সত্যিই কি আল্লাহ কোরআনে বাইবেলকে অবিকৃত বলেছে?
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
আজকাল খ্রিষ্টানরা নিজের মিথ্যা ধর্ম এবং বিকৃত বাইবেলকে বাঁচাতে কোরআনের অর্থের ভুল অর্থ নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। এই নাপাক খ্রিষ্টান ভন্ড যীশুর মুরিদ একটা গরুর রচনা লেখেছে যেখানে এটা প্রমাণ করতে চাইল যে কোরআন অনুসারে বাইবেল অবিকৃত এবং এটা নাকি মুসলিমদেরও বিশ্বাস করতে হবে......। যাইহোক এখন আমরা তার আরগুমেন্ট এর খন্ডন করব ইনশাআল্লাহ ।
তো চলুন শুরু করা যাক....
প্রথমত সে দুটো উসূল লঙ্গন করেছে -
১. টেক্সট অনুসারে শব্দের অর্থ নেই নি
২. সালাফ বা ইজমায়ি ফাহম নেই নি....
মূল পয়েন্ট এতে ঢুকি। সে সূরা হিজর এর ৯ নং আয়াত নিয়েছে প্রথমে, যেখানে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন যে -
" اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّکۡرَ وَ اِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ ﴿۹﴾
আমিই জিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক" ( কোরআন-১৫/৯)
এখন সে এই আয়াত দিয়ে বলতেছে যে এখানে যিকর অর্থ নাকি কোরআন নেওয়াটা ভুল কেননা যিকর দ্বারা এখানে তাওরাত ইন্জিল এসব কিতাবের কথাটাও বুঝিয়েছে, আর যিকর অর্থ যে তাওরাত, ইন্জিল বা অন্যান্য আসমানি কিতাবও হয় তার প্রমাণে কয়েকটা আয়াতও পেশ করল এবং শেষে গিয়ে উপসংহার এই বলে টানলো যে " যেহেতু এই আয়াত দ্বারা সব আসমানি কিতাব বুঝিয়েছে তাই বাইবেলকেও বিশ্বাস করতে হবে অবিকৃত হিসাবে, আর যে করবে না তার ইমান থাকবে না সে কুফর করবে ইত্যাদি ইত্যাদি ......
জবাব: হ্যা এটা আমরাও জানি যে যিকর বলতে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবকেও বুঝানো হয়ে থাকে, যেমনটা সূরা সাফফাত -৬৭-৬৮, আম্বিয়া-৪৭ নং আয়াতে এসেছে....। কিন্তু প্রশ্ন হলো যিকর দ্বারা পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব বুঝানো হয় বলে কি সূরা হিজর এই ৯ নং আয়াতেও সকল আসমানি কিতাব এর কথা বলা হয়েছে? নাকি শুধু কোরআন এর কথা?
এর উত্তর হবে শুধু কোরআন এর কথা বলা হয়েছে Not সকল আসমানি কিতাব এর কথা... । প্রথমত আমরা জানি যে একটা শব্দের একাধিক অর্থ থাকে,এখন কোন অর্থ কোথায় বসবে না বসবে এটা নির্ভর করে শব্দটা কোন বাক্যে কি ভাবে ব্যবহার হয়েছে, আর এটা কোরআনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। উক্ত আয়াতে ( কোরআন-১৫/৯) এতে ' যিকর ' শব্দটা কোন অর্থে ব্যবহার হয়েছে তা বুঝতে এর আগের এবং পরের আয়াতগুলো দেখতে হবে তাহলে এই আয়াতে যিকর দ্বারা কি শব্দ উদ্দেশ্য তা পরিষ্কার হয়ে যাবে....। চলুন আগের আয়াতগুলো একটু দেখি -
الٓرٰ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ وَ قُرۡاٰنٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۱﴾
আলিফ লাম রা। এগুলি আয়াত, মহাগ্রন্থের, সুস্পষ্ট কুরআনের। ( কোরআন-১৫/১)
যারা কুফরী করেছে, তারা একসময় কামনা করবে যদি তারা মুসলিম হত!(১৫/ ২ নং আয়াত)
তারা বলেঃ ওহে, যার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে! তুমিতো নিশ্চয়ই উম্মাদ ( এটা হিজরের ৬ নং আয়াত)
আমিই জিকর (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক। ( ১৫/৯ নং আয়াত)
তারা কুরআনে বিশ্বাস করবেনা এবং অতীতে পূর্ববর্তীদেরও এই আচরণ ছিল।( ১৫/১৩ নং আয়াত)
আমি এখানে আগে এবং পরের কিছু আয়াত নিয়েছি। এখন লক্ষ্য করুন সূরার প্রথমে আল্লাহ কোন কিতাবের নাম নিয়েছে? উত্তর আল কোরআন। সূরার দ্বিতীয় আয়াতে মুসলিম হওয়ার কথা বলা হচ্ছে , আর মুসলিম তখনি হবে যখন দ্বীন ইসলাম গ্রহণ করবে কেননা এটাই একমাত্র দ্বীন( ইমরান-১৯) আর আমাদের মুসলিম না হয়ে মৃত্যু বরণ করা নিষেধ...। পরবর্তী ৬ নং আয়াতে নবীকে উম্মাদ এর কথা বলা হয়েছে, আর আল্লাহ এখানে কাফেরদের কথাটা কোড করেছে..। শেষে ( ১৩ নং আয়াত ন) আয়াত এতে পূর্বর্তী নবীদের কথা নিয়ে আসা হয়েছে যাদের সাথে কাফেররা এসব আচরণ করেছে, মানে নবীদের উম্মাদ, জাদুকর এসব বলেছে....। আপনারা এই সূরার ১-১৫ নং আয়াত পড়ুন, যদি পড়েন তাহলে দেখতে পারবেন যে কনটেক্সট অনুসারে এখানে ' যিকর ' দ্বারা সকল আসমানি কিতাব না বরং কোরআন উদ্দেশ্য... কেননা এই সূরার শুরুতেই কোরআনের কথা বলেছে, আর সেই আয়াত থেকে পরবর্তী আয়াতগুলো কোরআনকেই রিপ্রেজেন্ট করছে, হিজর-৯ নং আয়াত নাযিল হয়েছিল এই কারণে যে ' তারা নবীর উপর বিদ্রপ করত এবং নবীর উপর নাযিল হওয়া কিতাবে সন্দেহ করত এবং নবী সত্য বলছে কিনা তা যাছাই করার ফর্মুলা হিসাবে ফেরেশতাদের সাক্ষ্য নিয়ে আসতে বলত যেমনটা এই সূরার ৭-৮ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, আর তাদের কাউন্টার হিসাবেই পরে হিজর-৯ নং আয়াত নাযিল করে কাফেরদের এই জবাব দেয় যে ' এটা আল্লাহ হতে রক্ষা করা হয় ' আর তোমরা যেসব যুক্তি নিয়ে আসছো তা ভ্রান্ত, আর সকল যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে আমি আল্লাহই এই কিতাবের সংরক্ষণকারী......। এই সূরার ১-১৫ আয়াতে আমাদের নবীকে করা কেন্দ্র করেই আলোচনা করা হচ্ছে তাই এই আয়াতের ( হিজর -৯) এতে যে নবীর উপর নাযিল হওয়া কিতাবের নাম বলা হয়েছে তা তো কমন সেন্স এর দাবি... । এছাড়াও কোরআনে তাওরীত ইন্জিল যে বিকৃত এবং তা ইহুদি নাসারা করেছে তা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন, যেমন -
“...তাদের একদল আল্লাহর কালাম শুনত, তারপর তা বুঝে নেওয়ার পর বিকৃত করত।”( সূরা বাকারা ২:৭৫)
“ইহুদিদের মধ্যে এমন লোক আছে যারা কথা বিকৃত করে তাদের যথাস্থান থেকে সরিয়ে দেয়...”( সূরা নিসা ৪:৪৬)
এসব আয়াতে ইহুদি নাসারা এবং তাদের কিতাব বিকৃত এর কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন যখন নিজেই তাওরাত ইন্জিল বা আগের আসমানি কিতাবগুলো বিকৃত করার কথা সরাসরি উল্লেখ করেছেন তখন কোন যুক্তিতে আল্লাহ ওই আয়াতে (১৫/৯) যিকর দ্বারা সকল আসমানি কিতাব এর কথা বলবে? তাই বিবেক এবং যুক্তি ও আয়াতের কনটেক্সট এটা সাবিত করে না যে আল্লাহ হিজর-৯ এতে সকল আসমানি কিতাব এর কথা বলেছে... বরং সেখানে কোরআনের কথায় বলা হয়েছে..... । দ্বিতীয় তো সূরা হিজর -৯ নং আয়াতে যে যিকর দ্বারা কোরআন এর কথা বলা হয়েছে এই ব্যাপারে পৃথিবীতে যত মুসলিম স্কলার এসেছেন আর বর্তমানে আছেন তারা সবাই একমত যে এখানে যিকর দ্বারা কোরআনকে বুঝাবো হয়েছে, আর এই বিষয়ে ইসলামের বাতিল ফেরকা ( যেমন শিয়া, মুশাব্বিহা, কাদরিয়া, জাবরিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি..) গুলোও ঐক্যমত পোষণ করেছে। আর নবীর হাদীস ও সাহাবীদেরও আসার এর আলোকেও এটা আমাদের কাছে দ্বীনের আলোর মতো পরিষ্কার যে ইজমায়ি দাবি হলো এটা যে " হিজর -৯ নং আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন যিকর দ্বারা শুধু কোরআনলে উদ্দেশ্য করেছে.. Not সকল আসমানি কিতাবকে.....। অতএব এই আয়াত ( হিজর-৯) দ্বারা সকল কিতাব উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্ত সৃষ্টিকরা মূর্খতা বৈ কিছুই না......। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো কোরআন নিজেই তো পূর্বের কিতাবগুলো তাদের পাদ্রী দ্বারা বিকৃত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন... যেমন -
“...তাদের একদল আল্লাহর কালাম শুনত, তারপর তা বুঝে নেওয়ার পর বিকৃত করত।”( বাকারা ২:৭৫)
“ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজেদের হাতে কিতাব লেখে, তারপর বলে: ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে।’”( বাকারা ২:৭৯)
“ইহুদিদের মধ্যে এমন লোক আছে যারা কথা বিকৃত করে তাদের যথাস্থান থেকে সরিয়ে দেয়...”( নিসা ৪:৪৬)
“...তারা আল্লাহর কালাম বিকৃত করেছে তাদের যথাস্থান থেকে...” ( মায়েদা ৫:১৩)
“...তারা কথা বিকৃত করে তাদের স্থান পরিবর্তন করে...”( মায়েদা ৫:৪১)
“তাদের একটি দল নিজেদের জিহ্বা কাত করে কিতাব পাঠ করে, যাতে তোমরা মনে কর এটা কিতাবের অংশ, অথচ তা কিতাবের অংশ নয়...”( ইমরান ৩:৭৮)
আর এসব আয়াতগুলো দ্বারা সকল মুসলিম স্কলাররা একমত হয়েছেন যে কোরআনের আলোকে আগের বসমানি কিতাবগুলো ( তাওরাত, ইন্জিল) সব বিকৃত....। কোরআন নিজেই অহরহ আয়াতে আগের আসমানি কিতাব বিকৃত বলেছে সুস্পষ্ট ভাবে আর কুথাকার কোন চুনোপুঁটি একটা আয়াত নিয়ে আসছে তার অর্থ পরিবর্তন করে বাইবেলকে অবিকৃত প্রমাণ করতে... যেটা হাস্যকর..... ।
আর সবচেয়ে বড় কথা কি জানেন, বাইবেল যে বিকৃত করা হয়েছে তা আমরা খোদ বাইবেল থেকেও সাবিত করতে পারি।
আর আমি এখানে এই বিষয়ে বাইবেল থেকে কয়েকটা সংক্ষিপ্ত পয়েন্ট নিয়ে আসছি -
---
পয়েন্ট - ১. আল্লাহর বাণী বিকৃতির অভিযোগ-
“তোমরা কেমন করে বলো, ‘আমাদের কাছে প্রভুর আইন আছে’? অথচ লেখকদের মিথ্যা কলম তা মিথ্যা করেছে।”
( যিরমিয়াহ- 8:8)
এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে লেখকরা (scribes) আইনকে বিকৃত করেছে। আর এই ভার্স থেকে আমরা সরাসরি বুঝতে পারছি যে বাইবেল এতে সংযোজন করে তা অনেক আগেই বিকৃত করা হয়েছে.....।
পয়েন্ট-২. মানুষ নিজের ইচ্ছায় কিছু লিখেছে
“তোমরা জীবন্ত ঈশ্বরের বাণী বিকৃত করেছ, প্রত্যেকেই তার নিজের কথায়।” ( যিরমিয়াহ- 23:36)
এখান থেকেও বুঝা যাচ্ছে যে বাইবেল এতে বিকৃত করা হয়েছে....
এছাড়াও আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে খ্রিস্টানরা স্বীকার করে যে তাদের টেক্সট ভিন্ন ভিন্ন, অর্থাৎ বাইবেল এর টেক্সট এতে পার্থক্য আছে মোটাদাগে.... যেমন -
আজকের বাইবেলের মধ্যে Catholic Bible, Protestant Bible, Orthodox Bible প্রত্যেকের মধ্যে বইয়ের সংখ্যা আলাদা-
প্রোটেস্ট্যান্ট বাইবেল = ৬৬টি বই
ক্যাথলিক বাইবেল = ৭৩টি বই
ইথিওপিয়ান বাইবেল = ৮১টি বই
তো লক্ষ্য করুন যে আজকের থাকা বাইবেলের বিভিন্ন গ্রুপে থাকা বাইবেল একে অপর থেকে ভিন্ন এবং একদল আরপক দলের বাইবেলের কতগুলো অংশ ( বুক) নাকচ করে থাকে প্রক্ষিপ্ত বলে..... । আর তাদের এরকম কর্মকান্ড দেখে বাইবেলের একটা ভার্স মনে পরে গেলো, সেটা হলো -
“যদি কেউ এই বইয়ের কথাগুলোতে কিছু যোগ করে, ঈশ্বর তার উপর এই বইয়ে লেখা প্লেগসমূহ চাপাবেন। আর যদি কেউ এই বই থেকে কিছু বাদ দেয়, ঈশ্বর তার অংশ কেটে ফেলবেন...” ( প্রকাশিত বাক্য 22:18–19)
এখন খ্রিষ্টানরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক যে কোন দল স্বর্গে যাবে আর কোন দল নরলে যাবে কেননা তারা সবাই এই ভার্স ( পদ/ শ্লোক / আয়াত) অনুসারে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের কাছে কাফের......।
সারাংশ : বাইবেল নিজেই বলছে যে,
লেখকেরা পরিবর্তন করেছে (Jeremiah 8:8)
মানুষ নিজের মত করে সংযোজন করেছে (Jeremiah 23:36)
যোগ-বিয়োগ করলে ধ্বংস হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে (Deut. 4:2; Rev. 22:18-19)।
আর এসব পয়েন্ট এতে সাবিত হলো যে বাইবেল পুরোই বিকৃত । আর এগুলো মিলিয়ে স্পষ্ট হয়: বাইবেল বিকৃত হয়েছে, আর তাই আল্লাহ সর্বশেষ কিতাব কোরআনকে নিজেই সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন (হিজর ১৫:৯)।
যাইহোক আমি আমার পুরো লেখাটা লেখতে বিভিন্ন তাফসীর যেমন -
তাফসীরে ইবনে কাছীর
তাফসীরে মাআরিফুল কোরআন
তাফসীরে ফাতহুল বয়ান
তাফসীরে তাবারী
তাফসীরে জালালাইন
এসব তাফসীরের সাহায্য নিয়েছি, আর বাইবেল সংক্ষিপ্ত উক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার জন্য আমি " কন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যারের লেখা " বাইবেল পরিচিত ও পর্যালোচনা " এবং তার অনুবাদকৃত " ইযহারুল হক " এর সাহায্য নিয়েছি....। আপনারা উক্ত দুই বই পড়ে দেখতে পারেন সেখানে বিস্তারিত এবং বৃহৎ আকারে বাইবেলের অনেক বিকৃত এর সাক্ষ্য প্রমাণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে.............
খন্ডন সমাপ্ত.......
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন,
লেখক : মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।