সত্যিই কি কোরআনে বলা আছে চাঁদের নিজস্ব আলো আছে?
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
প্রথমে আয়াতটা দেখে নেই, যেটা সে পেশ করেছে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন-
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ جَعَلَ فِی السَّمَآءِ بُرُوۡجًا وَّ جَعَلَ فِیۡہَا سِرٰجًا وَّ قَمَرًا مُّنِیۡرًا ﴿۶۱﴾
কত মহান তিনি, যিনি নভোমন্ডলে সৃষ্টি করেছেন তারকারাজি এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ ও জ্যোতির্ময় চাঁদ!
( অনুবাদক: মুজিবর রহমান)
( কোরআন-২৫/৬১)
উক্ত আয়াতে সূর্যের জন্য এক শব্দ এবং চাঁদের জন্য আরেক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। সূর্যের জন্য সিরাজ এবং চাঁদের জন্য মুনীর শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো আল্লাহ যদি কোরআনে চাঁদের জন্য বাস্তবিক অর্থেই যদি আলো সাবিত করতে চাইতেন তাহলে তো সূর্য এবং চাঁদের ক্ষেত্রে একই শব্দ ব্যবহার করে দিতেন, কিন্তু আল্লাহ তা ব্যবহার না করে আলাদা শব্দ ব্যবহার করলেন কেন? মূলত এই প্রশ্নের উত্তরেই প্রকৃত জবাব বিদ্যমান আছে। কোরআনে সূর্য এবং চাঁদের জন্য এরকম আলাদা শব্দ আল্লাহ ব্যবহার করেছেন, যেমন - সূর্যের জন্য দ্বিয়া ও সিরাজ এবং চাঁদের জন্য মুনীর ও নূর..... ।
সূর্যের জন্য যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সে শব্দ চাঁদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নি আবার চাঁদের জন্য যে শব্দ ব্যবহার হয়েছে সেটা আবার সূর্যের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় নি। আর এরকম একটার শব্দ আরেকটাতে ব্যবহার না করার বিষয়টা সাবিত ( প্রমাণ) করে যে এসব শব্দের আলাদা আলাদা মানে আছে।
তো উক্ত আয়াতে ব্যবহিত " সিরাজ " দ্বারা সূর্য উদ্দেশ্য এবং এই সিরাজ ও আসলে কি তার ব্যাখ্যাতে সূরা ইউনুস-৫ নং আয়াতের ব্যাখ্যাতে "তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ এতে বলা হয়েছে যে -
"কুরআনে সূর্যকে বুঝাতে الشَّمْسَ (শামস) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আবার السراج (সিরাজ) শব্দটি দ্বারাও সূর্যকে বুঝানো হয়ে থাকে, যার অর্থ বাতি বা মশাল। অন্যত্র সূর্যকে الشَّمْسَ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ হলো প্রজ্জ্বলিত বাতি। এখানে একই অর্থ বুঝানোর জন্য ضِيَا۬ءً শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে উজ্জ্বল জ্যোতি। তিনটি বর্ণনার সবই সূর্যের জন্য উপযোগী। কারণ, সূর্য নিজ দহনক্রিয়ার মাধ্যমে প্রচণ্ড তাপ ও আলো উৎপন্ন করে " ( ইউনুস-৫ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)
উক্ত তাফসীর থেকে আমরা এটা বুঝতে পাচ্ছি যে সিরাজ দ্বারা এমন কিছু বুঝায় যার নিজস্ব তেজ বা আলো আছে। সূর্য এর নিজস্ব তেজ এবং আলো আছে বলেই তার উপর নাম সিরাজ বা প্রদীপ বলা হয়েছে। প্রদীপ বলার কারণ হলো প্রদীপের আলো বা তেজ নিজের আলো ধার করা আলো নয়....। তাই সূর্যের জন্য সিরাজ শব্দ ব্যবহার হলেও চন্দ্রের জন্য তা করা হয় নি..... ।
এখন আমরা তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ থেকে মুনীর এর ব্যাখ্যাটাও দেখে নিচ্ছি -
" আর চাঁদকে বলা হয়েছে الْقَمَرَ (কামার), একে منير (মুনির) ও বলা হয়েছে। যার অর্থ স্নিগ্ধ আলো দানকারী। তাছাড়া চাঁদ হচ্ছে একটি নিষ্ক্রিয় জিনিস, যা সূর্যের আলোকে প্রতিফলিত করে, চাঁদের এ বৈশিষ্ট্যের সাথে কুরআনের বর্ণনা হুবহু মিলে যায়। কুরআনে একবারের জন্যও চাঁদকে السراج (সিরাজ) وهاج (ওয়াহহাজ) বা ضِيَا۬ءً (জিয়া) হিসেবে এবং সূর্যকে نُوْرً (নূর) منير (মুনীর) হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, কুরআন সূর্যের আলো এবং চন্দ্রের আলোর পার্থক্যকে স্বীকার করে। এরূপ আয়াত সূরা ফুরকানের ৬১ নং এবং সূরা নূহের ১৬ নং এ উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং চাঁদের আলো প্রতিফলিত আলো, যা বর্তমান বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে অথচ কুরআন তা ১৪০০ বছর পূর্বে প্রমাণ করেছে " ( ইউনুস -৫ / তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ)
তো আমরা তাফসীর থেকে বুঝতে পাচ্ছি যে মুনীর বলতে এমন বস্তুকে বুঝায় যার নিজের কোনো আলো নেই কিন্তু অন্য কোনো বস্তু থেকে আলো নিয়ে সে নিজেকে আলোকিত করে। চন্দ্র যেহেতু সূর্যের আলোতে আলোকিত হয় তাই চাঁদকে মুনীর বা নূর বলা হয়েছে। এরকম করে বিভিন্ন তাফসীরে এটা খুলাসা করা হয়েছে যে মুনীর, সিরাজ বা দ্বিয়া, নূর এগুলোর মর্মার্থ আলাদা যদিও তা সমার্থক মনে হয় আমাদের কাছে.......
দেখুন -
তাফসীরে আহসানুল বয়ান
তাফসীরে ফাতহুল মাজিদ
তাফসীরে ইবনে কাছীর
তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া
তাফসীরে কাদীর
তাফসীরে উসমানি
আর এসব শব্দগুলোর মধ্যে যে পার্থক্য আছে তা ব্যাকরণ দ্বারাও সমর্থিত ( উমদাতুল হুফফায, মুজামুল ফুরকিল লুগুইয়াহ, মিশকাতুল আনওয়ার ইত্যাদি কিতাব দ্রষ্টব্য)
অতএব আমরা বলতেই পারি যে ব্যাকরণ এবং তাফসীরকারকদের বিশ্লেষণ অনুসারে চাঁদের আলোকে কোরআনে প্রকৃত আলো নয় বরং প্রতিফলিত আলোই বলা হয়েছে। অতএব বিজ্ঞানের তত্ত্বই কোরআন তার সূক্ষ্ম শব্দচয়নের মাধ্যমে প্রমাণ করে দিয়েছে যে চাঁদের আলো নিজস্ব আলো নয় বরং তা প্রতিফলিত আলো......
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।