পচিশের সিমান্তে দাঁড়িয়ে
—রফিক আতা—
“زندگی بڑی عجیب ہے، شام نہیں گزرتی مگر سال گزر جاتے ہیں ”
জীবন বড়ই অদ্ভুত!
সন্ধ্যা যেন কাটতেই চায় না,
অথচ দিব্যি বছরগুলো কেটে যায় নিঃশব্দে।
বছরের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে মির্জা গালিবের এই লাইনগুলো আজ আমার অগোছালো অন্তরের ভেতর প্রকট আকারে মাথা তোলে। তীব্র এক ছবি মনকে নাড়িয়ে দেয় অঝোরে—স্মরণ করিয়ে দেয় বিগত বারোটি মাসের ভয়াবহ দিনগুলোকে। কত ক্ষণে ক্ষণে যে ভেঙে পড়েছি, তা শুধুই আমার জানাজানি। ক্লান্ত আর বিপন্ন জীবনের এক অবিরাম দ্বারে দাঁড়িয়ে আমি যেন প্রতিনিয়ত ধ্বসে গিয়েছি।
একটা আর্টিকেল, কোন মুক্তগদ্য কিংবা কবিতা লেখায় আমি যখন নিমগ্ন থাকি—তখন বোঝাই যায় না সময় কত দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। কারো কথা যেন কানে পৌঁছায় না। ঠিক তেমনি কোনো এক ফাঁকে, অযত্ন–অবহেলায় একটি বছর কেটে গেল—আমি টেরই পেলাম না। অথচ এই আমি—শৈত্যের শীতলতায় বসে নিশির চাঁদে নিমগ্ন হয়ে থাকি, ভাবি—সময় বুঝি আমার হাতেই স্থির।
সহস্র জল্পনার ভিড়ে রাত হয়ে ওঠে উপভোগ্য।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি—সময় থমকে আছে দেড়টার বিষাক্ত কাটায়। অথচ আমার মনে হয়—এই বুঝি রাত ফুরোবে। আধুনিকতার যুগে মানুষ এখন ক্যালেন্ডারে আর তেমন অভ্যস্ত নয়; তারিখ দেখার জন্য হাতের স্মার্টফোনটাই যথেষ্ট। তবু একটু গড়িমসি করে আমি ক্যালেন্ডারটা উল্টালাম—আর তখনই চমকে উঠলাম।
হায়!
মির্জা গালিবের সুর আবার তীব্র হয়ে বেজে উঠলো আমার অন্তরে। মনে হলো—আমি যেন সেই প্রথম জানুয়ারির স্পর্শসন্ধ্যায় বসে আছি এখনো। অথচ সেই সন্ধ্যা এখনো কাটেনি—কিন্তু বছরটা কেমন করে যে কেটে গেল, ক্ষুদ্রতম রেখাতেও টের পেলাম না।
আগেও বলেছি—এখনো বলছি—
এই দুই দশকের জীবনে কী হারালাম, আর কী-ইবা পেলাম—সে হিসাব আমি আর করতে বসি না। কারণ হিসাবের খতিয়ানে দাগ টানলে—কেবল হারানোর নীলচে ক্ষতগুলোই জেগে ওঠে; প্রাপ্তির কোনো আলোকরেখা যেন চোখে পড়ে না। পুরো বছরের হিসাবখাতা যেন বিপর্যয়ের আগুনে ভয়ংকরভাবে দগ্ধ।
তবু হিসাব না করতে চাইলেও রাসুলে কারীম (সা.)–এর হাদীস আমাকে বারবার সেই ভাবনার দোরগোড়াতেই টেনে আনে—
مَنْ اسْتَوَى يَوْمَاهُ فَهُوَ مَغْبُونٌ، وَمَنْ كَانَ يَوْمُهُ شَرًّا مِنْ أَمْسِهِ فَهُوَ مَلْعُونٌ
“যার দুটি দিন সমান, সে ক্ষতিগ্রস্ত; আর যার আজকের দিন গতকালের চেয়ে খারাপ, সে অভিশপ্ত বা ধ্বংসপ্রাপ্ত।”
এই হাদিনের কাঁচের গ্লাসে দাঁড়িয়ে যখন নিজের জীবনটা দেখি, তখন স্পষ্ট হয়—যোগ–বিয়োগ, গুণ–ভাগ ছাড়াই আমার দিনগুলো যেন একই সমতায় আটকে থাকা এক ক্ষয়িষ্ণু সময়ের নামান্তর। অবনতির এই দীর্ঘ পরম্পরায় দাঁড়িয়ে মনে হয়—এমন জীবন কিভাবে দেখবে সাফল্যের কোনো নির্মল দিগন্ত?
পঁচিশের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে আমি এখন আর অতীতের গ্লানি নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে চাই না। হারানোর হিসাব টেনে মনে যতোই ক্লান্তি নেমে আসুক—তবু ভেতরে ভেতরে একটি ক্ষীণ বিশ্বাস মাথা তোলে। আল্লাহ চাইলে হয়তো এই থমকে থাকা সময়ের চাকা আবারও ঘুরবে। অন্ধকারের ফাঁক গলে কোনো এক উষ্ণ আলোকরেখা এসে স্পর্শ করবে জমাটবাঁধা অন্তরটাকে।
ধীরে ধীরে পুরোনো বচ্চরের আলো নিভে আসে। সন্ধ্যার মতো ম্লান হয়ে যায় তার সমস্ত কোলাহল, সমস্ত ব্যথা, সমস্ত ক্লান্তি। আমি চুপচাপ বসে থাকি, কারো সাথে নয়—শুধু নিজের সাথে। মনে হয়, একটি বছর নিঃশব্দে এসে আমার সামনে এক বিস্তর আয়না ধরে দাঁড়িয়ে গেছে। নরম স্বরে বলছে—দেখো তো, এই যাত্রাপথে তুমি কী কী হারালে, আর কী কী তোমার সফলতার মঞ্চে যোগ হয়েছে…
তবুও অদ্ভুতভাবে, একটুখানি আলো ফের জেগে ওঠে কোথাও। হয়তো অদৃশ্য আকাশের প্রান্তে। হয়তো হৃদয়ের গোপন কোণে।
ভাবি—সব বছর হারানোর বছর নয়। কিছু বছর কেবল মানুষকে শেখায় কীভাবে আবার শুরু করতে হয়। সুতরাং প্রত্যয় হোক নব আঙ্গিকে, অনুতাপ ও গ্লানির মধ্য দিয়েই সূচনা হোক নতুন বচ্ছরের।
দিনলিপি
একত্রিশ, বারো, পঁচিশ ইং
বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।