সাহিত্য —
তিন বর্ণের বিমূর্ত আবহে জন্ম নেওয়া এমন এক আশ্চর্য শব্দ। এক অনন্ত বৃক্ষ—যার শাখা-প্রশাখায় জড়িয়ে আছে অনুভবের নদী, কল্পনার গঙ্গা। সেই শব্দ, আর তার অন্তর্লীন স্রোত, শত শত সেঞ্চুরিতে শিহরণ তুলেছে অগণন আবেগী হৃদয়ে। যে বৃক্ষের চারার রোপণ আর চাষাবাসে দিন গড়িয়ে রজনী হয়েছে, বিস্তৃত হয়েছে মানুষের মনোজগতে—চেতনার গভীর মাটিতে।
—উদাস দুপুর। গ্রীষ্মের মেঘ রোদ্দুর আকাশ। পাকাধানে বৈশাখের ঝড়ো হাওয়া। সাথে এক পশলা বর্ষার হিম হিম ঘ্রাণ। এমনই একটি অসহ্য সুখের উচ্ছ্বাসি মুহূর্তে কত-শত কবি,ঋষি, সুফি, ঢের কাব্যিক, উন্মাদ সাহিত্যিক নদীর তটে বসে ঢেউ গুনতে গুনতে খেই হারিয়ে কখন যে নিজেই হারিয়ে গিয়েছিল গদ্যে ও পদ্যে। ছন্দে ও আনন্দে। কবিতায় ও ছবিতায়।
সেখান থেকেই তারা স্বীয় মনোজগতে রচনা ও সিঞ্চন স্ফীত করেছেন বিস্তর মলাট সাহিত্য সমগ্র। দেন হৃদয় থেকে বইয়ের পাতায় ফের বইয়ের পাতা থেকে নৃত্যে নৃত্যে ছবিতায় বা বাস্তবিতায়।
বাস্তব দৃশ্য পট থেকে পাঠক যখন দুরে, খুব দুরে, বহুকোষ দুরে, তখন সেই পাঠক কোন এক যান্ত্রিক কাঠামোর ব্যস্ত শহরে বসে হৃদয়ের ব্যালকনিতে উদ্ভাসিত পেয়েছে সেই দৃশ্যের অমায়িক বাতায়ন ও অবতারণা। খানিকটা অনুভব, অনেকটা অনুভুতি।
এখন প্রশ্ন হলো —
সাহিত্য কি? সাহিত্যের নিয়ন্তা কে? কি সেই উৎসমুখ, যা সাহিত্যের উদ্ভাসে প্রধান ভূমিকায়! এই জার্নালে আমি সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরার চেষ্টা করবো নির্মেদ,নির্মেঘ, উন্মুক্ত সঠিক সাহিত্য বসন্তের এক ফর্সা নান্দনিক আকাশ। তবে মৌলিক পর্ব পাঠের বর্নিল ও সুষমা ধারা এগিয়ে যাবে উলামায়ে দেওবন্দের সাহিত্য পাঠ, সাহিত্যের রস বিহারে প্রথম কদম ও মোড়ক উন্মোচনের পথ ধরে।
সাহিত্য কাকে বলে?
প্রখ্যাত আরবি ভাষাবিদ আহমদ হাসান যায়্যাত লিখেছেন—
“কোনো ভাষার সাহিত্য মানে সেই ভাষার কবি ও লেখকদের থেকে বর্ণিত অনুপম বক্তব্য, যাতে সূক্ষ্ম ভাব-কল্পনা, হৃদয়গ্রাহী বর্ণনা এবং সাবলীল বিষয়চিত্রায়ণ থাকে। তা এমন এক সম্পদ যা আত্মাকে মার্জিত করে, অনুভূতিকে শানিত করে এবং ভাষাকে করে সমৃদ্ধ ও সমুজ্জ্বল।”
এই সংজ্ঞার আলোকে সাহিত্যের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়। সাহিত্য শুধু শব্দের জাল নয়, বরং তা হৃদয়ের আলো, ভাবনার দীপ্তি, এবং অনুভূতির স্পর্শ। এতে থাকে চিন্তার সৌন্দর্য, বোধের গভীরতা, ও ভাষার মোহিনী বিভা।
—সাহিত্যের উৎস কী?
সাহিত্য সম্রাট আবু তাহের মিসবাহ (আদীব হুজুর) এক কথায় বলেন—
“সাহিত্যের উৎস হৃদয়। অন্য কিছু নয়। সুতরাং তুমি যদি সাহিত্যের অনন্ত রহস্যের জগতে প্রবেশ করতে চাও—তবে দুয়ার খোলো, হৃদয়ের বন্ধ দুয়ার।”
অর্থাৎ সাহিত্য জন্ম নেয় সেই হৃদয়ে, যে হৃদয় অনুভূতির গভীরে স্নান করে, শব্দের গর্ভে ধ্যানমগ্ন হয়, এবং ভাষার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত করে ভাবের রক্তধারা।
—সাহিত্য ও আল কুরআন
আহমদ হাসান যায়্যাতের প্রাগুক্ত সংজ্ঞাকে যদি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হয়, তবে আমরা দেখতে পাই—এই সংজ্ঞার প্রতিটি বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য ও পূর্ণতা যেন একত্রে প্রস্ফুটিত হয়েছে মহিমান্বিত এক গ্রন্থে, আর তা হলো—আল কুরআনুল কারীম।
এই গ্রন্থ কোনো মানুষের রচনা নয়, কোনো কবি বা সাহিত্যিকের ভাবনার ফলও নয়। এটি ঐশী। এটি মহান রচয়িতা, সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক—আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক ভাষাগত অলৌকিকতা। আল কুরআনের আয়াতসমূহে রয়েছে সাহিত্যিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ রূপ—উচ্চারণের সুর, ভাবের গভীরতা, চিত্রকল্পের নিপুণতা, শব্দের শৃঙ্খলতা এবং আবেগের আবেশ।
এ কারণেই প্রাচীন আরবের ভাষাবিদ, কবি ও সাহিত্যিকরা যখন এই কুরআন শুনেছে, তখন তাদের ভাষা স্তব্ধ হয়ে গেছে। তারা মুগ্ধ হয়েছে এর সুষমা ও শৈলীতে। কেউ বলেনি—‘এটা আমি লিখতে পারি’। বরং তারা স্বীকার করে নিয়েছে—"এই রচনা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।"
এই কোরআন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদেরও চ্যালেঞ্জ জানায়:
فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ
“এর অনুরূপ একটি সূরা আনো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।”
[সূরা ইউনুস: ৩৮]
এই কোরআনের ভাষা এমন একটি ভাষা যার সৌন্দর্যে অবিশ্বাসীরাও বিমোহিত:
মক্কার বিখ্যাত কবিরা যখন গোপনে কুরআন শুনত, তখন বলে উঠত—
"এটি মানুষের কথা নয়, এ তো জাদুময় শব্দস্রোত!"
إِنْ هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ يُؤْثَرُ
[সূরা মুদ্দাসসির: ২৪]
সুতরাং বলা যায়, আল কুরআন হলো সাহিত্যজগতের একক ও পরিপূর্ণ গ্রন্থ। এটি শুধু ধর্মীয় পাথেয় নয়, বরং তা ভাষার শ্রেষ্ঠ চূড়ান্ত রূপ, সৌন্দর্যের সর্বোচ্চ মাপকাঠি, এবং সাহিত্যপ্রেমী আত্মার জন্য এক অনন্ত রসধারা।
—সাহিত্য এক অপার দান, আর কুরআন সেই দানের পরম পূর্ণতা।
—সাহিত্য হৃদয়ের ভাষা, আর কুরআন হৃদয়কে আলোকিত করার ভাষা।
—সাহিত্য এক সৃজন, আর কুরআন সেই সৃষ্টির প্রভুর সরাসরি রচনা।
এই ভিত্তিতেই বলা যায়—
সাহিত্য প্রভুরই শান, আর কুরআন সেই শানের পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
—সাহিত্য চর্চায় উলামায়ে দেওবন্দ—
১/ সাইয়েদ মানাযির আহসান গিলানী রহ:
—সাহিত্যের ময়দানে উন্মুক্ত পদচারণায় প্রথম সারিতে যেই নামগুলো সদ্য ফোঁটা গোলাপের মতো মনুষ্য হৃদয়ে আবেগ ও স্পন্দন স্ফীত করে হযরত মানাযির আহসান গিলানী রহ: তাদের মধ্যে অন্যতম একজন। তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্যের প্রতি ছিলেন সিমাহীন একরোখা। যা তার পরবর্তী কালের হিমালয় ছোঁয়া রচনা সম্ভার, সাহিত্যের বিস্তৃত অরণ্যে একনিষ্ঠ আরাধনা, উপসেবা থেকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে।
—কাব্য সাহিত্যের সঙ্গে তার সখ্যতা ও মেলবন্ধন গড়ে উঠে সেই ছাত্র বয়সেই। পদ্য-সাহিত্য, নাত, মরসিয়া, শোকগাথা, মসনভী তথা কবিতার বিভিন্ন শাখায় তিনি বিচরণ করেছেন সদর্পনে। অসংখ্য কবিতা পদ্য ও ছড়ায় তিনি তার কাব্য প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন।
—যখন তার শিক্ষা জীবনের সুরভিত তরি ওপারে ভিড়বে ভিড়বে,তখন তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বিভিন্ন জার্নালে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখি ও সাহিত্যের অঙ্গনে কতোটা সুনিপুণ, নির্মেদ দক্ষতা থাকলে একটা মানুষ শিক্ষা জীবনের ইতি টানতেই 'আল কাসিম' ও 'আর রশীদের' মতো মাজাল্লার প্রকাশনা ও সম্পাদনা র দায়িত্বে দায়িত্বে অবতীর্ণ হতে পারেন! মাও: গিলানী রহ: পত্রিকা দুটির প্রকাশনা ও সম্পাদনা র দায়িত্বই পালণ করেন নি শুধু! তাকে পত্রিকা দুটির প্রতিটি সংখ্যায় একটি করে প্রবন্ধও লিখতে হতো।
—একটি আশ্চর্যরকম চিত্তাকর্ষক তথ্য যা মাও: গিলানী রহ: এর শিষ্য মরহুম ডা:গোলাম মোহাম্মদ মাকালাতে ইহসানী-তে তুলে ধরেছেন।মাওলানা গিলানী রহ: এর কোন বই রীতিমতো লেখার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধিনে গ্রন্থবদ্ধ হয়নি। এমনটাই ঘটেছে যে-কেউ একজন এসে কোন বিষয়ে কলম ধরার অনুরোধ করেছেন, আর হযরত গিলানী রহ:ও লিখতে বসে গেলেন। যতোক্ষণে মাওলানা র লেখা পুর্নতা পেলো, ততক্ষণে সেটি আর প্রবন্ধ থাকেনি, হয়ে গেছে বিস্তৃত এক মলাট গ্রন্থ। সুবহানাল্লাহ!!
—মাওলানা গিলানী রহ: এর বিস্তৃত লেখ্য ভান্ডার ও রচনা সম্ভার তার কলমের গতি ও ধীমান লিখিয়ে সাহিত্যিক ও কাব্যিক হওয়ার জাজ্বল্যমান বার্তা বহন করে। মাওলানা গিলানী রহ : এর কলম থেকে নান্দনিক বাক্য সমগ্র এমন ভাবে বর্ষিত হতো যেভাবে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হয়।তার কলম ও কলব থেকে বৈচিত্র্যময় সব শব্দের উৎসারণ দেখে মনে হতো মাটি ফুঁড়ে ঝর্ণার পানি বের হচ্ছে।
—তার রচণার প্রতিটি বাক্য হতো গভীর চিন্তাপ্রসূত ও আবেগঘন। যা পাঠক হৃদয়ে অপূর্ব মাধূর্যতার তুমুল ঝড় তুলতো। উদ্বেলিত করতো।সৃষ্টি করতো অপার্থিব সম্মোহন। জানিনা কেন এই মর্তলোকের নক্ষত্রের প্রতি হৃদাসনে সুপ্ত এতোটা ভালোবাসা! এতোটা প্রণয় প্রভা! হয়তো তার রেখে যাওয়া কীর্তিই এর অনবদ্য কারণ।
—এই ক্ষুদ্র পাতায় তার সমুদ্রসম অথৈ কাহিনী তুলে ধরা আদৌ সম্ভব নয়,বরং এর জন্য প্রয়োজন সুবিশাল ও বিস্তীর্ণ ধারাবাহিক জীবনালেখ্য।
২/সাইয়েদ ইউসুফ আল বানুরি রহ:
—সাহিত্যের উচ্ছাসিত জল হাওয়ায় সিঞ্চিত হওয়া আরো একটি প্রভাময় নাম—সাইয়েদ মোহাম্মদ ইউসুফ আল বানুরি রহ:। সেই পড়ন্ত বেলায়, যখন সবে শিক্ষা দীক্ষার সাথে আবছা আবছা সম্পর্কের বাঁধন। তখন থেকেই তিনি হৃদয় মাজারে লালন করেছেন আরবি সাহিত্যের এক মহান তপস্বী হওয়ার নিবিড় স্বপ্ন।
—কাবুলের কোন এক সাহিত্যপ্রেমী মন্ত্রী একবার তাকে মিসরীয় সাহিত্যিকদের কিছু বই হাদিয়া দেন, যা তিনি গভীর অদ্যাবসা ও নিবিড় উপসেবায় অধ্যয়ন করেন। এরপর তিনি যখন দেশে ফিরলেন, ততোদিনে তিনি খুব সুন্দর ও মার্জিত রুপে আরবি লেখার দক্ষতা অর্জন করে পেলেন। অথচ তার জীবনে তখনও পর্যন্ত 'মাকামাহ'আসেনি।
—কৈশরেই তিনি অপার্থিব গঠন, শানিত ও সাবলিল সাহিত্যপূর্ন আরবি ভাষায় সহপাঠিদের নিকট চিঠিপত্র লিখতেন, এভাবেই এক কিশোর তার জীবনের সবুজাভ অধ্যায়ে নির্মল সাহিত্যের নীরব সংগ্রামী হয়ে উঠেন। পরবর্তী সময়ে আল্লামা বানুরি রহ : এর আরবি সাহিত্যমান, গদ্য, পদ্য, বলা, ও লেখায় যে অপ্রত্যাশীত অবস্থান তৈরি হয়েছিলো সত্যিই তা দুর্লভ। মা'আরিফুস সুনান, নাফহাতুল আম্বার সহ বিবিধ রচনা তার জলন্ত প্রমাণ।
তার এই অযাচিত প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে এক সময় আরবি সাহিত্যিকগণও একথা বলতে বাধ্য হন যে-
يا شيخ! لست هنديا، بل انت عربي، تخفى نحلك العربي للمصلحة
শায়খ! আপনি হিন্দুস্তানী নন। আপনি আরবি।কোন কারণে হয়তো আপনি আপনার আরবীয় পরিচয় গোপন রেখেছেন।
..يا للعجب— কতোটুকু নিরেট, সচ্ছ দক্ষতা আরবি সাহিত্যে অর্জন করলে আরবিরা তাকে হিন্দুস্তানি হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করে। এমনকি আরবিয় বলেই দাবি করে বসে।
—এই মহান ব্যাক্তিত্ব এক জীবনে যতটুকু সাহিত্য রস সুপেয় হিসেবে গ্রহণ করেছেন পুরোটাই একান্ত নিজের চেষ্টা প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও সাধনার ফল।অথচ আমরা.....
৩/সাইয়েদ সুলাইমান নদবী রহ:
—সাহিত্যের প্রেম সরোবরে অবগাহন করা অন্য একটি সবুজাভ বসন্তের অনিন্দ্য প্রতিচ্ছবি—সাইয়েদ সুলাইমান নদবী রহ:। যিনি বিশ্রুত আরবি সাহিত্যিক ও বিদগ্ধ পন্ডিত মাওলানা ফারুক চরয়াকোটীর সাহিত্য সুধাসার ও অমৃত বর্ষণে সিক্ত হয়ে নিজেকে তৈরি করেছিলেন নির্গূড় শুকতারা রুপে।
উপমাহীন এই উস্তাদের বদান্যতায় সাহিত্যের জটিল সব রহস্য, বিভিন্ন কোণ ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের সাথে সাইয়েদ রহ: এর হৃদয়ে গড়ে উঠে গভীর মিতালী ও মেলবন্ধন।
—দরস ও তালীমের পাশাপাশি সাহিত্য আরাধনা চলতে থাকে পুরোদমে। রচনা, অনুশীলন ও রিহার্সাল চলতে থাকে সমান তালে। ১৯০৪ সনে যখন "আন নদওয়া" পত্রিকা প্রকাশিত হতে শুরু করলো, তখন থেকেই তিনি সেখানে নিয়মিত লিখতে থাকেন। এরও এক বছর পূর্বে ইলম ও ইসলাম শির্ষক স্বরচিত তার একটি প্রবন্ধ প্রচুর সমাদৃত হয়। যা আঞ্জুমানে ইলম থেকে ছাপা হয়েছিলো। এছাড়াও অনুবাদ ও কাব্য চর্চার অবারিত হিল্লোলেও তার দখল ছিলো অতুল্য, নিরুপামেয়।
—একবার দারুল উলুম নদওয়াতুল ওলামার শিক্ষার মান যাচাইয়ের জন্য সেখানে নবাব মুহসিনুল মুলক এসেছিলেন। তখন তিনি সাইয়েদ সুলাইমান নদবী রহ: এর কাসিদা তৈরি, সাহিত্যপ্রেম,ও সাবলীল প্রাঞ্জল অনুবাদ প্রতিভার অনুভবে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— মুলক ও মিল্লাতের (সাহিত্য) খেদমতে বিহার প্রদেশ প্রতি যুগেই একজন সুলাইমান পেশ করবে।
প্রিয় হে প্রিয়রা!
এখানে তো শুধুমাত্র আমাদের কয়েকজন আকাবিরের সমুদ্রসম অথৈ কর্মমুখরতা থেকে দু এক চিমটি সুপেয় তুলে ধরেছি। এর বাইরে অলেখ্য রয়েগেছে আরো বিস্তর উলামা, তাদের জীবনের গল্প, এ পথের নির্লস সাধনার গল্প, নিরবচ্ছিন্ন তপস্যার গল্প। যাদের সাহিত্য চর্চা কাব্য প্রতিভা, ও ক্ষুরধার লেখনী ছাড়িয়ে গিয়েছিলো হিমালয় কিবা সুনন্দাকেও। যাদের এক একটি কলাম পাঠক হৃদয়ে চরমভাবে দাগ কাটতো, যার সাবলীলতা ও মাধুর্যতা হার মানাতো অমৃতকেও।
—সাহিত্যপ্রসবা অনিন্দ্য ব্যাক্তিত্ব আবুল হাসান আলী নদবী রহ: কে দেখুন—"মিনাল মাহদি ইলাল লাহদি" যার পুরো জীবনটাই কেটেছিলো সাহিত্য সংস্কার, উপসেবা ও আরাধনায়। যেখানেই সাহিত্যের সুরভিত ফুলেল বসন্ত, সেখানেই আলি মিয়ার উন্মুক্ত পদচারণা প্রানবন্ত।
—মুহাদ্দিসে কাবীর আল্লামা হাবীবুর রহমান আযমি রহ: এর দিকে একবার তাকান—যার অনর্গল মুখস্ত "মাকামাহ" পড়া দেখে হযরত শফী রহ: ও মাওলানা এ'যায আলী রহ: মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন—হ্যা মৌলভী সাহেব! তোমার আর আদব পড়ার প্রয়োজন নেই।
এছাড়াও হাজী এমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি, শাইখুল হিন্দ প্রমুখের কাব্যের কিতাব তো এখনও মুদ্রিত পাওয়া যায়। বিংশ শতাব্দীর এক আসমান সেতারা, যাদের চিনেনা এমন লোক খুজে পাওয়াই দুষ্কর—হযরত ত্বকি উসমানী হাফি: হযরত সুলতান যউক নদবী হাফি: হযরত মহি উদ্দিন খান রহ:। সাহিত্যের নির্লস সৈনিক বিদগ্ধ প্রভা হযরত আবু তাহের মেসবাহ (আদিব হুজুর)হাফি:। এমন সব সেতারা যাদের প্রতিটি কলম আমাদের অবচেতন মনে ফিরিয়ে দেয় চৈতন্যের নির্মল বাতাস। যারা এখনও আমাদের অন্তর্লোকে প্রজ্জলিত করে প্রেরণার ধুন। একবুক সাহস নিয়ে আঁধারের সয়লাব দুরিভুত করে এ পথে হেটে যেতে যারা এখনও উৎসায় দেয়।
হযরত আলী মিয়ার ৩টি উপদেশ—
পরিশেষে আরবি সাহিত্য সাধনার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্ব নিয়ে স্বরণ করিয়ে দিতে চাই হযরত আলী মিয়ার তিনটি উপদেশ। যা তিনি বাংলাদেশ সফরকালে ১৪ মার্চ ১৯৮৪ সনে জামেয়া এমদাদিয়ার প্রাঙ্গনে প্রদত্ত ভাষণে বলেছিলেন—
১/প্রিয় তালিবানে ইলম!
বাংলা ভাষাকে আপনারা অন্তরের মমতা দিয়ে গ্রহণ করুন এবং মেধা ও প্রতিভা দিয়ে বাংলা সাহিত্য চর্চা করুন। এদেশের মুসলিম সাহিত্যিকদের কে আপনারা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরুন।
২/ এ যুগে ভাষা ও সাহিত্য হলো চিন্তার বাহন। হয় কল্যাণের চিন্তা নয় ধ্বংসের চিন্তা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কে আপনারা শুভ ও কল্যাণের এবং ইমান ও বিশ্বাসের বাহন রুপে ব্যবহার করুন। ভাষা ও সাহিত্যের সকল শাখায় আপনারা যেন থাকেন দৃপ্ত পদচারণায়।
৩/বন্ধুগণ—
ওরা লিখবে, তোমরা পড়বে,—এ অবস্থা কিছুতেই বরদাশত করা যায়না। আমার কথা আপনারা লিখে রাখুন।দীর্ঘ জীবনের লব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা প্রদর্শন কিংবা বিমাতাসূলভ আচরণ এ দেশের আলিম সমাজের জন্য জাতীয় আত্মহত্যারই নামান্তর। (সংক্ষেপিত)
তবে বন্ধু ! ......
শেষ বেলায় আমার মতো আত্মভোলা, আবেগ প্রবণ সাহিত্যপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে একটি কথা বলবো—আমাদের অতি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের মুল গন্তব্য তথা ইলম ইস্তে'দাদ ও পাণ্ডিত্যের চূড়ায় আরোহনের কথা একদমই ভুলে না যাই।
আমাদের আকাবিরদের প্রধান লক্ষ্য ও মাকসাদ ছিলো ইলম আমল ও তাফাক্কুহ ফিদ-দ্বীন এর পর্বতশৃঙ্গে আরোহন। বাকি -কাব্য, সাহিত্য, এবং এ ধরণের অন্যান্য বিদ্যা ছিলো তাদের ইলম প্রচারের বাহনমাত্র। বলা বাহুল্য—এসবের ভেতর যদি ইলম আমল ও তাফাক্কুহ ফিদ-দ্বীন না থাকে, তাহলে তা যতই সাহিত্যপুর্ণ হোকনা কেন! মুসলমানের কাছে তা অন্তঃসারশূন্য মূল্যহীন হয়ে থাকবে। তাই আমাদের কে সতর্ক থাকতে হবে —বাহন অর্জন করতে গিয়ে যেন ইলম ও আমল তথা পুঁজিই খুইয়ে না ফেলি।
শেষ পাঠ—
—দিনের বিষন্ন ললাট ছুয়ে একটি আলোকরবি হলুদ আভা ছড়িয়ে লুকিয়ে গেছে পশ্চিমাকাশে। যেন এক মুমূর্ষ আদমি ঢলে পড়লো মৃত্যুর কোলে। অস্থায়ী এ ধরার বুক আচমকাই ছেয়ে গেলো তিমির আঁধারে। মনে হলো পৃথিবী থমকে গেছে।তারাদের দল রাতের আকাশে জোনাকির মতো আর কোলাহল করছে না।জোসনারা তিমির আধার কেটে ফসফরাস হয়ে থোকায় থোকায় ঝুলছে না। একটি নিশাচর অনিমিখে উড়ে যায় উত্তুরে হাওয়ায়। এমনই এক নিকষ কালো যুবতী রাত আমার দহলিজে...
—এভাবে কেটে গেলো কিছু সময়। হঠাৎ মনে হলো পৃথিবী আলোকিত হয়ে উঠছে। উবে যাচ্ছে আঁধারের ছিটে ফোঁটাও। যেন কোন এক ঐশী আলোর প্রসবণ নেমে আসছে পর্বত বেয়ে। কিন্তু বুঝতে পারলাম না! এ আলোর উৎস কি! কোন সে অদৃশ্য চাঁদ! যা ধরার বুক উজাড় করে উপচে দিয়েছে আলোর জোনাকি!
—অদৃশ্য থেকে ইলহাম হলো। আমি জানতে পারলাম এ আলো কিসের! এ নুরের ফিনিক কোথাকার! হ্যা! এই আলো সাহিত্যের। এই অদৃশ্য চাঁদ উর্ধলোকী সাহিত্যের উন্মুখ হৃদয়। মর্তলোকের কোথায় কোন এক নিভৃতলোকে একাকী নির্জন বসে এক আলিম সমাজ ব্যস্ত সময় কর্তন, সাহিত্য পুরোধা গ্রন্থ কোরআনি সাহিত্যরস চর্চায়....
■★তথ্য পুঞ্জি—
■১/তারীখুল আদাবিল আরাবী পৃষ্ঠা-৭
■২/তালিবানে ইলমের রোজনামচা।
■৩/আকাবিরে দেওবন্দের ছাত্র জীবন।
■৪/মাকালাতে ইহসানী।
■৫/মানাযির আহসান গিলানী, জীবন ও কর্ম।
■৬/ হায়াতে সুলাইমান।
■৭/জীবন পথের পাথেয়।
■৮/[সূরা ইউনুস: ৩৮]
■৯/[সূরা ইউনুস: ৩৮]
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।