১.
সারাটা কক্ষ জুড়ে পাক খাচ্ছে নিঃশব্দ রাত। শাঁ শাঁ শব্দে নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে রাতের আইন লঙ্ঘন করছে কয়েকটি পাখা। মধ্যরাতে এসেও মনে হচ্ছে মধ্যদুপুর—যেখানে পুড়ে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায় গ্রীষ্মের রঙ।
আমি এক হতভাগা নিশাচর—সিলিং ফ্যান থেকে দশ ফুট দূরত্বে শুয়ে গরমের তীব্রতায় কাতরাচ্ছি এক দীর্ঘ রাত জুড়ে। অথচ এদিকে সালমানটা স্ব-শব্দে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মশাদের দুর্বোধ্য মিছিল পর্যন্ত তার ঘুমে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটাতে পারছে না।
আর এদিকে আমার পাশের সীটে আফনান নেই। তবে আজ তার না-থাকাটা আমার কাছে আর তেমন কৌতূহল বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। কারণ, গত দুই বছর ধরে বৃহস্পতি এলেই আফনানের অনুপস্থিতি আমাকে দেখতে হয়। প্রথম প্রথম অবাক হতাম। প্রত্যেক বৃহস্পতির গভীর রাত পর্যন্ত সে উধাও থাকতো।
কেন? কোথায়? কিভাবে?
একরাশ কৌতূহল জমে থাকতো বুকের ভেতর। তার বাড়ি লক্ষীপুরে, সুতরাং বাড়ি যাওয়া অসম্ভব। আবার নিকটে তার কোনো আত্মীয়ের বাসাও নেই। তাহলে সে যায় কোথায়!
মাঝে মাঝে বৃহস্পতির রাত পেরিয়ে শুক্রবারে ঢুকে পড়তো, অথচ আফনানের দেখা মিলত না। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি—
"কিরে বন্ধু! তুই কোথায় যাস?"
কিন্তু বৃহস্পতির রহস্য সে কোনোদিনই বলেনি।
অতঃপর আমি বুকসেলফ থেকে ডায়েরিটা নামিয়ে লিখে রাখি—আফনান! আমি জানি না, তোর বৃহস্পতির রহস্য কী। প্রতি বৃহস্পতির রাতেই তোর শূন্য সীট আমার বুকের ভেতর এক গভীর শূন্যতা জাগায়। আমি রহস্য ভেদ করার মানুষ নই। শুধু ভাবি— একদিন হয়তো তুই নিজেই বলবি, অথবা নীরব প্রকৃতি হঠাৎ এসে জানিয়ে দেবে। তখন হয়তো আমার এই দীর্ঘ কৌতূহল কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। কিন্তু হায়! কে জানে, প্রকৃতি তার রহস্যময় আঙুল কবে, কীভাবে আমার চোখের সামনে উন্মোচন করবে…"
এরপরও আমি ব্যর্থ ঘুমের অবিচ্ছেদ্য চেষ্টায়।
অতঃপর কল্পনায় বাতায়নের গ্রীল গলিয়ে ছুটে যাই ল্যাম্পপোস্টের কাছে। তার বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন, দুর্বল আলোয় খুঁজি ক্লান্তি বিমোচনের পথ। দখিনা বাতাসের মৃদু ঝাপটায় হেঁটে হেঁটে যাই কালিদাস পাহালিয়ার তীরে।
নদীর বুকসমান পানি, বহতা সুর আর কাশফুলের শুভ্র দোলায় স্পন্দনে স্পন্দনে শিহরিত হই। মনে হয় যেন পুরনো কালের শত গল্প ভেসে যাচ্ছে বহতা নদীর বুক চিরে।
হঠাৎ ভূতের অণ্ডকোষের মতো বিড়ালের দুটো চোখ দেখে কল্পনার লাগাম টেনে কক্ষে ফিরে আসি। অতঃপর আবারো নির্ঘুম চোখে নিঃশব্দ ছটপটানি।
#চলবে..
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।