নবীন কলমের সাহস: মুযাকারার প্রথম যাত্রা”
—রফিক আতা—
সেদিন অপরাহ্নে আমি ডুবে ছিলাম রোজনামচার পাতায়, জীবনের খেরোখাতায়। হঠাৎ এক সহপাঠী একটি মলাটহীন ম্যাগাজিন আমার সামনে রেখে বললো—
“বন্ধু! সময় হলে ম্যাগাজিনটা পড়িস।”
তখন তেমন খেয়াল করিনি। কেবল হাতে নিয়ে পাশে থাকা সবুজাভ বুকসেলফে রেখে দিলাম।
তিন দিন পর—
এখন রাত একটা বেজে তিন মিনিট। ঘড়ির কাঁটা তার নির্দিষ্ট রেখাপথে ব্যস্ত। আমি শিথানের পাশে একগুচ্ছ ক্লান্তি গুটিয়ে শুয়ে আছি। অথচ চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। মনে এক অজানা হতাশার ছায়া, হৃদয়ের দেওয়ালে অস্বস্তির আঁচ।
জানালার গ্রীল পেরিয়ে তাকালাম রাতের আকাশে। পৃথিবী তখন জোৎসনার নিয়ন আলোয় মোহময়। কিন্তু আমার কাছে সে আলো কোনো স্বস্তি আনলো না। যেন কিছু থেমে গেছে ভেতরে। নির্ঘুম চোখে নিঃশব্দ চটপটানি।
হঠাৎ মনে পড়লো বন্ধুর দেওয়া সেই ম্যাগাজিনটির কথা। দ্রুত চোখ ফেরালাম বুকসেলফে। হাতে নিলাম মলাটহীন কাগজখানা। পাতলা ধুলো জমেছে ওপরে। ধুলো সরিয়ে প্রথম পাতা উল্টাতেই চোখ আটকে গেল সম্পাদকীয় পাতায়।
সেখানে প্রচলিত নাম—সম্পাদকীয়, মুখবন্ধ বা স্বাগত কলাম—এর বদলে বড় হরফে লেখা একটিই শব্দ:
“আফওয়ান!”
(আমাদের ক্ষমা করুন)
অবাক হলাম। এমন নতুনত্বে একরকম শিহরিত হলামও। কিন্তু প্রশ্ন জাগলো—আফওয়ান কেন?
পরদিন সহপাঠীর সঙ্গে আলাপ করে জানলাম—এটি সদ্য ফোঁটা এক পত্রিকা, নবীনদের কলমের যৌথ প্রয়াস। একঝাঁক তরুণ, একঝাঁক স্বপ্নচাষী, যারা অল্প কাগজে বুনছে অনেক বড় স্বপ্ন। তারা সময়ের বুকে রোপণ করেছে এক পুষ্পবৃক্ষ, সিঞ্চিত করছে ফোঁটা ফোঁটা কলমের দাগে।
তাদের সেই ভাষা যেন বলছে—
“আফওয়ান! কলম ও কলবের খেদমতে নামতে চাওয়া আমাদের জন্য বড় দুঃসাহস, একরকম গোস্তাখি। আমাদের এই গোস্তাখি ক্ষমা করুন।”
এই “আফওয়ান” পড়েই বুঝলাম—এরা কেবল লেখক হতে চায়না, হতে চায় একঝাঁক দুঃসময়পথিক। তারা বধ্যভূমির শূন্যতায় রেখে যেতে চায় কলমের চিহ্ন, কাগজের সুবাস।
এবং সেই মুহূর্তেই ভুলে গেলাম যে এখন মধ্যরাত। ভুলে গেলাম হতাশ মন, ভুলে গেলাম জোৎসনা না ভালো লাগার খেদ। প্রতিজ্ঞা করলাম—
মুযাকারার সঙ্গে মুযাকারা করতে করতে মুযাকারার দিগন্ত ছুঁয়েই তবে আমি রাতের ঘুমে অবগাহন করবো।
প্রথমেই চোখ পড়লো শিরোনামের পরতে। একটি প্রবন্ধ বা রচনা পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রথম শর্তই হলো তার শিরোনাম। হৃদয়কাড়া, জাদুমাখা, ছন্দময় শিরোনাম পাঠককে মুহূর্তেই আপন করে নেয়। মুযাকারার নবীন লেখকগণ এই উসুলের প্রতি সত্যিই যত্নবান।
“কোরআন থেকে নেওয়া জীবনের পাঠ”, “শত বছরের অবসরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়”, “সাহিত্যের মোড়ক উন্মোচনে উলামায়ে দেওবন্দ”, “শেষ থেকে শুরু”, “আমার অসুখলিপি”, “অনুভূতি", স্মৃতি–বিস্মৃতির কোণঠাসায়”—
এমন সব চিত্তাকর্ষক ও দিল দোলানো শিরোনাম মুহূর্তেই আমাকে আচ্ছন্ন করলো। মুখিয়ে তুললো দ্বিগুণ উদ্যমে পুরো পত্রিকাটি পড়তে।
চারপাশে দেয়ালজোড়া রাতের নিস্তব্ধতা, চাপা শূন্যতা, সমগ্র কামরা ঘুমে অচেতন। আর আমি খুলে নিলাম মুযাকারা—
এক পাতা, দুই পাতা, তারপর একে একে সব পাতা।
১. কোরআন থেকে নেওয়া জীবনের পাঠ
লেখাটি যেন আমাকে ফিরিয়ে নিল উদ্দেশ্যহীন কোলাহলমুখর এক শৈশবে। অতঃপর কোরআনের সতর্ক সাইরেনে জীবনের মেলায় ফিরে এলো পথচলা। এক স্বচ্ছ, স্নিগ্ধ, নির্ভুল গন্তব্যের ছায়াতলে দাঁড় করালো লেখাটি।
২. শত বছরের অবসরে— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়..
লেখক তার অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় তত্ত্ব ও তথ্যের বিমূর্ত আবহকে বুনেছেন স্নিগ্ধতায়। উপসংহারটি বিশেষভাবে হৃদয়ে রেখাপাত করেছে—
(আমিও ঠিক করেছি নিয়মিত প্রাজ্ঞদের বুক রিভিউ পাঠ করবো, আর জীবনের মৌলিক অধ্যয়ন সংরক্ষণের জন্য বুক রিভিউকেই পথিকৃত করবো। ইনশাআল্লাহ!)
এই উপসংহার যেন অনাগত শতাব্দীর প্রতি এক দীপ্ত বার্তা।
৩. সাহিত্যের মোড়ক উন্মোচনে উলামায়ে দেওবন্দ
দীর্ঘদিন ধরে আমি চাতকপাখির মতো এমন একটি প্রবন্ধের অপেক্ষায় ছিলাম—যেখানে সাহিত্য ও কোরআন একসাথে ঝরে পড়বে হৃদয়ের তটে। আকাবির আসলাফদের সাহিত্যচর্চার ঝলক এখানে ঢেউ তুলেছে প্রবহমান নদীতে। প্রতিটি লাইন, প্রতিটি অনুচ্ছেদ যেন স্বর্ণাক্ষরে মোড়ানো।
মানাযির আহসান গিলানী, ইউসুফ বানুরি, সুলাইমান নদভী রহ. প্রমুখের সাহিত্যচর্চার আলোকে বার্তাটি স্পষ্ট—
সাহিত্য হোক কোরআন ও সুন্নাহর আলোয় সিক্ত, হৃদয়–অনুভূতির স্বর্গীয় সুধায় ভরা।
৪. নবীজীর জন্ম তারিখ—একটি পর্যালোচনা
প্রবন্ধটিতে লেখক রাসূলুল্লাহ সাঃ এর জন্ম তারিখকে ঘিরে বিদ্যমান মতভেদ ও মতপার্থক্য নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করেছেন। ঐতিহাসিক দলিল, উলামায়ে কেরামের মতামত ও প্রচলিত ধারা একত্রিত করে তিনি যেন স্বচ্ছ দর্পণের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়েছেন। তথ্যবহুল, গবেষণাধর্মী এবং আমাদের জন্য এক অমূল্য সঞ্চয়।
৫. শেষ থেকে শুরু
লেখাটি পড়তে পড়তেই মনে হলো—জীবন যেন নতুন করে সচল হয়ে উঠছে। অতীতের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে নব উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান স্পষ্ট। সাইদ আহমদ পালনপুরীর অনুপ্রেরণা আর কবি ইকবালের উচ্চারণ লেখাটিকে দিয়েছে আধ্যাত্মিক বল। সংক্ষিপ্ত অথচ দৃঢ়—এই রচনাই আমাদের শেখায়, শেষ থেকেই শুরু হতে পারে নতুন প্রভাত।
শেষ প্রান্তের মায়াবী চিরকুট—
এভাবেই প্রতিটি প্রবন্ধ, প্রতিটি রচনা, পাঠপ্রতিক্রিয়া আর স্মৃতিচারণের স্রোতে আমি ডুবে গেলাম ভাব–অনুভূতির অতলে। ঘড়ির কাঁটা তখন আড়াইটা ছুঁই ছুঁই। আমি পৌঁছে গেলাম মুযাকারার দিগন্তশামিয়ানায়।
ম্যাগাজিনটির অন্তিম প্রান্তে স্থান পেয়েছে দু’টি কবিতা।
সে যেন গোধূলি লগ্নে অচেনা পাখির সুর—
ছন্দময়, মায়াবী, স্বপ্নমাখা এক চিরকুট।
কিছু পরামর্শ—
মুযাকারা–এর প্রথম সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে হৃদয়কাড়া ও অনন্য এক প্রয়াস। নবীন কলমের এমন দুঃসাহসী পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার। তবে পরবর্তী সংখ্যাগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য কয়েকটি পরামর্শ রাখা যেতে পারে। আশা করছি ক্ষুদ্র একজন পাঠকের সমালোচনা বা পরামর্শ কে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবেন!—
১. সম্পাদনা ও প্রুফরিডিংয়ে যত্নবান হওয়া
কিছু জায়গায় বানান ও ভাষার ছোটখাটো ত্রুটি চোখে পড়েছে। নিয়মিত প্রুফরিডিং করলে পাঠকের অভিজ্ঞতা হবে আরও মসৃণ।
২. রচনার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা
গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা ও পাঠ প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনি ও অনুবাদ রচনা সংযোজন করলে পত্রিকাটি হবে আরও প্রাণবন্ত।
৩. নকশা ও বিন্যাসে মনোযোগ
মলাট, ফন্ট নির্বাচন, রঙ ও শৈল্পিক বিন্যাস—এসব পাঠকের কাছে প্রথম দৃষ্টিতেই আকর্ষণ তৈরি করে। সীমিত সম্পদে হলেও নান্দনিকতা ধরে রাখার চেষ্টা প্রয়োজন।
৪. পাঠকের অংশগ্রহণ
পরবর্তী সংখ্যায় পাঠকের লেখা ছোট প্রতিক্রিয়া, প্রশ্নোত্তর বা মতামত সংযোজন করলে পত্রিকাটি হবে এক যৌথ মঞ্চ, যেখানে লেখক–পাঠকের সম্পর্ক হবে আরও দৃঢ়।
৫. নিয়মিততা ও ধারাবাহিকতা
প্রথম সংখ্যার উচ্ছাস ধরে রেখে নিয়মিত প্রকাশের দিকে যত্নবান হওয়া জরুরি। ধারাবাহিকতাই পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রভাব বৃদ্ধি করে।
শেষ কথা —মুযাকারা–র এই নবযাত্রা যেন আমাদেরকে দীপ্ত আলোয় পথ দেখায়—
কলম ও কাগজের এই দুঃসাহসী প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক, বিস্তৃত হোক, আর একদিন হয়ে উঠুক সময়ের অগ্রণী সাহিত্যদূত।
উনিশ, নয়, পঁচিশ ইং
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।