রিকশা, আংটি ও আমি (২য় পর্ব)
হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করলাম—এখানে কী আমার করার কিছু ছিল?
আমি নিতান্তই একজন সাধারণ মানুষ। কোনো সিনেমা-নাটকের চরিত্র নই। চাইলেই অনেক কিছুই করতে পারি না। করার ক্ষমতা, সাহস বা মানসিক দৃঢ়তা—কোনোটাই নেই।
ভাবতে লাগলাম, এই একটি ঘটনায় কয়জন মানুষ বিপদগ্রস্ত হলো?
যে মেয়েটির জন্য সোনাগুলো দেওয়া হয়েছিল, হয়তো তার বিয়ে ভাঙবে, স্বপ্ন ভাঙবে। তার পরিবার সমস্যায় পড়বে। যার মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছিল, তিনি সবার কাছে বিশ্বাস হারাবেন। ক্ষতিপূরণ দিতে হলে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
যে রিকশাচালক জিনিসগুলো পেলেন, তার জীবনের জন্যও এটি হুমকির কারণ হতে পারে।
অবস্থাদৃষ্টে যেটুকু মনে হলো, আমার নতুন রিকশাচালক তাকে খুঁজে বের করবেই। লোভ হয়তো তার জীবনের শান্তি কেড়ে নেবে।
এরপর আবার নিজেকে বোঝালাম, এসবের কিছুই হবে না।
এমনও হতে পারে, যাদের সোনা হারিয়েছে -তাদের জন্য এ আর্থিক ক্ষতিটা তেমন কোনো ব্যাপারই না।
আমার রিকশাচালকটি আপাতদৃষ্টিতে ভাগ্যবান রিকশাচালকের আর কোনো হদিস পেলেন না। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সব কিছুই ভুলে গেলেন। এদিকে ভাগ্যবান রিকশাচালকটির কোনো বিপদই হলো না। হয়তো খুব ধুমধাম করে বোনের বিয়েও দিয়ে দিলেন।
এতক্ষণ আমি একটি ঘটনার সম্ভাব্য অনিশ্চিত পরিণতি নিয়ে আবেগতাড়িত ছিলাম।
বাসায় পৌঁছাতে আরও দশ-পনেরো মিনিট সময় লাগবে। এ ফাঁকে এবার অন্যভাবে প্রথম থেকেই বিষয়টি আর একটু পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি।
আমি রিকশার জন্য দাঁড়ালাম। একটু পর রিকশাটি এলো। ভাড়ার ব্যাপারটি কীভাবে ফয়সালা হয়েছিল? একটু চিন্তা করি। যেটুকু মনে পড়ছে, রিকশাচালক বলেছেন, ‘সবসময় যা দেন, তাই দেবেন।’ রিকশাচালক আমি যা বলেছি, তাতেই রাজি হয়েছেন।
৮–১০ বার প্যাডেল ঘোরানোর পর ওয়ালেটটি পেলেন। ওয়ালেট পাওয়ার পর বিস্মিত হওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু তাঁর চেহারায় কোনো বিস্ময়ভাব ফুটে ওঠেনি। মনে হয়েছে, এভাবে ওয়ালেট পাওয়াটা খুবই নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। এছাড়া ওয়ালেট খুলে আমাকে টাকা দেখানোটাও স্বাভাবিক ব্যাপার না।
টেরিবাজারের মুখে গিয়ে চেইন ছিঁড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কতটা সত্যি? আমার মনে হয়েছে, চেইন খুলে গিয়েছিল। চেইন সাধারণত ছিঁড়তে দেখা যায় না।
সঙ্গে সঙ্গে রিকশা পাওয়াটা স্বাভাবিক বলেই ধরে নিলাম। কিন্তু আগের রিকশাচালক আমাদের সামনে পুনরায় ওয়ালেট খুলে দেখাটা কতটুকু স্বাভাবিক?
১ম রিকশাচালক যখন পুঁটলিটা বের করেছেন, তখন তাঁর কাছে সেটা ভারী মনে হওয়ার কথা। ৩ ভরি ওজনের একটি আংটি যথেষ্ট ভারী। এছাড়া চিঠিটা ছিল ছোট চিরকুটের মতো। এত ভারী একটি জিনিস নিজে খুলে না দেখে দ্বিতীয় রিকশাচালককে দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?
২য় রিকশাচালকেরও পুঁটলিটা হাতে নেওয়া মাত্র ভারী মনে হওয়ার কথা। ধরে নিলাম, তিনি বুঝেননি। এক্ষেত্রে যখন জানতে পেরেছেন পুঁটলিতে ৩ ভরি ওজনের আংটি আছে, তখন কৌতূহলবশত পুরো আংটিটা খুলে দেখাটা স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। তিনি সেটা করেননি; সামান্য একটু অংশ মাত্র আমাকে দেখিয়েছেন।
আর একটি ভাবনার বিষয় হলো—বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির স্মার্ট যুগে আদৌ কী কেউ ফোন না করে চিঠি লিখবে? তাছাড়া একজনের দেওয়া একটা দামী আমানত এত অসাবধানে রাখবে?
২য় রিকশাচালক লোভে পড়ে আংটিটা নিতে চাওয়াটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু যাত্রীকে বারবার নেওয়ার অনুরোধ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
মোমিন রোডে এসে রিকশা দাঁড়ানোর পর একজন লোক এসে—কোনো ভদ্রলোকের গয়না হারানোর গল্প আমার সামনে আমারই রিকশাচালককে বলা কতটা স্বাভাবিক?
এছাড়া ২য় রিকশাচালক বলছিলেন, ‘১ম রিকশাচালককে তখনও দেখা যাচ্ছে।’ তখন আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছি, ‘উনি এত দূর পর্যন্ত কেন এসেছেন?’
যিনি এত দামী একটি জিনিস পেয়েছেন, তাঁর উচিত ছিল তৎক্ষণাৎ ঐ স্থান ত্যাগ করা। সে মুহূর্তে তাকে আমার বোকা বলেই মনে হয়েছিল।
২য় রিকশাচালক যখন আমাকে চেরাগী পাহাড়ের মোড়ে নামিয়ে দিলেন, তখন আমি রিকশাচালককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাঁকে আপনি পাবেন কোথায়?’
২য় রিকশাচালক বললেন, ‘সে পিছনে আছে।’
হেঁটে আসার জন্য টেরিবাজারের মুখ থেকে চেরাগী পাহাড়ের মোড় পর্যন্ত কম দূরত্ব নয়। এত দামী একটি জিনিস নিয়ে অহেতুক ঘোরাঘুরির কারণ কী হতে পারে?
২য় রিকশাচালক আংটিটা নিজে নিতে চাচ্ছেন—সেটা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু আমি নামার সময়ও আমাকে আংটিটা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করাটা কতটুকু স্বাভাবিক ও যৌক্তিক?
আমার ক্ষুদ্র মাথায় কিছুই স্পষ্ট হচ্ছে না এবং ঘটনাটা এখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। হয়তো আপনাদের চোখে এর ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা ধরা পড়বে।
এটা কি তিনজনের কোনো পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ ছিল, যার শিকার ছিলাম আমি?
আপনাদের কী মনে হয়, জানাবেন।
ইতোমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয় হয়—আমি দ্রুত পা চালালাম।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।