প্রজ্ঞার সোপান কিতাব:
ভালোবাসা, সঞ্চয় ও নির্বাচনে সচেতনতার দীক্ষা” —রফিক আতা—
অতীতের সাথে বর্তমানের সেতুবন্ধনের অন্যতম মাধ্যম হলো কিতাব। ইতিহাস ও আছারের নিখুঁত, নির্ভেজাল সংরক্ষণে কিতাব ও কাগজ সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। আকাবির আসলাফদের মালফুযাত, ইসলামের তত্ত্ব ও তথ্যজ্ঞানসহ বহুমুখী, বর্ণাঢ্য জ্ঞানের নির্গূঢ় বিষয়গুলো যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত সুচারু রূপে সংরক্ষণ করা হয়েছে—কিতাবের পাতা ও কাগজের খাতায় আঁকা কিছু চিহ্ন, কিছু দাগের মাধ্যমে। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির এই উৎকর্ষের যুগে এসেও কাগজ ও কিতাবের শুভ্র পত্রের প্রতি জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিস্তারে বিন্দু মাত্র চাহিদা কমেনি।
যদি আমরা ঈষৎ চিন্তা করি, বুঝতে পারব— স্মার্টফোন বা প্রযুক্তির অন্য কোনো মাধ্যমে প্রাপ্ত পান্ডুলিপি বা PDF পাঠ ও অধ্যয়ন যতই করা হোক না কেন, সেই পাঠ ও অধ্যয়নে যে তৃপ্তি ও প্রাপ্তি অর্জন হয়, তা কাগজ ও কিতাবের নান্দনিক মলাট, শুভ্র পাতার সুগন্ধ ও সুষমা বিন্যাস থেকে পাওয়া তৃপ্তির তুলনায় কম।
যদিও প্রজ্ঞা প্রসারের আরও একটি দিক হলো— শ্রুতান্তরিত ধারা, অর্থাৎ শ্রুতি নির্ভর বর্ণনা। তবে এই দিকটাও মিইয়ে পড়ে বিখ্যাত সেই প্রবাদের সামনে—
ما كُتِبَ قَرّ، وما حُفِظَ فَرّ
কেননা এতে মুখস্থ মুখস্থান্তরে রদবদল, বিভ্রান্তি ও অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তুর অনুপ্রবেশের আশংকা প্রবল।
“কিতাব হলো সামান্য থেকে সামান্য কোন ব্যক্তিকে সভ্যতা ও সংস্কতির পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ সোপান। এর মাধ্যমে সৃষ্টি কেবল এক স্তরে থেমে থাকেনা; ছুয়ে দেয় সাফল্যের প্রান্ত ও দিগন্ত।”
বস্তুত এসব কারণেই আমাদের আসলাফ ও বড়দের অন্তরে ছিল কিতাবের প্রতি অগাধ ভক্তি ও নিরুপম ভালোবাসা। কিতাবের প্রতি তাদের ভালোবাসার মৃদু সমীরণ শিরা উপশিরায় তরতর করে বইত। গ্রন্থমলাটের সুগন্ধে তারা খুজে পেতেন জীবন গঠনের অমূল্য চিরকুট। তারা আমাদের মতো কিতাব আরিয়াত নিয়ে পড়তেন না; বরং সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন কিতাব সংগ্রহে।
“ইতিহাসের পাতায় পাতায় তাদের কিতাবভক্তি ও কিতাবঋদ্ধি উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত।”
বক্ষমান প্রবন্ধে আমরা জানব—
কিতাবের প্রতি বড়দের ভালোবাসা কেমন ছিল!
কেমন ছিলো তাদের কিতাব সঞ্চয়প্রীতি!
টুকরো টুকরো প্রেম, খন্ড খন্ড গল্প, কিছু কথা, কিছু প্রত্যয়।
পাশাপাশি জানব, অজস্র কিতাবের ভিড়ে কাঙ্খিত কিতাব কীভাবে নির্বাচন করতে হয়, এবং কিতাব নির্বাচনে সচেতনতা কেমন থাকা উচিত।
❑ কিতাবের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা
১. যার কিতাবপ্রেমে স্নিগ্ধ পৃথিবী—
আল্লামা জাহেয (মৃত্যু: ২৪৫ হিজরি) রহ. ছিলেন তৎকালীন আরবি ভাষা ও সাহিত্যের এক অপরাজেয় নক্ষত্র। তিনি কিতাবকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। জানা যায়, তার হাতে যখন কোন কিতাব আসতো—চাই তা যে বিষয়েরই হোক না কেন—তিনি আদ্যোপান্ত না পড়ে তা রাখতেন না। এমনকি কখনো কখনো কিতাব বিক্রেতাদের কাছ থেকে দোকান ভাড়া নিয়ে নিতেন। অতঃপর নিঃশব্দ রাতে, নিশাচর হয়ে, তিনি ঘুরে ফিরতেন কিতাবের পাতায়।
২. কিতাব পুড়লে পুড়তো স্মৃতি—
ইমাম ইবনুল মুলাক্কিন রহ. ছিলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার শহরের এক দীপ্ত পিদিম। ইমাম সাখাভি রহ. এর বর্ণনা অনুযায়ী, তার রচিত কিতাবের সংখ্যা প্রায় তিনশোর মতো। একটি ঘটনা যা সময় থেকে সময়ান্তরে অগনিত কিতাবপ্রেমীদের শিহরিত করেছে এবং করেছে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ।
ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বর্ণনা করেন, ইবনুল মুলাক্কিন রহ. এর অসংখ্য কিতাবের পান্ডুলিপি তার বার্ধক্যকালে একটি অনভিপ্রেত ঘটনায় পুড়ে যায়। এই শোক তাকে এতোটাই অস্থির ও জর্জরিত করে তোলে যে, এক সময় তিনি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যান যে স্মৃতিশক্তি পর্যন্ত লোপ পায়। যেন পুড়ে যাওয়া কিতাবের শোক তার স্মৃতিকেও পুড়িয়ে দিয়েছে। অথচ, ইতিপূর্বে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় ছিলেন। এ ঘটনা কিতাবের প্রতি তার হৃদয়ে কতোটা গভীর প্রেম ও নিখুঁত ভক্তি ছিল—সেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
৩.
ইবনুল-জাওযী রহ. এর কিতাবপ্রেম:
ইমাম ইবনুল-জাওযী রহ. (মৃ. ৫৯৭ হিজরি) ছিলেন ইলম ও সাহিত্য জগতের এক বিস্ময়পুরুষ। তাঁর রচনার সংখ্যা প্রায় তিন হাজার। তার অন্তরে কিতাবের প্রতি এমন প্রেম ছিল যে, বলা হয় জীবনে যত সময় তিনি খাওয়া-দাওয়া ও বিশ্রামে ব্যয় করেছেন, তার চেয়েও বহু গুণ সময় কাটিয়েছেন কিতাবের সান্নিধ্যে। বাগদাদের বইয়ের বাজারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি বই বিক্রেতাদের দোকানে কাটাতেন; বই কিনতে না পারলেও তিনি দাঁড়িয়ে পড়তেন, যেন প্রতিটি শব্দ অন্তরে প্রবেশ করে। কেউ প্রশ্ন করলে বলতেন: “কিতাব এমন বন্ধু, যে কখনো প্রতারণা করে না, বরং হৃদয়কে শুদ্ধ করে।” মৃত্যুশয্যাতেও তার মাথার পাশে কিতাব ছড়িয়ে ছিল; শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কিতাব থেকে লেখা টুকে যাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য প্রমাণ করে, কিতাবের প্রতি তার প্রেম ছিল এক আত্মিক বন্ধন—যা জীবনের অন্তিম নিশ্বাসেও বিচ্ছিন্ন হয়নি।
আমাদের বড়দের এই ত্যাগ ও একনিষ্ঠ কিতাবপ্রেম প্রতিফলিত করে— কিতাব কেবল জ্ঞানচর্চার মাধ্যম নয়, বরং এটি মনীষীর হৃদয়ের অন্তর্গত এক নীরব, গভীর প্রণয়ও বয়ে আনে। তাদের হৃদয়ের এই নিরুপম প্রীতির উত্তাপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কিতাবপ্রেম কখনো সাধারণ তাত্ত্বিক ভালোবাসা নয়; এটি এক গভীর আত্মিক যাত্রা, যা জীবনকেই আলোকিত করে।
❑ কিতাব সংগ্রহ ও সঞ্চয়ের আগ্রহ
১. 'মিজিস্তি গ্রন্থের'র জন্য ঘোড়া বিক্রি—
সনদ বিন আলি ছিলেন চতুর্মুখী প্রতিভা ও জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ এক মহান সাধক। শৈশব থেকেই তার বই পাঠ ও সংগ্রহের প্রবল আগ্রহ ছিল। একটি ঘটনা তার অকৃত্রিম সঞ্চয়প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সনদের বয়স তখন মাত্র সতেরো। এই বয়সেই তিনি প্রকৌশল বিদ্যার বিখ্যাত গ্রন্থ “উকলিদস” শেষ করেন। এরপর তার মনে গভীর আকাঙ্ক্ষা জাগে—তিনি পড়বেন “মিজিস্তি”, যা জ্যোতির্বিদ্যা শাস্ত্রের উপর রচিত, গ্রীক ভাষা থেকে আরবিতে অনূদিত এক অনবদ্য গ্রন্থ। কিন্তু গ্রন্থটির মূল্য ছিল বিশ দিনার—সেই সময়ের জন্য যা ছিল আসমান ছোঁয়া দাম।
সনদ "মিজিস্তি"র প্রেমে আত্মহারা। যেকোনো মূল্যে সে গ্রন্থটি চায়। কিন্তু বিশ দিনার কোথা থেকে আসবে? ভাবতে ভাবতে সে চতুর্মুখী পরিকল্পনা সাজায়। একদিন সফরের সময়, বাবার সঙ্গে ঘোড়ার পিটে চড়ে বের হওয়ার সুযোগে, সে ঘোড়া নিয়ে পালিয়ে যায়। কিছুমাত্র কম মূল্যে তা ত্রিশ দিনারে বিক্রি করে, প্রয়োজনীয় বিশ দিনারের মাধ্যমে "মিজিস্তি" সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরে আসে।
মা যখন ধমক দেন, সনদ বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে বলেন—
“বই সংগ্রহের জন্য আমি বাড়ি ছাড়তেও প্রস্তুত।”
২. মুফতী সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. এর কিতাব সঞ্চয়প্রীতি:—
মাসলাকে দারুল উলূম দেওবন্দের তরজুমান, হযরত মাওলানা মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. ছিলেন সম্যক বিদ্বান, জ্ঞানের জগতে জাজ্বল্যমান এক নক্ষত্র। তার কিতাব সঞ্চয়প্রীতি ছিল একেবারে বিরল।
আব্দুর রউফ গজনভী দা.বা. বর্ণনা করেন—“আমি হযরত পালনপুরী রহ. এর ব্যক্তিগত কুতুবখানায় প্রবেশ করলে একটি কিতাবের প্রচ্ছদে হযরতের স্বহস্তে লিখিত ছাত্রজীবনের একটি চিরকুট দেখতে পাই। সেখানে লেখা ছিল—
والدہ محترمہ نے گاؤں سے کسی کے ساتھ میرے لئے گھی بھیجا تھا، اسے بھیج کر میں نے یہ کتاب خریدی۔
“মা গ্রাম থেকে কারো সাহায্যে আমার জন্য ঘি প্রেরণ করেছিলেন, সেটি বিক্রি করে আমি এই কিতাবটি সংগ্রহ করেছি ।”
কি অফুরন্ত সৌহার্দ্য! কী অগণিত ইশক! একজন মনীষী কিতাব সংগ্রহের জন্য এমন ত্যাগও করতে পারেন—মায়ের পাঠানো ঘি পর্যন্ত বিকিয়ে দিয়ে বই কিনে নেওয়া। অথচ আমরা…
৩.
হযরত ওয়ালা দা.বা.এর কিতাব সঞ্চয়প্রীতি:—
হযরত ওয়ালা মুফতী শহীদুল্লাহ সাহেব দা. বা. হচ্ছেন বিংশ শতাব্দীর উম্মাহর সংস্কারক। মুজাদ্দিদে তা'লিম ও তরবিয়ত। অজস্র গুণের সমাহারে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তার হাতে গড়া "জামেয়া রশীদিয়া"ই তার মহান ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে। এবার জানবো আমাদের হযরত ওয়ালা দা.বা. এর কিতাব সংগ্রহের কথা—
হযরত বলেন—পাকিস্থানের হযরত মুফতি রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী রহ. আমাকে তিনশত রুপি দিতেন মাসিক খরচের জন্য। নাস্তা-পানি, কাপড়-চোপড় তেল-সাবান সব এর মধ্যে। এই তিনশো টাকা থেকে পুরো মাসের প্রয়োজনগুলো কোনরকম সেরে বাকি টাকা দিয়ে কিতাব সংগ্রহ করেছি।এতে আমার অনেক-অনেক কিতাব সংগ্রহ হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।
আমি হিসাব করে দেখেছি, আমি ৮ বছরে ৩০০ টাকা মাসিক হারে যা পেয়েছি, সবটাকা একত্রিত করে, যা কিতাব কেনা যেতো, তার দ্বিগুণ পরিমাণ কিতাব কেনা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। এটা হলো বরকত।
এই ঘটনাগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, কিতাবের প্রতি ভালোবাসা ও সংগ্রহের আগ্রহ কতটা গভীর হতে পারে।
❑ কিতাব নির্বাচনে সচেতনতা—
"যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত Library of Congress-এ সংরক্ষিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটিরও বেশি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম পাঠাগার হিসেবে পরিচিত। অপর দিকে, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত British Library-এ সংরক্ষিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৯ লক্ষ। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পাঠাগার হলো জাতীয় গ্রন্থাগার, যেখানে রয়েছে অনুমানিক ৫০ লক্ষ বই। আর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় ৬ লক্ষ ৮০ হাজার বই, এবং এর সঙ্গে রয়েছে আরও ৩০ হাজার প্রাচীন পান্ডুলিপি।"
— মুযাকারা, প্রথম সংখ্যা, পৃ.৪-৫
এখান থেকে অন্তত এতোটুকু অনুভূত ও অনুমেয় হয় যে, সমগ্র বিশ্বচরাচরে বইয়ের রাজ্য, গ্রন্থের আসমান ও রচনা সম্ভার কতখানি বিস্তৃত ও দিগন্তহীন। রাশি রাশি গ্রন্থের অতলান্ত সমুদ্র থেকে একটি উপকারী বই নির্বাচন করা কেবল কষ্টসাধ্য নয়, বরং দুঃসাধ্যও বটে। হয়তো আপনি নান্দনিক মলাট দেখে একটি বই নির্বাচন করলেন, যা আপনার জন্য উপকারী তো নয়ই, বরং তা আপনার মনে সংশয় তৈরি করে দিতে পারে। তাছাড়া বর্তমানে এমন সব বই মার্কেটে হুলুস্থুল আকারে বাজার্জাত হচ্ছে, যার পাঠ ও পঠন মুহূর্তেই আপনাকে দাপিয়ে নিবে ধ্বংসের কিনারায়। বিকৃত করবে মানসিকতা, দুষিত করবে চেতনার আবহ। কিতাব মানেই তো কল্যাণের কুঞ্জি নয়; ভালো-মন্দ উভয় প্রকারের কিতাবই বিদ্যমান।
তাই নিন্মে এর থেকে উত্তরণের জন্য একটি তথ্যবহুল চিরকুট প্রদান করা হলো—
১. প্রথম কাজ: বই সম্পর্কে সম্যক তত্ত্বজ্ঞান রাখে এমন উস্তাদ ও মুরব্বিময় বড়দের সাথে পরামর্শ করা। প্রথিতযশা আলেম মুফতী শফী রহ. বলেন—
"کسی کتاب کا مطالعہ بھی کیا جائے تو اسی معلم کی تجویز سے. تاکہ وہ اس کی استعداد اور ضرورت پر نظر کر کے اس کے لئے مطالعہ کی کتابیں تجویز کرے۔"
ترجمة العبارة—
“যে কোনও কিতাব অধ্যয়ন করার পূর্বে তা কোন একজন প্রাজ্ঞ ও বিজ্ঞ শিক্ষকের পরামর্শ অনুযায়ী করা উচিত, যাতে তিনি শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও প্রয়োজন বিচার করে তার জন্য পাঠ্যবইগুলোর পরামর্শ দিতে পারেন।”
২. দক্ষ ও সচেতন পাঠকের বুক রিভিউ পড়া: এতে বইয়ের প্রকৃত স্বরূপ বিস্তৃত সব তাত্ত্বিক রহস্য উদ্ঘাটিত হয়, যা নির্বাচন ও নির্ধারণে সহায়ক।কারণ একজন চিন্তাশীল পাঠকের বুক রিভিউতে উঠে আসে বইটির নিপুণ পরিচিতি।
৩. লেখক সম্পর্কে ধারণা অর্জন:
কিতাব নির্বাচনের পূর্বে রচয়িতা বা লেখক সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি। লেখকের চিন্তা-মতবাদ ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হওয়া প্রয়োজন। এখানে মুফতী শফী রহ. এর কথাটি ডায়েরিভুক্ত করা যেতে পারে—
"اور اگر کتاب دینیات سے متعلق ہے تو مصنف کے علمی مقام کے ساتھ اس کی عملی اور اخلاقی زندگی کی بھی تحقیق مناسب ہے۔ کیونکہ تجربہ شاید ہے کہ علوم دین میں بعمل آدمی کی تصنیف اور کلام میں وہ اثر نہیں ہوتا جو متقی علماء کی تصانیف میں ہے۔"
“আর যদি কোনো বই ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কিত হয়, তবে লেখকের জ্ঞানীয় মর্যাদা ছাড়াও তার আখলাকি ও নৈতিক জীবন সম্পর্কেও গবেষণা করা উচিত। কারণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ধর্মীয় জ্ঞান যেখানে ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ হয়, সেখানে সাধারণ ব্যক্তির রচনায় সেই প্রভাব থাকে না, যা ধার্মিক আলেমদের রচনায় প্রতিফলিত হয়।”
মাওলানা মুহাম্মদ রিজওয়ান আজিজ সাহেব লিখেছেন—
"مصنَّف سے پہلے مصنِّف کو پڑھنا، تاليف سے پہلے مؤلف اور تصنیف سے پہلے مصنف کے فس منظر، فیش منظر اور تهه منظر کو جاننا ضروری ہے، اس لیے کہ بازار میں تصنیف نہیں مصنف بکتا ہے۔"
“কোনো রচনার আগে লেখককে জানা প্রয়োজন, সংকলনের আগে লেখক এবং রচনার আগে লেখকের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানা জরুরি, কারণ বাজারে কেবল রচনা বিক্রি হয় না, বরং লেখককেও বিক্রি করা হয়।”
৪. কিতাবের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি অর্জন করা:
কিতাব নির্বাচন ও পাঠ পর্বের সূচনালগ্নে সংক্ষিপ্ত হলেও নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানা অপরিহার্য—
ক. মলাট থেকে কিতাবের নাম, লেখকের নাম, প্রকাশকের নাম এবং প্রকাশনার তারিখ জানা।
খ. ভূমিকা থেকে কিতাবের বিষয়, উদ্দেশ্য ও মানহাজ সম্পর্কে জানা; কিতাবটি মতন নাকি শরাহ তা জানা।
গ. সূচি থেকে কিতাবের তারতিব ও আলোচ্য বিষয় এবং মৌলিক বহসগুলো জানা।
ঘ. মুহাক্কিক বা প্রকাশকের মুকাদ্দিমা থেকে কিতাব ও লেখকের মান সম্পর্কে জানা।
❑ উপসংহার—
কিতাবের প্রতি নিরুপম ভালোবাসা, সঞ্চয়প্রীতি ও সচেতন নির্বাচন আমাদের আসলাফদের জীবনচরিত থেকে স্পষ্ট হয়। কিতাব কেবল জ্ঞানার্জনের নয়, অন্তরের সংলাপ ও আত্মিক উজ্জ্বলতার উৎস। সংগ্রহের ত্যাগ ও অধ্যয়নের একনিষ্ঠতা শেখায়, জ্ঞান অর্জন ধৈর্য ও সতর্ক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব।
সচেতন নির্বাচন—লেখক ও কিতাবের পরিচয় জানা, শিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া এবং রিভিউ বিশ্লেষণ—অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক কিতাব মন ও জীবন কে আলোকিত করে এবং চরিত্র ও সভ্যতার উন্নয়নে সহায়ক হয়। আমরা প্রার্থনা করি—আল্লাহ তায়ালা আমাদের কিতাবপ্রেম, সঞ্চয়প্রীতি ও সচেতন নির্বাচনের দৃষ্টি দিন। যাতে আমরা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে জীবনের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারি। আমিন।
❑ তথ্যপঞ্জি:—
১. খুব পড়ি বুঝে পড়ি, পৃ. ১৭
২. আন নুজুমুল মুতারসাহ, পৃ. ৭৭
৩. মাকালাতে মুফতি আজম, পৃ.২৬৮
৪. হরফে শীরি, পৃ.৬১-৬২
৫. কিতাব পরিচিতি, প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি,
পৃ. ৭৫-৭৬
৬. আল ইসলাহ সিরিজ-৩১, ইলম অর্জনের নিরাপদ পন্থা : ১৪
৭.ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৯০-৯২
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।