শান্তি নগরে একসময় রাত নামলেই দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে যেত। কুকুরের ডাক, মোটরসাইকেলের শব্দ আর মানুষের বুক ধড়ফড়- এই ছিলো নিয়ম। চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি যেন এলাকাটার নিজস্ব সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শেষমেশ মানুষ সিদ্ধান্ত নিলো, আর না। নিজেরাই কিছু করবে। সভা বসলো। বক্তৃতা হলো। চা-বিস্কুট খাওয়া হলো। তারপর জন্ম নিলো এক ঐতিহাসিক সংগঠন- ছিনতাই দমন কমিটি, সংক্ষেপে ছিদক। নামটা এমন ভারী যে শুনলেই মনে হয় ছিনতাইকারীরা নিজে নিজেই এলাকা ছেড়ে পালাবে। টহল টিম বানানো হলো।
সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত হলো, পাহারা দলের লিডার হবে গালকাটা আজগর। লোকটা সাহসী, এলাকার সব অলিগলি চেনে, আবার কথা বললে মানুষের বুক গরম হয়ে যায়।
আজগর শুধু কমিটির প্রধান না। সে-ই পাহারা দলের কমান্ডার। কার কখন ডিউটি, কোথায় চৌকি, কোন স্পটে কোন অস্ত্র—সব সিদ্ধান্ত তার। তার কথাই শেষ কথা।
শুরুটা ছিলো রূপকথার মতো। টহল বসলো, দেশীয় অস্ত্র ঝনঝন করলো, টর্চের আলোয় ছিনতাইকারীদের ছায়া পালালো। মানুষ বললো, “আজগর থাকলে ভয় নাই।”
কয়েকদিন পর আজগর জরুরি মিটিং ডাকলো। মিটিংয়ে আবেগে তার গলা ধরে এলো।
“তোমরাই এলাকার অতন্দ্র প্রহরী। তোমাদের জন্যই আজ মানুষ ঘুমায়।”
হাততালি পড়লো। বুক ফুললো।
তারপর আজগর সবাইকে বের করে দিয়ে শুধু পাহারা দলের লিডারদের নিয়ে বসলো। দরজা বন্ধ। এবার আবেগ নাই, শুধু হিসাব।
কাটা গালে হাত বুলিয়ে সে বললো,
“রাত জাইগা পাহারা দাও, দিনে কাম করো। এইভাবে কতদিন চলবে? তোমাদেরও তো সংসার আছে।”
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো- জ্বি ভাই।
এবার আজগর শান্ত গলায় তার বক্তব্য পরিস্কার করলো “এলাকায় কারা ছিনতাই করে, আমি জানি। ওদের কাছ থেইকাই মাসোয়ারা নিতে হবে। এই টাকায় তোমাদের টহল ভাতা চলবো।”
সিদ্ধান্ত ফাইনাল হলো। সবাই খুশি।
কয়েকদিন পর আজগর নিজেই গেলো ছিনতাই সিন্ডিকেটের সর্দার চা পাতি হান্নানের কাছে। কোনো ঘুরপথ না। একদম সোজা কথা।
“শোনো হান্নান, শান্তি নগর এখন আমার জিম্মায়। এখানে কী ছিনতাই হবে, কখন হবে- সব আমি জানবো। মাসে এক লাখ টাকা দিবা।”
হান্নান চমকে উঠলো।
“আমাগো কাম বন্ধ কইরা আবার আমাগো কাছ থেইকা ট্যাকা চান? এইটা কেমুন হিসাব?”
আজগর হেসে ফেললো। ঠান্ডা হাসি।
“তোমরা টাকা দিবা, আমরা মামলা দিমু না। বাড়িতে হামলা হইবো না। এলাকা ছাড়তে হইবো না। আর যখন যেখানে ছিনতাই করবা, খবর রাখবো।”
হান্নান বুঝে গেলো- এটা প্রস্তাব না, নির্দেশ। রাজি হলো।
এরপর শান্তি নগরে আবার ছিনতাই শুরু হলো। তবে এলোমেলো না। নিয়ম মেনে।
মানুষ অভিযোগ করলো। আজগরের কন্ঠে আশ্বাস ঝরে পড়লো-
“পাহারা আরো জোরদার করা হইবো।”
পকেট জোরদার হলো। পাহারা না।
একদিন মানুষ দল বেঁধে আজগরের কাছে গেলো। এবার আর মিনতি না, ক্ষোভ।
আজগর ক্ষেপে গেলো-
“এসব মিথ্যা অভিযোগ। শান্তি বিরোধী একটি চক্র আমাদের বদনাম করতে চায়।”
মানুষ বললো, “চুরি হচ্ছে, ছিনতাই হচ্ছে!”
আজগর গলা চড়িয়ে শেষ কথা বললো,
“দেখেন, আমরা তো প্রতিদিন খোলা আকাশের নিচে পাহারা দেই। কই, আমাদের তো কোনো চুরি হয় না। কোনো ছিনতাই হয় না। তাহলে সমস্যা কোথায়?
সমস্যা আপনাদের মাথায়।"
আজগরের লোকজন সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো- ঠিক..ঠিক... ।
এলাকাবাসী চুপ মেরে গেলো।পাহারাদারদের কিছু হয় না-এটাই প্রমাণ। এলাকা নিরাপদ।
শান্তি নগরের মানুষ বুঝে গেলো,
এলাকায় ছিনতাই বন্ধ হয়নি।
ছিনতাই শুধু ক্ষমতা পেয়ে গেছে।
আর সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ হলো- পাহারাদার।
(বরাবরের মতই এটি একটি রম্য রচনা। গল্পের চরিত্র,ঘটনা,বিষয়বস্তু সবই কাল্পনিক। কারো সাথে মিলে গেলে সেটি কাকতালীয়।)
#পাহারাদার
লেখক-
মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক,সাংবাদিক ও গল্পকার
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।