পড়াশোনা : শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার্থী
পর্ব-২
দৃশ্যপট-২
পিরিয়ডটা ছিলো শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বিষয়ের।৭ম শ্রেণিতে নির্ধারিত বিষয় শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে আমি ক্লাস নিতে যায়।এ ক্লাসে আমার নির্দিষ্ট কোনো পিরিয়ড নেই। শারীরিক শিক্ষার ক্লাসে শিক্ষার্থীরা সাধারণত মাঠে যায়।কিন্তু সেদিন বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো।শিক্ষার্থীরা বায়না করল,তারা ক্লাসে দল করে বসে বসে খেলবে।প্রথমে আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না।পরবর্তীতে তাদের বায়নার কাছে হার মানলাম।
এখন আমরা অভিভাবকরা চাইলে একটু আঁতকে উঠতে পারি।পড়াশোনা বাদ দিয়ে ক্লাস রুমে খেলাধূলা! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছেলেদের একেবারে উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছে।
আমি শিক্ষার্থীদের বললাম,’ দু'টো শর্তে তোমরা খেলতে পারবে।প্রথম শর্ত হলো-- এমনভাবে খেলবে যাতে পার্শ্ববর্তী ক্লাসরুমে কোনো শব্দ না যায়।তাদের ক্লাসে যেন কোনো অসুবিধা না হয়।‘
তারা একবাক্যে রাজি হলো।
আমাদের ছেলেবেলায় বসে বসে কিছু খেলার প্রচলন ছিলো।ঘরে কিংবা ক্লাসে লুকিয়ে লুকিয়ে খেলতাম।যেহেতু তখন বেশির ভাগই যৌথ পরিবার ছিলো- তাই ভাইবোনের সংখ্যা ও বেশি ছিলো।বড়দের ফাঁকি দিয়ে বইয়ের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে খেলার মতো কিছু জনপ্রিয় খেলার প্রচলন ছিলো।
এসব খেলার মধ্যে কয়েকটার কথা খুব মনে পড়ে।
একটা ছিলো' যদু,মধু, রাম, শ্যাম'।এ ধরণের আর একটি খেলা ছিলো, 'চোর-পুলিশ'। এ খেলায় প্রত্যেকের নির্দিষ্ট স্কোর থাকত।
আমার মতো অন্য কোনো অভিভাবকের , এ ধরনের অন্য কোনো খেলার কথা কী মনে পড়ে?
এখনকার শিক্ষার্থীরা এসব খেলার কথা জানেনা।তারা ফাঁক ফেলেই দু' টো খেলা খেলে।একটা হলো কলম ফাইট( কলমে কলনে টুকাটুকি)
দ্বিতীয়টি হলো- হাতে হাতে ক্রিকেট খেলা।প্রথমটি যা একটু নুঝা যায়, দ্বিতীয়টা সত্যিকার অর্থেই কী?এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।
এবার আমার দ্বিতীয় শর্তের কথা বলি।
ক্লাসে জাহিদ নামে একজন স্পেশাল চাইল্ড আছে।সবসময় ক্লাসে পিছনের বেঞ্চে বসে থাকে।কেউ তার সাথে মিশে না। মুখ দিয়ে সবসময় লালা পড়ে। ভালোভাবে কথা বলতে পারেনা।হাঁটতে ও কিছুটা সমস্যা হয়। কোনো কিছু পড়তে দিলে পড়ে মোটামুটি লিখে দিতে পারে।কিন্তু নিজে থেকে কিছু বুঝে লিখতে পারে না। ঠিক এ কারণেই সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয়না।
আমার দ্বিতীয় শর্ত ছিল, শিক্ষার্থীরা যখন খেলবে তখন তাদের সাথে জাহিদকে রাখতে হবে।শুধু তাই না তাকে খেলার সুযোগ দিতে হবে।পুরো ক্লাস আবারও রাজি হলো। জাহিদ প্রথমবারের মতো তার সহপাঠীদের সাথে খেলায় অংশগ্রহণ করল।
সেদিন জাহিদের চোখে- মুখে যে স্বর্গীয় আনন্দ দেখেছি তা ভুলবার নয়।তার চোখ দু' টি জ্বলজ্বল করছিল।খেলার ফাঁকে একটু পর পর আমার দিকে তাকাচ্ছিল।
পরবর্তীতে কিছুদিন আমাকে ৭ম শ্রেণিতে শ্রেণি শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হয়।জাহিদকে পিছনের বেঞ্চ থেকে সামনের বেঞ্চে বসার সুযোগ করে দিয়েছি।প্রায়ই তাকে বোর্ডে এনে এমন সব প্রশ্ন লিখতে দিতাম -যা সে খুব সহজেই উত্তর দিতে পারবে।অন্য শিক্ষার্থীদের বলতাম হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করতে। সে খুব খুশি হতো।আমাকে দেখামাত্র তার চোখে- মুখে যে অনাবিল আনন্দ ফুটে উঠত তা দেখে সত্যিকার অর্থেই আমি এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি অনুভব করতাম।অন্য শিক্ষার্থীদের মতো বড় কোনো জায়গায় যাওয়ার ভাগ্য হয়তো তার নেই।কিন্তু অন্যদের মতো সম অধিকার পাওয়ার সুযোগ তারও থাকা উচিত।
আগের বিষয়ে আবার ফিরে আসি।শিক্ষার্থীরা খুব দ্রুত দলে ভাগ হয়ে গেলো। প্রত্যেক দলে স্বয়ং ক্রিয়ভাবে একজন দলনেতা তৈরি হয়ে গেলো।
তারা হয়তো ভবিষ্যতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে নেতৃত্ব দেবে।নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা তাদের সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হবে।
অন্যান্য শিক্ষার্থীরা দলনেতার নির্দেশ মেনে খেলবে।এতে তারা ভবিষ্যতে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখবে।
জাহিদকে নিয়ে খেলা তাদের শেখাবে সহনাভুতিশীলতা ও সহমর্মিতার মনোভাব।তাদের এটাও শিখাবে প্রত্যেক ব্যক্তি সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।