জয়নাল মিয়ার ছেলের মুসলমানী। বাড়ির সামনে এমন একখান বিশাল গেট বানানো হয়েছে, দেখলে মনে হয় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রবেশদ্বার।
গেটের মাঝখানে ঝুলছে জয়নাল মিয়ার ছেলে শাফিনের বিশাল ছবি।
ছবির নিচে রঙিন ব্যানারে লেখা,
“শাফিনের ১ম সুন্নতে খৎনা।”
একবার খৎনা হলে আবার খৎনা হবে কিভাবে!
সেই গভীর তত্ত্ব আমার গোবর মাথায় ঢুকল না।
তবে আয়োজন দেখে বুঝলাম, এখানে যুক্তি খোঁজার দরকার নাই, দেখাই আসল।
পুরো বাড়ি আলোকসজ্জায় ঝলমল।
সামনে ফাঁকা ধান ক্ষেতে বিশাল প্যান্ডেল।
ভেতরে ঢুকেই চোখ কপালে।
এক পাশে রাজকীয় স্টেজ, তার ওপর সিংহাসনের মতো চেয়ার।
সেই চেয়ারে লুঙ্গি তুলে, কাটা পুংযন্ত্র গর্বের সাথে প্রদর্শন করে বসে আছে জয়নালের ছেলে শাফিন।
মনে হচ্ছে- কোনো জাতীয় সম্পদের উদ্বোধন হচ্ছে।
সাউন্ড বক্সে ধুমধাড়াক্কা হিন্দি গান।
“মুন্নি বদনাম হুয়ি, ডার্লিং তেরে লিয়ে…”
দাওয়াতি লোকজন ভাত খেয়ে একবার করে কর্তিত পুংদণ্ড দর্শন করছে,
তারপর পাশের ক্যাশ টেবিলে গিয়ে নজরানা রেখে আসছে।
দেখে মনে হয় এটা নজরানা না, রীতিমতো শিশ্ন দর্শনের টিকিট।
মাইক্রোফোন হাতে এলাকার দাদন ব্যবসায়ী নগদ নাসির দরাজ গলায় ঘোষণা দিচ্ছে,
“প্রিয় দাওয়াতি ভাই ও বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম।
জয়নাল ভাই বড় শখ কইরা আয়োজন করছে।
নজরানা একটু বেশি কইরা দিয়েন।
গরিব মানুষ।”
এই ‘গরিব মানুষ’ কথাটা বলার সময় তার গলায় এমন দরদ,
যেনো সে নিজেই সদ্য সর্বস্ব হারিয়েছে।
জয়নাল মিয়া লোক হিসেবে খুব হিসেবি।
বেছে বেছে এলাকার পয়সাওয়ালা, গন্যমান্য লোকদেরই দাওয়াত দিয়েছে।
সৌভাগ্যক্রমে আমি সেই তালিকার একজন।
খাওয়া শেষে স্টেজের দিকে এগোলাম।
শাফিন তখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে তার কাঁটাছেড়া প্রজনন দণ্ড দেখিয়ে মুসলমানিত্বের প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে।
আমি তার শিক্ষক।
আমাকে দেখে সে লজ্জা পেয়ে লুঙ্গি নামিয়ে ইজ্জত ঢাকার চেষ্টা করল।
ঠিক তখনই অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ছ্যাচড়া বাবুল চেঁচিয়ে উঠল,
“ওই, বার বার ঢাকোস ক্যা?
না দেইখা মাইনসে দোয়া করবো ক্যামনে?”
শিক্ষকসুলভ দায়িত্ববোধে শাফিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
তারপর নিরুপায় হয়ে ক্যাশ টেবিলের দিকে হাঁটা ধরলাম।
ক্যাশ টেবিলে বসে আছে জয়নাল মিয়ার শালা কেউটা কাদের।
পান খাওয়া খয়েরি কালারের বত্রিশটা দাঁত একসাথে বের করে হাসতে হাসতে বলল,
“স্যার, আপনের ছাত্রের মুসলমানি।
দুই হাজারের কম দিলে কিন্তু কেউই খুশি হইবো না।”
আমি দুই পয়সার মাস্টার।
গত তিন দিনে দুইটা বিয়ে আর এক জন্মদিনে খেয়ে ফতুর।
আজ আবার এক হাজার টাকা ধার করে দাওয়াত খেতে এসেছি।
কিছু না বলে মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলাম।
প্যান্ডেলের ভেতর থেকে ফিসফাস কানে এলো,
“মাস্টার মাইনসের মন ছুডো।
ছুডো লোক গরে দাওয়াত দেওয়াই ঠিক না।
আইজকাল অটোয়ালাও পনেরশো টেহা দেয়।”
আরেকজন আফসোস করে বলল,
“কি আয়োজন করলাম ভাই।
মানুষ টেহাই দিবার চায় না।
মনে হয় আসলই উডবো না।”
অপমান গিলে পাশের গলিতে ঢুকলাম।
গলির ডানপাশে জয়নাল মিয়ার চাচাত বোন কোহিনুরের বাড়ি।
আমাকে দেখে কোহিনুর সালাম দিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
দাওয়াতে যাও নাই?
প্রশ্ন শুনে কহিনুরের মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
মাথা নিচু করে বলল,
গরীব মাইনসেক কেডা দাওয়াত দেয় স্যার?
আমরা তো কিছু দিবার পামু না।
শেষ কথাটায় তার গলা ভারী হয়ে উঠল।
আমি উত্তর খুঁজে পেলাম না।
হাঁটতে হাঁটতে কইমারী বাজারে পৌঁছালাম।
গিন্নি গরম মসলা আনতে বলেছে।
মসলার দোকানদার জব্বার চাচা হাত উঁচিয়ে সালাম দিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন তো সিজন, ব্যবসা কেমন?
চাচা বিরক্ত মুখে বললেন,
আমাগো বাকীর ব্যবসা বাবা।
আমাগো চাইতে দালালগো ব্যবসা ভালা।
জব্বার চাচার কথা আমার মাথার উপর দিয়ে গেলো।
বললাম, আপনার কথা ঠিক বুঝলাম না চাচা।
জব্বার চাচা মসলা মাপতে মাপতে আশপাশে কেউ শুনছে কি না দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে বললেন,
স্যার, এইসব আয়জন এমনে এমনে হয় না।
এর পিছে আছে পুরা একখান সিন্ডিকেট।
আমি থমকে গেলাম।
সিন্ডিকেট শব্দটা শুনলেই আমার মাথায় সোনা পাচার, ইয়াবা, কয়লা এইসব আসে।
মুসলমানির সাথেও যে সিন্ডিকেট জড়িত, সেটা আমার জানা ছিল না।
চাচা বলতে লাগলেন,
নগদ নাসির হইলো এইটার চেয়ারম্যান।
ছেঁচড়া বাবুল সেক্রেটারি।
কেউটা কাদের ক্যাশিয়ার।
আর পেটকা মফিজ মাঠ পর্যায়ের কর্মী।
চাচা আরও স্পষ্ট করে বোঝাতে লাগলেন।
এদের কাজ খুব সিস্টেমেটিক।
আগে খোঁজ নেয় কোন বাড়িতে বিয়ে ঠিক হয়েছে,
কার ঘরে মুসলমানিযোগ্য পোলা আছে,
কার সন্তানের জন্মদিন সামনে।
বিশেষ করে গরিব আর মধ্যবিত্ত পরিবারই এদের টার্গেট।
খোঁজ পেলে শুরু হয় গোপন বৈঠক।
মালিক পক্ষকে বুঝানো হয়,
“আপনের এক টেহাও খরচ হইবো না।
সব আমরা করমু।
গেট, প্যান্ডেল, মাইক, গান, দাওয়াত কার্ড, মাংস, মসলা, চাল ডাল সব।
আপনি শুধু অনুমতিডা দেন।”
মালিক পক্ষ প্রথমে আমতা আমতা করে।
তখন সিন্ডিকেট শেষ চালটা দেয়,
“ক্যাশ টেবিলে যা উঠবো, তার তিন ভাগের এক ভাগ আপনি পাইবেন।”
এতে নব্বই ভাগ মানুষই রাজি হয়ে যায়।
এরপর সব আয়োজন করা হয় বাকিতে।
দোকানদারদের বলা হয় অনুষ্ঠান শেষে টাকা মিটাইয়া দিমু।
বেছে বেছে টাকাওয়ালা, গন্য-মান্য লোকদের দাওয়াত দেওয়া হয়।
প্যান্ডেল ওঠে, গান বাজে, লোক খায়।
ক্যাশ টেবিলে বসে কেউটা কাদের।
নজরানা আদায় হয় ধর্মীয় আবেগ আর সামাজিক লজ্জার মিশ্রণে।
অনুষ্ঠান শেষে টাকাগুলো ভাগ হয়।
এক ভাগ মালিক পক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
বাকি দুই ভাগ সিন্ডিকেটের পকেটে।
পরের দিন দোকানদারদের বাকি টাকা শোধ করা হয়।
যা বাঁচে, সেটাই খাঁটি লাভ।
বিনা পুঁজিতে ব্যবসা।
বাকি নাই, ঝুঁকি নাই, লাইসেন্স লাগে না, ট্যাক্স নাই, পুলিশ নাই।
জব্বার চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“এই জন্যই স্যার, এখন দাওয়াত মানে দাওয়াত না।
এইটা একখান প্রজেক্ট।
এতে অবশ্য আমাগো ব্যবসা ভালা হয়।
আপনি আবার কাউরে কইয়েন না স্যার।
বিশ্বাস কইরা কইলাম।”
আমি ভাবনার বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার কহিনূরের মুখটা মনে পড়ছিল।
দাওয়াতের আলো, গান, প্যান্ডেল আর ক্যাশ টেবিলের ঝনঝনানির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মুখ।
যাদের দেওয়ার কিছু নেই বলেই ডাক পড়ে না।
আগে মানুষ মানুষকে এক বেলা খাওয়ানোর জন্য দাওয়াত দিত।
আর এখন আয়োজন হয় মানুষ থেকে টাকা খাওয়ার জন্য।
আয়োজনে সুন্নতটা থাকে।
তবে ফরজটা আদায় হয় ক্যাশ টেবিলে।
আর কোহিনূরদের মতো মানুষগুলো থাকে আয়োজনের বাইরে, আলোর বাইরে, তালিকার বাইরে।
ভাবলাম, আহা!
যদি প্রতিটা দাওয়াত কার্ডে লেখা থাকত,
“কোন ক্যাশ টেবিল থাকবে না।
দয়া করে কেউ কোনো উপহার আনবেন না।
শুধু দোয়া করবেন।”
তাহলে মানুষের প্রতি মানুষের দোয়া এবং ভালোবাসাগুলো ক্যাশটেবিলের ড্রয়ারে বন্দি হতো না।
(বি:দ্র: বরাবরের মতোই এটি একটি স্যাটারিক রম্য রচনা। গল্পের ঘটনা, স্থান, কাল, চরিত্র সবই কাল্পনিক। যদি বাস্তবতার সাথে মিলে যায় তবে সেটি অতি অচিন্তনীয় কাকতাল মাত্র।)
লেখক : মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক, সাংবাদিক, গল্পকার ও কলামিস্ট
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।