উপমা অর্থে, আমরা অনেক সময় বলে থাকি যে" আইন এর হাত অনেক লম্বা " এখানে হাত লম্বা মানে এই না যে ' আইন এর হাত তাল গাছের মতো লম্বা , কারণ ' আইন কোনো প্রাণী না যে এর হাত থাকবে, আর হাত লম্বা মানে এই না যে ' আইন এর হাত তাল গাছের মতো লম্বা। একটা বাচ্চাও বুঝতে পারবে এখানে ' হাত' ক্ষমতা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে) । আর এখানে যে আরবি " ইয়া'দা " রুপক অর্থে ব্যবহার হয়েছে তাঁর দুটো প্রমাণ দিচ্ছি
১. পুরো আয়াতটা দেখুন
-ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও -
এখানে লক্ষ্য করুন,আয়াতের দু'টো অংশ
প্রথম অংশে ' দু-হাত' এর কথা এসেছে, এবং দ্বিতীয় অংশে ' তার নিজ কথা এসেছে
এখন কথা হলো আল্লাহ রব্বুল আলামিন তো " ধ্বংস হোক সে নিজে" এতটুকু বলে দিলেই পারতেন তাই না,কারণ তার নিজের মধ্যে তো ' হাত' দুটো আছে, যেহেতু " ধ্বংস হোক সে নিজে" এটা বলার আগে তাঁর " ধবংস হোক তার হস্তদ্বয়" কথাটা আছে তাই এখানে হাত ধারা ক্ষমতাই হবে
২. উক্ত আয়াতে " আবু" বলতে একটা শব্দ এসেছে, যেটা মূলত পিতা অর্থে ব্যবহৃত হয়,কিন্তু এখানে পিতা অর্থে ব্যবহৃত না হয়ে " সম্পৃক্ততা" অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ( শুধু এখানে কেন আরও অনেক জায়গায় হয়/ হয়ে থাকে/ হতে পারে, যেমন: আবু হুরাইয়া , এখানে আবু হুরাইরা মানে বিড়ালের পিতা,এর মানে এই না যে সে বিড়ালকে জন্ম দিছে) তো এইরকম করে' হাত শব্দটাও মূখ্য না বরং গৌণ্য অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর এটাই যুক্তিসঙ্গত ( এরকম আরও অনেক আয়াতে উপমা হিসাবে অনেক কিছুই ব্যবহৃত হয়েছে)
পয়েন্ট নাম্বার ফর
_________________
প্রশ্ন : আবু লাহাব তো মারা গেছে, তাহলে এখন আমরা কার জন্য ধ্বংস এর দোয়া করি???
জবাব: প্রথম তো
আবু লাহাব মারা গেয়েছে তো কি হয়েছে কিন্তু তাঁর নব্য অনুসারি'রা তো এখনও বেঁচে আছে, এই সূরা আমাদের ওই সকল আবু লাহাবকেও..... শিক্ষা দিয়ে থাকে।
দ্বিতীয় তো
উক্ত সূরা আমাদের এই শিক্ষা দেই যে " একজন পাপীর কি দশা হয় আল্লাহর সাথে নফরমানীর কারনে। আমরা এই সূরা পড়লে হৃদয়ে একটা ভয় অনুভব করি, যেটা আমাদের নিজ রব আল্লাহর সাথে নাফরমানি হওয়া থেকে বাঁধা প্রদান করে। বাক বাকি আল্লাহ মালুম ( আলাম)
[ এটা সম্পূর্ণ নিজ উপলব্ধি , ভুলও হতে পারে আবার সঠিকও হতে পারে ]
পয়েন্ট নাম্বার ফাইভ
____________________
প্রশ্ন: উক্ত সূরা কি আমাদের হিংস্রতা....
জবাব: কখনোই না, আমরা এখানে একজন নাফরমানি এর জন্য দোয়া করি, আর এটা দোষের কিছুই না। যদি দুনিয়ার সকল মানুষ ( আয়াতটা যদি এরকম হতো " ধ্বংস হোক দুনিয়ার সকল ভালো - খারাপ মানুষের হস্তদ্বয় এবং তারা নিজেরাও" তাহলে বলা যেতো যে আমরা মানবতা বিরোধী ) এর কথা...... আর এরকম আয়াত/ শ্লোক / পদ বিভিন্ন ধর্মের কিতাবে আছে, এছাড়াও সাহিত্য জগৎ এতেও....... যদি অন্যগুলোতে হিংস্রতা শিক্ষা না দেই তাহলে উক্ত সূরা বা আয়াত.... এটা ভাবা মূর্খামি+ বোকামি।
আশা করি কথা ক্লিয়ার।
[ জানি না কতটুকু বুঝাতে পেরেছি, তবে সব সময় চেষ্টা করি আমার লেখাই যেনো এক লাইন হলেও নতুন কিছু থাকে ]
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।