সিরিজ: Truth is stranger than fiction -4
রাসপুতিন: সাধু থেকে রাশিয়ার 'ম্যাড মংক’
রাসপুতিন,এই নামটি শুনলেই মনে পড়ে এক জটাধারী দীর্ঘদেহী পুরুষ, যার চোখে ছিল সম্মোহনী শক্তি। কেউ বলতেন সাধু, কেউ বলতেন পাপী, আবার কেউ তাকে ভাবতেন রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ধূর্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। একসময় রাশিয়ার রাজপরিবার পর্যন্ত তার সম্মোহনের শিকার হয়েছিল, বিশেষ করে রাশিয়ান জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও তার স্ত্রী আলেকজান্দ্রা ফিওদরভনার ওপর তার ছিল অদ্ভুত প্রভাব।
জটাবাঁধা বিশাল দাড়ি, মুখভর্তি আঁকাবাঁকা দাঁত আর। অন্তর্ভেদী দৃষ্টি- এই হলো রাসপুতিনের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ‘রাশিয়ার ম্যাড মংক’ হিসেবে পরিচিত। এই রাসপুতিন কে ছিলেন?
রাসপুতিন কি সত্যিই ছিলেন এক লম্পট, নীতিভ্রষ্ট সন্ন্যাসী, নাকি তিনি শুধুই সময়ের শিকার? অনেকে তাকে অপবাদ দিয়েছিলেন ধর্মের নামে ভণ্ডামি করে নিজের ইচ্ছাপূরণের জন্য, আবার কেউ বিশ্বাস করতেন তিনি ছিলেন এক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, যিনি রাশিয়ার যুবরাজ অ্যালেক্সেইয়ের রোগ নিরাময়ে সাহায্য করেছিলেন।
তার জীবন ও মৃত্যু ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গল্প,কখনো তাকে বলা হয় পবিত্র ব্যক্তি, কখনো আবার চরম লম্পট। কিন্তু ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে যদি রাসপুতিনকে দেখা যায়, তবে তাকে শুধু এক পাপী বা এক অলৌকিক পুরুষ বলে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। বরং তিনি ছিলেন এক রহস্যময় চরিত্র, যিনি রাজনীতির ছায়ায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন, এবং যার জীবন ও মৃত্যু আজও রহস্যে ঘেরা।
সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত এক কোণে, পোকরোভসকোয়ে নামের ছোট্ট গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন গ্রিগরি ইয়েফিমোভিচ রাসপুতিন। শৈশবের দিনগুলো কেটেছে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে-দারিদ্র্য, প্রতিকূল পরিবেশ আর সমাজের অবজ্ঞা তাকে এক অদ্ভুত চরিত্রে রূপ দিয়েছিল। দুর্বল, রোগাপাতলা রাসপুতিনের দিন কাটত বনের পশুদের সঙ্গে কথা বলে আর ঈশ্বরের ধ্যানে ডুবে থেকে। তবে গ্রামের লোকেরা তাকে অন্য চোখে দেখত, কেউ বলত 'বোকা গ্রিশকা', আবার কেউ তাকে ভয় পেত তার অদ্ভুত আচরণের কারণে।কৃষিকাজে মন না বসা রাসপুতিন বেছে নিয়েছিলেন এক সহজ কিন্তু বিতর্কিত পথ—চুরি, প্রতারণা আর উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন। বিয়ে করেছিলেন ফিওডোরোভনা দুবরোভিনাকে, সন্তানের পিতা হয়েও সংসারের প্রতি তার কোনো টান ছিল না। অবশেষে এক চুরির ঘটনায় ধরা পড়ে স্থানীয় বিচারকের সামনে হাজির হলেন। অন্য কোনো শাস্তি না দিয়ে বিচারক তাকে একটি অদ্ভুত শর্ত দিলেন—তীর্থযাত্রী হয়ে ৫২৩ কিলোমিটার দূরের ভারখোতুরইয়ের অর্থডক্স গির্জায় যেতে হবে!
গ্রামবাসীরা ভেবেছিল, এটাই হয়তো রাসপুতিনের শেষ দেখা। কিন্তু তারা কি জানত, এই দীর্ঘ পদযাত্রাই বদলে দেবে তার জীবন? যে মানুষটিকে একসময় সবাই অবজ্ঞা করত, সেই রাসপুতিন একদিন হয়ে উঠবেন রাশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি—জার পরিবারের আস্থাভাজন, রাজনীতি ও আধ্যাত্মিকতার এক বিতর্কিত চরিত্র।
বেরিয়ে পড়লেন তিনি, খালি পায়ে, অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে। গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন রাসপুতিন, ক্ষুধার্ত দেহ নিয়ে পথিকদের কাছ থেকে একমুঠো খাবার চাইতেন, রাত কাটাতেন মঠের বারান্দায় কিংবা কোনো কৃষকের উঠোনে। জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা ছেড়ে দিলেন ঈশ্বরের হাতে,তিনি চাইলে বাঁচিয়ে রাখবেন!
এভাবে পথ চলতে চলতে একদিন পৌঁছালেন ভারখোতুরইয়ের বিখ্যাত অর্থডক্স গির্জায়। তখন তিনি যেন আরও অনিশ্চিত, আরও বিধ্বস্ত। লম্বা দাড়ি-গোঁফ বুনো হয়ে উঠেছে, চোখের নিচে গভীর ক্লান্তি, কিন্তু মন ভরা এক অদ্ভুত আকর্ষণীয় শক্তিতে। সেখানেই দেখা পেলেন ব্রাদার ম্যাকারির, এক অশিক্ষিত কিন্তু তপস্বী সন্ন্যাসী। ম্যাকারির শিষ্য হতে হলে কঠিন জীবনধারা অনুসরণ করতে হবে,মদ ত্যাগ করতে হবে, নারীসঙ্গ ছাড়তে হবে, এবং কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে।
রাসপুতিন যেন নতুন এক পথ খুঁজে পেলেন। শীঘ্রই ব্রাদার ম্যাকারির মতো আচরণ করতে শুরু করলেন, তার ধর্মীয় মতবাদ নিজের মধ্যে গ্রহণ করলেন। ততদিনে রাশিয়ার ধর্মীয় আবহে ‘কৃষক পুরোহিত’দের (স্টারেটস) গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছে। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রুশ অভিজাতরাও বিশ্বাস করতে লাগলেন—যে মানুষরা শহরের শিক্ষা ও বিলাসিতা থেকে দূরে, তারাই প্রকৃতভাবে ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। এই স্টারেটসরা ক্রমেই হয়ে উঠলেন ভবিষ্যদ্বক্তা, আধ্যাত্মিক গুরু, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নবীর মতো শ্রদ্ধার পাত্র।এ বিশ্বাসকে পুঁজি করেই রাসপুতিন পরবর্তী দুই বছর রাশিয়ার নানা অঞ্চলে ঘুরে বেড়ালেন, প্রচার করলেন নিজের ধর্মীয় ভাবনা। শেষ পর্যন্ত তার এই আধ্যাত্মিক ভ্রমণ তাকে নিয়ে গেল অর্থডক্স খ্রিস্টধর্মের অন্যতম পবিত্র স্থান গ্রিসের আথোস পর্বতে! তখনও কেউ জানত না, এই ভবঘুরে সন্ন্যাসী একদিন রাশিয়ার সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিতে পরিণত হবেন।দুই বছরের ভবঘুরে জীবন শেষে পোকরোভসকোয়েতে ফিরে এলেন তিনি, তবে এবার আর 'বোকা গ্রিশকা' নন, বরং ‘ব্রাদার গ্রিগরি’— এক আত্মস্বীকৃত ‘পবিত্র মানুষ’। তার ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল। গ্রামের কিছু মানুষ, বিশেষত তরুণী মহিলারা, তার প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলেন। তারা গোপনে রাসপুতিনের সঙ্গে দেখা করতেন, তার আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ছোঁয়া পেতে চাইতেন। তবে এসব গোপন মিটিংয়ে কী ঘটত?
অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করলেন—রাসপুতিন কি ‘খিলিস্টি’ নামে পরিচিত বিতর্কিত ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন? খিলিস্টিরা বিশ্বাস করত যে পবিত্রতা অর্জনের একমাত্র পথ হলো শরীরের ইচ্ছাকে চরম সীমায় নিয়ে যাওয়া, এমনকি যৌনাচারের মাধ্যমেও। রাসপুতিনের গোপন কার্যকলাপ ঘিরে নানা কানাঘুষা চলতে থাকলেও তিনি কখনোই খিলিস্টি দলের সদস্য বলে স্বীকার করেননি।কিন্তু রাসপুতিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯০২ সালে, ৩৩ বছর বয়সে, তিনি সাইবেরিয়ার নিভৃত গ্রাম ছেড়ে নতুন লক্ষ্য স্থির করলেন,কাজান শহর। মস্কো থেকে প্রায় ৫০০ মাইল পূর্বে অবস্থিত এই শহরে ছিল বিত্তবানদের আনাগোনা। সেখানে পৌঁছেই রাসপুতিন সমাজের উচ্চবিত্ত নারীদের মাঝে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অনেকেই নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার সমাধান পেতে তার কাছে ছুটে আসতে লাগলেন। রাসপুতিন নিজের অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে আত্মার অন্ধকার আবিষ্কার করতেন, আর তাদের মন জয় করে নিতেন।এমনকি তারা তার প্রতি এতটাই ভক্তি ও বিশ্বাস স্থাপন করলেন যে তাকে দামি অলঙ্কার ও উপহার দিতে শুরু করলেন। তবে শহরের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ল নতুন গুজব,এই নারীরা শুধু তার শিষ্যই নন, তারা হয়তো রাসপুতিনের সঙ্গে বিছানাও ভাগাভাগি করতেন!
তবে কাজানে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল গ্যাভ্রিল নামের এক বিশিষ্ট অর্থোডক্স ধর্মগুরুর সঙ্গে। গ্যাভ্রিল রাসপুতিনের আধ্যাত্মিক শক্তি ও ক্যারিশমায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাকে সেইন্ট পিটার্সবার্গে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন।
ততদিনে রাসপুতিনের খ্যাতি রাজধানীতেও পৌঁছে গিয়েছিল। অনেকেই তাকে এক মহান আধ্যাত্মিক গুরু মনে করতেন, আবার অনেকেই তাকে এক রহস্যময় প্রতারক বলে সন্দেহ করতেন। তবে তার জীবন এক নতুন মোড় নিল, যখন তিনি বন্ধুত্ব করলেন সেইন্ট পিটার্সবার্গের অর্থোডক্স গির্জার প্রধান ফিওফানের সঙ্গে। ফিওফান শুধু উচ্চপদস্থ ধর্মীয় নেতা নন, তিনি ছিলেন রাশিয়ার জার নিকোলাস ও জারিনা আলেকজান্দ্রিয়ার কনফেসর—অর্থাৎ তাদের পাপ স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী পুরোহিত।
এবার রাসপুতিনের সামনে খুলে গেল সেই দরজা, যা তাকে নিয়ে যাবে রাশিয়ার রাজপরিবারের অন্তরালে, ক্ষমতা ও ষড়যন্ত্রের গভীর চক্রে!
রুশো-জাপানীয় যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয় গোটা সাম্রাজ্যকে অস্থির করে তুলল। ক্ষুব্ধ জনগণ যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সামিল হলো, তখন প্রাসাদরক্ষীরা গুলি চালিয়ে তাদের হত্যা করল,এই ঘটনাই ইতিহাসে ‘ব্লাডি সানডে ম্যাসাকার’ নামে কুখ্যাত হয়ে রইল। শাসনব্যবস্থা টালমাটাল হয়ে উঠল, এমনকি ব্যর্থ এক সামরিক অভ্যুত্থানও সংঘটিত হলো।
এই অশান্ত সময়েই জার নিকোলাস ও জারিনা আলেকজান্দ্রা অবশেষে পেলেন তাদের কাঙ্ক্ষিত উত্তরাধিকারী,রাজপুত্র অ্যালেক্সেই। কিন্তু তাদের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ছোট্ট অ্যালেক্সেই জন্মগতভাবেই হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত,এক মারণঘাতী রোগ, যেখানে শরীরে কোনো ক্ষত হলে তা সহজে রক্ত জমাট বাঁধিয়ে থামানো যায় না। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দিশেহারা রাজদম্পতি সাহায্য চাইলেন আধ্যাত্মিক গুরুর কাছে।এমন সময় সেইন্ট পিটার্সবার্গের অর্থোডক্স গির্জার প্রধান ফিওফান তাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন এক রহস্যময় ব্যক্তিত্বের,গ্রিগরি রাসপুতিন।
ভারখোতুরইয়ের এক মঠ থেকে আনা ছোট্ট একটি রেলিক হাতে নিয়ে রাজপ্রাসাদে ঢুকলেন রাসপুতিন। প্রথম সাক্ষাতেই জার ও জারিনাকে মুগ্ধ করলেন তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও রহস্যময় ব্যক্তিত্ব দিয়ে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল অ্যালেক্সেই-এর চিকিৎসা।রোগে কাতর রাজপুত্রের শিয়রে বসে রাসপুতিন তার সুরেলা কণ্ঠে প্রার্থনা শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যালেক্সেই শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন সকালবেলা, অদ্ভুতভাবে, তার শরীরের অবস্থার উন্নতি ঘটল!
কীভাবে সম্ভব হলো এই আরোগ্য?
সম্ভবত রাসপুতিনের সম্মোহনী শক্তি, তার কথার প্রভাব কিংবা তার অনুরোধে চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিবর্তন—এর মধ্যে কোনো একটির ফলেই রাজপুত্রের অবস্থা সাময়িকভাবে উন্নত হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, রাসপুতিন সম্ভবত চিকিৎসকদের অ্যাসপিরিন ব্যবহার বন্ধ করতে বলেছিলেন, যা রক্ত তরল করে আরও ক্ষতি করত।কিন্তু রাজপরিবারের জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল না। তাদের কাছে রাসপুতিন ছিলেন এক দেবদূত—এক অলৌকিক চিকিৎসক।জার ও জারিনা রাসপুতিনকে রাজপরিবারের আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করলেন। বিশেষ করে জারিনা আলেকজান্দ্রা—তিনি তো দৃঢ় বিশ্বাস করতেন যে রাসপুতিনই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি তার পুত্রের জীবন রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতা জন্ম দিল নতুন গুজবের।
রাসপুতিনের যৌন কেলেঙ্কারির গুজব তখন রাশিয়ায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। অভিজাত মহলে তাকে ‘ম্যাড মঙ্ক’ বলে ডাকা শুরু হলো। রাজপরিবারের সঙ্গে তার গোপন মিটিংগুলো নিয়ে চলল ফিসফাস। বিশেষত, ‘জার্মান রানি’ আলেকজান্দ্রা রাসপুতিনের প্রভাববলয়ে আছেন এই গুজব জনগণের মনে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলল।রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ কি তবে এই রহস্যময় সাধুর হাতে? ক্ষমতার খেলায় রাসপুতিনের এই উত্থান কি নতুন বিপদের ইঙ্গিত?
রাশিয়ার বাতাসে বিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। জনগণের অসন্তোষ ক্রমেই বেড়ে চলেছে, আর তার দায় গিয়ে পড়ছে রোমানোভ রাজবংশের ‘ছায়া শাসক’ গ্রিগরি রাসপুতিনের উপর। জারের ভুল সিদ্ধান্তগুলোর পেছনে তাকে দায়ী করা হচ্ছে, আর তার বিরুদ্ধে যৌনাচারের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে আরও কদর্যভাবে।
রাজপরিবারের সঙ্গে রাসপুতিনের সখ্যতা বিশেষ করে রাজবধূ আলেকজান্দ্রার প্রতি তার প্রভাব, রাশিয়ার অভিজাত মহলে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তার পরামর্শেই নাকি আলেকজান্দ্রা একের পর এক মন্ত্রী বরখাস্ত করে নিজের পছন্দের লোকদের বসাচ্ছেন! অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, রোমানোভ পরিবারের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা সরাসরি রাসপুতিনকে এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।এই ক্ষোভ ১৯১৬ সালে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। আর তখনই রাসপুতিনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যার ষড়যন্ত্র আঁটলেন প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপোভ এবং তার একদল অভিজাত বন্ধু।
প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপোভ ছিলেন রাশিয়ার অন্যতম ধনী ব্যক্তি, রোমানোভ রাজবংশের এক আত্মীয়ও বটে। রাজপরিবারে রাসপুতিনের প্রভাব তাকে চরম বিরক্ত করেছিল, তাই তিনি এবং আরও কয়েকজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিলেন, রাসপুতিনকে সরিয়ে ফেলতেই হবে।
একটি পরিকল্পনা সাজানো হলো,রাসপুতিনকে ইউসুপোভের প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানানো হবে এক গোপন ডিনারের জন্য। ইউসুপোভের বর্ণনা অনুযায়ী, বিশেষভাবে প্রস্তুত করা এক কেক ও ওয়াইনের গ্লাসে প্রাণঘাতী সায়ানাইড মিশিয়ে রাখা হলো। রাসপুতিন একবার এগুলো গ্রহণ করলেই মৃত্যু অবধারিত!
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রাসপুতিন কেক খেলেন, ওয়াইনও পান করলেন, অথচ তার কিছুই হলো না!পরে ধারণা করা হয়, হয়তো রাসপুতিনের বদহজমের সমস্যার কারণে বিষটি তার শরীরে ঠিকমতো কাজ করেনি, অথবা কেক ও ওয়াইন যথেষ্ট পরিমাণে বিষাক্ত ছিল না।যখন সায়ানাইড ব্যর্থ হলো, তখন ইউসুপোভ সরাসরি রাসপুতিনের পিঠে একটি রিভলভার দিয়ে গুলি করলেন। রাসপুতিন মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, মনে হলো সব শেষ!কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে,রাসপুতিন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন! তার রক্তাক্ত শরীর, জ্বলন্ত চোখ!এ যেন মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা এক অভিশপ্ত সন্ন্যাসী!
ভীত-সন্ত্রস্ত ইউসুপোভ ও তার সহযোগীরা তখন আরও কয়েকটি গুলি ছোঁড়েন। রাসপুতিন মাটিতে পড়ে গেলেন। এরপর তাকে কার্পেটে মুড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হলো, এবং বরফাচ্ছাদিত মালয়া নেভকা নদীতে ফেলে দেওয়া হলো।
পরদিন, যখন রাসপুতিনের লাশ উদ্ধার করা হলো, ময়নাতদন্তে উঠে এলো এক রোমহর্ষক সত্য,তিনি রিভলভার কিংবা বিষে মারা যাননি, তার মৃত্যুর কারণ ছিল ডুবে যাওয়া! তার ফুসফুসের মধ্যে জমে থাকা পানি প্রমাণ করছিল, যখন তাকে নদীতে ফেলা হয়েছিল, তখনও তিনি জীবিত ছিলেন!
রাসপুতিনের মৃত্যু যেন এক অভিশপ্ত বার্তা নিয়ে এলো রোমানোভদের জন্য। মৃত্যুর আগে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—
"তিনি যদি সাধারণ জনগণের হাতে মারা যান, তাহলে রাশিয়ার জার শাসন টিকে থাকবে। কিন্তু জারের কোন আত্মীয় তাকে খুন করলে সেটাই হবে রাশিয়ান জার শাসনের শেষ অধ্যায়"
বাস্তবে কিন্তু তাই হয়েছিল। দুই বছর পর, ১৯১৮ সালে, রুশ বিপ্লবের সময় বলশেভিকদের হাতে নির্বংশ হয় রোমানোভ পরিবার।
রাসপুতিনের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ইতিহাসের মোড় ঠিকই ঘুরে গিয়েছিল। তার হত্যার দুই বছরের মধ্যেই রাশিয়ার শেষ জার নিকোলাস দ্বিতীয় এবং তার পরিবার উরাল পর্বতে নির্বাসিত অবস্থায় নির্মমভাবে নিহত হন।
রাসপুতিনের মৃত্যুর পরও তার প্রভাব রাশিয়া থেকে পুরোপুরি মুছে যায়নি। বরং, তার ধোঁয়াটে ব্যক্তিত্ব, রহস্যময় ক্ষমতা আর রাজপরিবারের ওপর তার প্রভাব নিয়ে নানা গল্প গড়ে ওঠে। বলশেভিক বিপ্লবীদের প্রচারণা ও রাজপরিবারের বিরোধীদের কাহিনির মিশ্রণে রাসপুতিন এক পৌরাণিক চরিত্রে পরিণত হন,একজন মিথ, যাকে কেউ ক্ষমতালোভী ষড়যন্ত্রকারী বলে মনে করে, আবার কেউ তাকে এক অতিপ্রাকৃত চিকিৎসক ও সাধক হিসেবে দেখে।
তার জীবন কেবলই ইতিহাসের এক অংশ নয়; এটি রাজনীতি, ধর্ম, ষড়যন্ত্র এবং কিংবদন্তির এক অদ্ভুত মিশেল। তাই হয়তো, যতদিন রাশিয়ার ইতিহাস নিয়ে আলোচনা চলবে, ততদিন রাসপুতিনের নামও আলোচিত হবে,এক বিস্ময়কর ও বিতর্কিত চরিত্র হিসেবে।
যাইহোক সমাপ্তী টানছি ছোটবেলায় শুনা বনি এম এর বিখ্যাত গান এর ‘রাসপুতিন’ এর বিখ্যাত লাইনগুলো দিয়ে-
‘There lived a certain man in Russia long ago
He was big and strong, in his eyes a flaming glow
Most people look at him with terror and with fear
But to Moscow chicks he was such a lovely dear
He could preach the Bible like a preacher
Full
of ecstasy and fire
But he also was the kind of teacher
Women would desire’
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।