অভিকের অদেখা জগৎ
গল্প ৪: সংবাদ পাঠকের ইশারা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
৫ জুলাই, ২০২৬
রাত আটটা। দেয়ালঘড়ির কাঁটাটা আটের ঘরে পড়তেই বাবা রিমোটটা হাতে তুলে নিতেন।
কোনোদিন মিস হতো না। লোডশেডিং হলে সাথে সাথে ইউপিএসের সুইচ টিপতেন। বাড়িতে মেহমান এলে টিভির ভলিউম কমাতেন, কিন্তু বন্ধ করতেন না। চায়ের কাপে বিস্কুট ভিজিয়ে রাখতেন, খেতে ভুলে যেতেন।
খবর শেষ। টিভির লাল লাইটটা নিভে যেত। বাবা রিমোটটা কাঠের টেবিলে রাখতেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলতেন,
দেখলে? আজও আমাকে ইশারা করল।
প্রথম প্রথম আমরা হাসতাম।
নিশি বলত, বাবা, ঢাকার কারওয়ান বাজারের স্টুডিওতে বসে থাকা মানুষটা আপনাকে চিনবে কীভাবে? উনি তো টেলিপ্রম্পটার দেখেন, ক্যামেরা দেখেন।
বাবা চোখ সরু করে তাকাতেন। হাসতেন না। চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখতেন শব্দ করে।
ক্যামেরা আর আমি কি আলাদা? ও আমার চোখের দিকেই তাকায়। তোমরা খেয়াল করো না। তোমরা খবর শোনো, আমি মানুষটা দেখি।
তার গলায় মজা ছিল না। ছিল একটা নিশ্চয়তা। যেন সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, তেমন সত্যি।
ব্যাপারটা হাসির থেকে অস্বস্তিতে গড়াল যেদিন বাবার হাতে খাতা দেখলাম।
সাতটা পঞ্চান্ন। বাবা টিভির সামনে। পিঠ সোজা। কোলে একটা ছোট নীল মলাটের ডায়েরি। হাতে ইকোনো ডিএক্স পেন্সিল। পাশে রাখা আধখাওয়া লেক্সাস বিস্কুট।
সংবাদ পাঠক মাহমুদ হাসান। বয়স চল্লিশের ঘরে হতে পারে। গম্ভীর মুখ, ভয়েসে একটা ভারী ভাব। শার্টের কলারে ছোট্ট একটা দাগ।
বাবা লিখছেন। খসখস শব্দ। ফ্যানের বাতাসে পাতাটা উড়তে চাইছে।
খবর শেষ হতেই বাবা ডায়েরি বন্ধ করলেন। আমার দিকে তাকালেন। পেন্সিলটা কানের পেছনে গুঁজলেন।
আজ নীল টাই। নীল মানে জল। আজ বাইরে গেলে বিপদ। পানিতে বিপদ। ড্রেনের ঢাকনা খোলা থাকতে পারে।
আমি হাসতে গিয়েও থেমে গেলাম। বাবার চোখে ভয়। চোখের নিচে কালি।
বাবা, এগুলো কো-ইনসিডেন্স। উনি তো রোজই টাই পরেন। কাল সবুজ ছিল। পরশু মেরুন।
বাবা মাথা নাড়লেন। বিরক্ত। পেন্সিলটা আবার হাতে নিলেন।
তোমরা বুঝবে না। আজ দুবার চোখ টিপল। একবার প্রধানমন্ত্রীর খবর পড়ার সময়। একবার আবহাওয়ার আগে। দুবার মানে সাবধান। ডাবল সাবধান। একবার হলে ইগনোর করা যেত।
সেদিন অফিসে যাইনি। বসকে মেসেজ দিলাম, জ্বর। কেন যাইনি? জানি না। বাবার চোখের ভয়টা আমাকেও ছুঁয়েছিল। লজিক বলছিল, পাগলামি। তবু পেটের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছিল।
সন্ধ্যায় ফোনে খবর পেলাম, মতিঝিলে সিটি বাস ব্রেক ফেল করে ড্রেনে পড়েছে। শাপলা চত্বরের কাছে। তিনজন স্পট ডেড। আমার অফিসের রাস্তা। আমি ৮টা ২০-এর বাস ধরতাম রোজ।
রাতে খাবার টেবিলে বাবা আমার প্লেটে মাছের মাথাটা তুলে দিলেন। ইলিশের মাথা। কিছু বললেন না। শুধু তাকালেন। সেই তাকানোর অর্থ: দেখলি? আমি বলেছিলাম।
আমার গলা দিয়ে ভাত নামছিল না। ডালের বাটিতে আঙুল ডুবে ছিল।
নিশি যেদিন ভয় পেল, সেদিন বৃষ্টি ছিল। ঝুম বৃষ্টি।
খবর শেষ। আমি ডাইনিংয়ে ল্যাপটপে মেইল চেক করছি। নিশি রান্নাঘরে রুটি সেঁকছে। বাবা একা ড্রয়িংরুমে। সোফার কভারটা একটু সরে গেছে।
হঠাৎ নিশি দৌড়ে এল। মুখ সাদা। হাতে খুন্তি ধরা।
তোমার বাবা... উনি টিভির সাথে কথা বলছেন।
আমি উঁকি দিলাম।
বাবা টিভির একদম সামনে দাঁড়ানো। কাঁচের স্ক্রিনে হাত রেখেছেন। আলতো করে। যেন কারও গাল ছুঁয়ে দিচ্ছেন। আঙুলের ছাপ পড়ছে।
ফিসফিস করে বলছেন, আচ্ছা... বুঝেছি। আর হবে না। কথা দিলাম। আর ভুল হবে না। লাল টাইয়ের দিন বের হব না।
টিভিতে তখন বিজ্ঞাপন চলছে। লাইফবয় সাবানের। সংবাদ পাঠক নেই। স্টুডিও নেই। তবু বাবা মাথা নাড়ছেন। যেন ওপাশ থেকে কেউ উত্তর দিচ্ছে। যেন মাহমুদ হাসান তাকে বকছেন।
ঘরে এসি চলছে ২-এ। তবু আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ঘাম নামল। ঠান্ডা ঘাম।
ডা. রায়হান। আমার ভার্সিটির বন্ধু। সাইকিয়াট্রিস্ট। চেম্বার গ্রিন রোডে।
বাবা যেতে চাননি। দরজা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। লুঙ্গির গিঁট শক্ত করছিলেন বারবার।
আমাকে পাগল বানাতে চাস? ও আমাকে বাঁচাতে চায়। তোরা বুঝিস না কেন? ও আমার বন্ধু।
ডাক্তার দুই ঘণ্টা শুনলেন। বাবা সব বললেন। নীল টাই, চোখ টিপ, গোপন মেসেজ, মঙ্গলবারের সতর্কতা। চায়ের কাপে তিন চামচ চিনি নিলেন।
শেষে আমাদের আলাদা ডাকলেন। তার চেম্বারে ফাইল ক্যাবিনেটের উপর একটা ছোট টবের গাছ।
এটাকে পার্সিকিউটরি ডিলিউশন বলে। সাথে রেফারেন্সিয়াল ডিলিউশন। উনি বিশ্বাস করেন, টিভির ব্রডকাস্ট বিশেষ করে ওনার জন্য। এটা ওনার কাছে পানি খাওয়ার মতো সত্যি। আপনারা যতই লজিক দেন, লাভ নেই। ব্রেইনের কেমিক্যাল গোলমাল। সেরোটোনিন, ডোপামিন। ওষুধ লাগবে। আর আপনাদের পেশেন্স। সবচেয়ে বেশি লাগবে সেটা।
‘কেমিক্যাল গোলমাল’। কথাটা শুনে আমার বাবাকে হঠাৎ খুব ছোট লাগল। একটা পুরনো রেডিও। যার একটা তার কেটে গেছে, তাই ঝিরঝির করছে।
প্রথম তিন মাস।
বাবা ওষুধ মুখ থেকে ফেলে দিতেন। পানের পিকের মতো।
এগুলো খেলে ওর সিগন্যাল ধরতে পারি না! ও যদি আমাকে ওয়ার্ন করতে না পারে? যদি তোদের কিছু হয়? যদি রায়ানের স্কুল বাস অ্যাক্সিডেন্ট করে?
নিশি চুপচাপ পানির গ্লাস এগিয়ে দিত। তর্ক না। যুক্তি না। শুধু পাশে থাকা। মাঝে মাঝে বাবার পা টিপে দিত।
এক রাতে বাবা আমার হাত চেপে ধরলেন। তার হাত ঠান্ডা।
অভিক, আজ খবরের সময় ও আমার দিকে তাকায়নি। একবারও না। ও কি আমার উপর রাগ করেছে? আমি ওষুধ খাচ্ছি বলে? ও কি ভাবছে আমি ওকে বিশ্বাস করি না?
আমি কী উত্তর দেব? বললাম, ঘুমান বাবা। কাল সকালে রমনা পার্কে হাঁটতে যাব। চা খাব।
ধীরে ধীরে ঝাপসা হলো সব।
ছয় মাস পর। বাবা আবার বিকেলে হাঁটেন। মাথায় ক্যাপ পরেন। ছাদে টবের গন্ধরাজ গাছে পানি দেন। আমার ছেলে, রায়ান, তার সাথে প্লাস্টিকের ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলে। বাবা ইচ্ছে করে আউট হন।
এক রাতে খবর শেষ হলে বাবা নিজেই রিমোট দিয়ে টিভি বন্ধ করলেন। তারপর হাসলেন। ক্লান্ত হাসি। চোখের কোণে পানি।
মনে হয় অনেক কিছুই ভুল বুঝেছিলাম রে। বয়স হলে মানুষের মাথা যায়। প্রেশারের ওষুধ বাদ দিয়েছিলাম তো।
আমার বুক থেকে একটা পাথর নামল। নিশি আমার হাত চাপ দিল। টেবিলের নিচে। আমরা জিতে গেছি বলে মনে হলো।
আরও তিন সপ্তাহ পর। মঙ্গলবার।
রাত আটটা। আমি ডাইনিংয়ে ল্যাপটপে কাজ করছি। প্রেজেন্টেশনের স্লাইড বানাচ্ছি। নিশি রান্নাঘরে মুরগি কষাচ্ছে। আদা-রসুনের গন্ধ আসছে।
রায়ান, আমার সাত বছরের ছেলে, টিভির সামনে। কার্টুন শেষ। খবর চলছে। মাহমুদ হাসান পড়ছেন: আগামীকাল ঢাকায় হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি।
হঠাৎ রায়ান উঠে এল। আমার শার্টের হাতা টানল। তার চোখ বড় বড়। ভয় নেই। আছে কৌতূহল। একদম নতুন খেলনা দেখার কৌতূহল। নতুন সাইকেল পেলে যেমন হয়।
বাবা...
উঁ?
সে টিভির দিকে আঙুল তুলল না। আমার দিকেই তাকিয়ে রইল। যেন উত্তরটা আমার চোখে লেখা আছে। গলার স্বর নিচু।
ওই আঙ্কেলটা... আমার দিকে তাকিয়ে হাসল কেন? চোখ টিপ দিল একবার।
আমার আঙুল কিবোর্ডের উপর জমে গেল। কার্সরটা ব্লিঙ্ক করছে।
আস্তে করে ঘাড় ঘোরালাম।
টিভিতে মাহমুদ হাসান। তিনি খবর শেষ করে ফোল্ডার গোছাচ্ছেন। মুখে প্রফেশনাল হাসি। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলছেন, আজ এ পর্যন্তই। শুভ রাত্রি। টেবিলে পানির গ্লাস অর্ধেক ভরা।
স্বাভাবিক। একদম স্বাভাবিক দৃশ্য। রোজকার।
হয়তো ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল। হয়তো রায়ানের কল্পনা। বাচ্চারা তো কত কিছুই ভাবে। কাল বলেছে দেয়ালে টিকটিকি ওর সাথে কথা বলেছে।
হয়তো না।
আমি উত্তর দিলাম না। রায়ানকে কোলে তুলে নিলাম। ওর ছোট্ট হাতটা আমার গলার কাছে। ঘামে ভেজা। আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। আমার হাত কাঁপছিল। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
নিশি রান্নাঘর থেকে বলল, খেতে এসো তোমরা। মুরগিটা হয়ে গেছে।
আমি উঠলাম না। টিভির দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনে এখন গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপন।
কিন্তু আমার মনে হলো, ক্যামেরাটা এখনো অন আছে। রেকর্ডিং লাইটটা জ্বলছে।
আর কেউ একজন, এই স্ক্রিনের ওপাশ থেকে, আমাদের ড্রয়িংরুমের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ানের চোখের দিকে।
অপেক্ষা করছে।
পরের জনকে বেছে নেওয়ার জন্য।
(চলবে… গল্প ৫: যে চিঠিগুলো কেউ লিখত না)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।