৫.
আমরা তিনজন দ্রুত রিকশাচালক ভাইটাকে সতর্ক করতে করতে সরে পড়লাম। কিন্তু সে রিকশার কারণে সরে উঠতে পারল না। প্রচণ্ড শব্দে ট্রাক এসে ধাক্কা দিল— এক মুহূর্তেই ছিটকে পড়ল সে। সেই সাথে এক হৃদয় জর্জরিত করা চিৎকার মিলিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।
আমরা দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরলাম। আল্লাহর রহমতে তখনই কাছে একটি সিএনজি পেয়ে যাই। তাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে ছুটলাম।
হাসপাতালে পৌঁছে আলোতে যখন মুখ দেখলাম— পৃথিবীর সব বিস্ময় ও বিমূঢ়তা যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়ল আমার চোখে। আরে! এ তো অন্য কেউ নয়— আমাদেরই সহপাঠী আফনান!
আমরা যেন জমাট বরফের মতো থমকে গেলাম। বাকরুদ্ধ, বিস্মিত। মনে হচ্ছিল শতাব্দী প্রাচীন এক অদৃশ্য রহস্য হঠাৎ উন্মোচিত হলো আমাদের সামনে।
ডাক্তার জানালেন, আফনান কেবল সামান্য আঘাত পেয়েছে। অল্প ট্রিটমেন্টেই সেরে উঠবে ইনশাল্লাহ! আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম।
হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি হারিয়ে গেলাম প্রাচীন স্মৃতির গহ্বরে। মনে পড়তে লাগল একে একে সবকিছু—
শীত ও গ্রীষ্ম এবং বসন্ত ও হেমন্তের অগণিত বৃহস্পতির রহসময় রাতগুলোর কথা,
আমারর পাশে ফাকা পড়ে থাকা আফনানের সীট, আর দুই বছর আগেকার সেই ডায়েরির লেখা—
"আফনান! আমি জানি না, তোর বৃহস্পতির রহস্য কী। কখনোই হয়তো আমি তার জটিল জাল ছিন্ন করতে পারব না। আমি তোর অনুপস্থিতির ফাঁকা সীটের দিকে তাকিয়ে থেকেছি বহুরাত— যেন সেটাই আমার বুকের গভীর শূন্যতা হয়ে উঠেছে। আমি লিখেছিলাম, যদি তুই একদিন নিজেই খুলে বলিস, কিংবা প্রকৃতি নিজে এসে সব বলে দেয়— তবে তোর এই নিঃশব্দ বন্ধুর কৌতূহল হয়তো কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। কিন্তু হায়! আমি কি জানতাম, প্রকৃতি এত নির্মম, অথচ এত রহস্যময় ভঙ্গিতে তোর রহস্য উন্মোচন করবে…!"
মনে পড়তে লাগল নায়েব হুজুরের সেই গল্প—
"তোমাদের মাঝে এখনো এমন কিছু ছাত্র আছে, যারা শহরের বুকে রিকশা চালায়। শুধু পড়াশোনার খরচ আর জীবন চালানোর তাগিদে।"
আজ বুঝলাম, সেই গল্পের নায়ক আফনানই।
তাহলে প্রতিটি বৃহস্পতিবার রাতে তার সীট ফাঁকা থাকত কেন? কেন বৃহস্পতির রহস্যময় অনুপস্থিতি? সব প্রশ্নের উত্তর যেন আজ খুঁজে পেলাম।
আফনানের চোখে তখনো হাসপাতালের আলোতে আমি দেখলাম দৃঢ়তা— যেন কষ্ট নয়, বরং গৌরব।
যেন দারিদ্র্য নয়, বরং সংগ্রামকে আলিঙ্গন।
আমি নিঃশব্দে ভাবলাম—
এই শহরের রিকশার চাকায় যে ঘাম ঝরে, সেই ঘামের ফোঁটা দিয়েই হয়তো কোনো মাদ্রাসার আলো জ্বলে ওঠে। এই মেহনতের শিক্ষাই আমাদের জন্য এক জীবন্ত পাঠ: মানুষের প্রকৃত শক্তি শুধু তার পড়াশোনায় নয়, বরং সংগ্রামের ভেতরেও লুকিয়ে আছে।
রাত গভীর হলো। হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আফনানের গল্প কেবল একটি সহপাঠীর নয়— বরং এক অমোঘ শিক্ষা,
যা আমাদের শেখায়—
জীবন ও জ্ঞান অর্জনের পথে ঘাম ঝরানোও এক প্রকার ইবাদত। আর আমি অনুভব করলাম—
প্রতিটি বৃহস্পতি রাত আসলে ছিল এক রহস্যের ছায়ালিপি,
যার বাখ্যা লিখে গেছে আফনানের রিকশার চাকায় ঘুর্ণায়মান সংগ্রামের ধ্বনি। তার সেই অদ্ভুত রহস্য আজও যেন বাতাসে ভেসে থাকে—
নিস্তব্ধ রাতের বুকে,
রিকশার ঘণ্টার শব্দে,
আর আমাদের ভেতরকার অমোচনীয় বিস্ময়ে।
(বি:দ্র: সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত)
ক
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।