নবী সাঃ এর মৃত্যু ও সংশয় নিরসন
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
ফেইসবুক এতে কিছু লেখা দেখলাম, যেখানে নবী সাঃ এর মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তো আমি এই বিষয়ে যতগুলো লেখা দেখলাম এবং যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো.... খন্ডন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ ।
তো চলুন শুরু করা যাক।
এক নজরে অভিযোগ
* বিষের কারণে নবীজির মৃত্যু
* উক্ত ঘটনাটা কি নবী সাঃ এর নবুয়তকে কোনোভাবে ....
* নিরব ঘাতক বিষ দিয়ে নবীজি সাঃ কে হত্যা করা হয়েছে
*. তাঁর ( নবীজি সাঃ) এর মৃত্যু আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তি
* একটা প্রশ্ন ও জবাব
*. নবীজি সাঃ এর জন্ম তাঁর পিতার মৃত্যুর চার বছর পরে কি?
[ পয়েন্ট আকারে জবাবগুলো দিচ্ছি ]
পয়েন্ট নাম্বার ওয়ান
_____________________
°বুখারী শরিফ এর ৫৩৬২ নং হাদীস ( নবম খন্ড) এতে ইবনে সা'দ থেকে একটা রেওয়াত তাঁরা দেখাই আমাদেরকে, যেখানে বর্ণিত হয়েছে যে ' জয়নব বিনতে হারিসা ' নামক এক মহিলা বকরীর মধ্যে বিষ দিয়ে সেটা রাসূল সাঃ কে প্রদান করেন খাওয়ার জন্য, আর তিনি সেটা খান ( প্রথম এটা নোটিশ করুন, ঘটনা-১)
° মোহাম্মদ সাঃ যে বিষ পানে মৃত্যু হয়েছিল সেটা প্রমাণ করতে আরেকটা রেওয়াত ( অনেকগুলোই করে, আমি জাস্ট একটা বলছি) উল্লেখ করে, যেখানে তিনি নিজেই বলেছেন " আমি সেই বিষক্রিয়া এখনো অনুভব করছি, আমার প্রাণরগ ফেটে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে (নবী জীবনের সীরাতন গ্রন্থ, সীরাতুন নবী ৩ য় খন্ড, পৃষ্ঠা নং ৩৫৬ - ঘটনা-২)
দুটো ঘটনা এক করে তাদের শিরোনামে এটা বলে যে " নবী সাঃ বিষ পান করেছে এবং তিনি বিষের কারণে মৃত্যু বরণ করেছে "
জবাব
_____
প্রথম তো তাদের এই ভ্রান্ত অভিযোগটা খন্ডন করা কোনো ব্যাপারই না, কারণ নবী সাঃ এর মৃত্যু হয়েছিল তার বিষ পান করার চার বছর পর। আর আজকে বিষ পান করলে সেটার প্রভাব যে চার বছর পর পরবে না এটা একটা শিশু বাচ্চাও বুঝে ।
পয়েন্ট নাম্বার টু
________________
অনেক দিন আগে কমেন্ট বক্সে যখন জবাব দেই তখন সেই নাস্তিক ভাই আমার হাতে একটা লিংক ধরিয়ে দেই আর ওইখানে সংক্ষিপ্ত করে " নিরব ঘাতক বিষ " এর ব্যাপারে বলা হয়েছিল। আপনারা হয় তো মুভি বা কোনো সিরিয়াল ( ভারতের CID তো অবশ্যই দেখবেন) এতে দেখবেন যে " এক ধরনের বিষ আছে যেগুলোদিলে সাথে সাথে মৃত্যু হয় না বরং কয়েক খন্টা থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর মৃত্যু হয়, এটাই মূলত সেই নিরব ঘাতক বিষ,। তো এখানে কিছু জিনিস বুঝার আছে -
প্রথমত
এই বিষ এর ব্যবহার দেখা যায় প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের দিকে মানে এটা ১৮ বা ১৯ শতাব্দীতে আবিষ্কার করা হয়
দ্বিতীয় তো
এই বিষের বিভিন্ন ধারা আছে, যদি দীর্ঘ বছর পর মারতে চান তাহলে এক বিষ আবার এক ঘন্টা পর ওই উক্ত বিষের ক্রিয়ার জন্য মারতে চাইলে অন্য বিষ
তৃতীয় তো
ধরুন আপনি কাওকে উক্ত বিষ দিয়ে তিলে তিলে শেষ করতে চাচ্ছেন ( ধরি তিন বছর এর সময়) তো আপনাকে এর জন্য উক্ত ব্যাক্তিকে প্রতিদিন বিষের ডোজ দিতে হবে, না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাবেন না
★ এখন পয়েন্টে আসি -
- আমরা দেখতে পেলাম যে এই আবিষ্কার হয়েছে মধ্যযুগের শেষ ভাগে, তারমানে নবী সাঃ ' নিরব ঘাতক বিষ এতে মারা গেছে এই দাবি করা বোকামি বা তাকে উক্ত বিষ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, এই দাবি করাও মূর্খামি, কারণ তার সময়ে এই বিষের নাম- নিশানও ছিল না।
- ধরে নিলাম সেই বিষ ছিল নবীজির সময়ে যেটা দিয়ে হত্যা করা....। এখন কথা হলো আমি একটু আগেই বলেছি যে " ওই বিষ দিয়ে কাওকে হত্যা করতে হলে প্রতিদিন একটু একটু ( ডোজ দিতে হবে) বিষ প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু সীরাত বা হাদীস গ্রন্থ থেকে কি এমন কোনো তথ্য কি পাওয়া যায়, যেখানে এটা বলা হয়েছে যে তাকে প্রতিদিন বিষ....... ।
উত্তর হবে না, একদমই না, আর এটা সম্ভবও না, কারন তাঁর সাহাবীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেও প্রতিদিন বিষ......।
- আর সবচেয়ে বড় কথা হলো বিষে মাখা মাংস নবী সাঃ একাই খান নি বরং সাহাবি ও খেয়েছেন এবং একজন সাহাবি ( বিশর ইবনুল বারাআত ইবনু মা' রুর আল আনসারী) মারাও গেছে, যেটা প্রমাণ করে যে উক্ত বিষ.... কারণ ওই বিষ ' নিরব ঘাতক বিষ' হলে সাহাবি সাথে সাথে মারা যেতেন না । তো আমরা দেখতে পাচ্ছি যে নাস্তিকদের এই দাবিটাও Valueless।
পয়েন্ট নাম্বার থ্রি
_______________
- এই বিষ পানের ঘটনাটা কি নবী সাঃ এর নবুয়তকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ???
জবাব
______
না একদমই না, বরং এই বিষ রিলেটেড ঘটনা নবী সাঃ এর নবুয়তের আরেকটা বড় প্রমাণ, কারণ, আমরা যদি বুখারীতে দীর্ঘ ঘটনাটা দেখে তাহলে দেখতে পাবো যে " নবী সাঃ এর হাতে থাকা রানের মাংস নিজেই বলেছে যে এটাতে বিষ মিশানো ( এটা একটা মোজেজা) । একটা প্রশ্ন আপনাদের মাথাই আসতে পারে সেটা হলো নবী সাঃ কিছু মাংস খাওয়ার পর কেন রানের মাংসটা বলল যে এটাতে বিষ মিশানো???
তো এর উত্তর মূল ঘটনাতেও আছে, সেখানে যদি আপনারা লক্ষ্য করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে " যয়নব( বিষ প্রদানকারী মহিলা) কে যখন তলব করে নবী সাঃ এর সামনে নিয়ে আসা হলো আর তাকে প্রশ্ন করা হলো ' তুমি এরকম কেন করলে?? তখন মহিলা বলেছিল যে ' এটা পরীক্ষা , যদি আপনি সত্য নবী হতেন তাহলে আপনি বিষ পান করে মারা যেতেন না আর মিথ্যা নবী হলে মারা যেতেন '। এর মানে হলো বিষ পান করে আসলে নবী সাঃ এর কি হতো সেটাই মূলত দেখার ছিল, যার কারনে কিছু বিষমিশ্রিত মাংস নবীজি খান ( যদি না খেতো তবে মহিলার পরিকল্পনা তো.....) তারপর বলে, যাতে এটা বলতে না পারে তিনি বিষ খান.... আর মৃত্যুও হয় নি, কিন্তু ঘটনা এমন ঘটেনি বরং তিনি বিষমিশ্রিত মাংস খেয়েছে তারপরও কিছু হয় নি । আশা করি প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন।
- আর হ্যা নবী সাঃ কিন্তু এই ঘটনা আগে থেকেই জানতো যে তাকে বিষ পানে হত্যা করা..... । সহীহ বুখারী, হাদিস নং : ৫৭৭৭ হাদীস এতে আপনারা সেই ঘটনা পেয়ে যাবেন( হাদীসটা বড়, এটা এখানে এড করলে লেখাটা আরও বড় হবে, তাই লেখলাম না)
পয়েন্ট নাম্বার ফর
__________________
Exmuslimsahil নামক ( আমি একটু কনফিউজড এটা কি কোনো ব্যাক্তির ফেইসবুক আইডির নাম নাকি কোনো ওয়েবসাইট এর নাম) ব্যাক্তি তার লেখাতে দাবি করে যে ( উক্ত দাবি কিছু ওয়েবসাইট এতেও করা হয়, সংশয় ডট কম ওরফে গাঁজা ডট কম এতেও এই দাবি করা হয়েছে) নবী সাঃ এর মৃত্যু নাকি আল্লাহ প্রদত্ত শাস্তি , প্রমাণ হিসাবে সূরা হাক্কাহ এর ৪৪ -৪৬ আয়াত নিয়ে আসে, যেখানে বলা হয়েছে যে " যদি মোহাম্মদ সাঃ নিজের থেকে বানিয়ে আল্লাহর নামে কিছু বল তো তাহলে তাঁর ডান হাত ধরে তাঁর শিরা কেটে দেওয়া হতো " ( এরকম হবে হয় তো আয়াতটা) "
+ আরেকটা হাদীস আছে যেখানে তিনি ( লেখার প্রথম পয়েন্টেও এই হাদীস বলেছি) নবী নিজে থেকেই বলেছে " তাঁর শিরা যেনো....... কেটে ফেলার মতো কষ্ট হচ্ছে ।
- ثُمَّ لَقَطَعۡنَا مِنۡہُ الۡوَتِیۡنَ ﴿۫ۖ۴۶﴾
ছু ম্মা লাকাতা‘না-মিনহুল ওয়াতীন।
এবং কেটে দিতাম তার জীবন-ধমনী।
And then certainly should have cut off his life artery (Aorta), ( সূরা হাক্কাহ, আয়াত-৪৬)
এই আয়াতে Aorta( শিরা) বা জীবন ধমনি এর আরবি প্রতিশব্দ হলো ' ওয়াতিন ' আর হাদীসে শব্দ এসেছে আবহার ( হাদীসটা বড় হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ আরবিটা এখানে উল্লেখ করতে পাচ্ছি না, গুগলে সার্চ করে আরবিটা দেখে নিবেন, ধন্যবাদ)
ওয়াতিন বর আবহার কিন্তু এক জিনিস না, যদিও ইংরেজিতে দুটো শব্দের অর্থ Aorta করা হয়েছে, তবুও এই দুই আরবি শব্দের আলাদা মানে আছে। ওয়াতিন এর মানে হলো বুকের শিরা আর আবহার মানে হলো পিঠের শিরা । কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলছেন পিঠের শিরা কেটে দিবেন আর হাদীসে নবী সাঃ বলছেন বুকের শিরা কেটে দেওয়ার মতো যন্ত্রনা হচ্ছে, এর মানে হলো কোরআনের আয়াত ও হাদীস একেবারেই আলাদা বিষয়কে নির্দেশ করছে।
- আরেকটা কথা আল্লাহ বলছেন ডান হাত ধরে তাঁর শিরা কেটে দেওয়া..... , কিন্তু হাদীসে আমরা এরকম কোনো তথ্যই পয় না, তাই উক্ত আয়াত দিয়ে তাঁরা যে দাবি করে সেটা সম্পূর্ণ মাতলামি।
- আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন, নাস্তিকরা তো কোরআনকেই মানে না, তাহলে তারা কোরআনের সূরা হাক্কাহ থেকে আয়াত দিয়ে কেন প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে নবী সাঃ ভন্ড??? ( আল্লাহ মাফ করুক) । তাহলে তো তাঁরা নিজেরাই কোরআনের সত্যতা স্বীকার করে নিচ্ছে তাই না( তাদের দাবি অনুসারে) ।
পয়েন্ট নাম্বার -৫
______________
ধরি নবী সাঃ এর মৃত্যু বিষ প্রয়োগ এর সাথে সাথে হয়েছিল, তাহলেও কি এটা কোনোভাবে প্রমাণ করে নবী সাঃ ভন্ড ( আল্লাহ মাফ করুক,আমিন, আমিন, সুম্মা আমিন)।
উত্তর হলো না, একদমই না, কারণ আমরা নবী সাঃ এর আগেও অনেক নবী রাসূলকে দেখেছি যে ' তাদের হত্যা করা হয় ' যেমন যাকারিয়া নবী, তাকে তো হত্যা করা হয়, এটা হাদীসেও আচে, আবার বাইবেলেও আছে, এছাড়াও আহলে কিতাবিদের গ্রন্থ বাদ দিলেও অন্য ধর্মের গ্রন্থগুলোতে দেখা যায় যে তাদের অবতারদের....... । তাই বলা যায় নবী সাঃ এর বিষ পানে মৃত্যু হওয়ার কারণে তাকে শহীদ ( জিহাদ করে মারা গেলেই তাকে শুধু শহীদ.... ) হিসাবে গন্য করা হ তো, এই ঘটনা কোনো ভাবেই রাসূল সাঃ এর নবুয়তকে....... । আশা করি কথা ক্লিয়ার।
পয়েন্ট নাম্বার- ৬
_______________
যদিও এই লেখার সাথে এটা প্রাসঙ্গিক না। অনেকে বলে যে নবী সাঃ এর জন্ম হয়েছে তাঁর পিতার মৃত্যুর ৩ / ৪ বছর পর। এটা মিথ্যা কথা, কারণ নবীজির তাঁর মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাই তাঁর পিতার মৃত্যু হয় ( প্রমাণ মুসদাতরাক হাকিম ২/৬০৫)
আর হ্যা একজনকে কালকে দেখলাম গুগল এর একটা screenshoots দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে " নবীজি এর জন্মের ৬ মাস ( প্রাইমারি স্কুল এর ' ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই এতেও একই তথ্য আছে) আগে তার পিতা মৃত্যু বরণ করে। এটা নিয়ে ইতিহাসবিদের মাঝে মতবেদ আছে আর এটা হাদীসেরও কোনো কথা না।
তো..... এই ছিল..........
সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
️️মোঃ মেহেদী হাসান
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
®প্রিন্স ফ্রেরাস
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।