স্বপ্নের মসজিদে রশীদ
—রফিক আতা—
দিনলিপি
১৯/০৮/২৫, মঙ্গলবার।
আজকের দিন, আজকের সময়ের কাঁটার ঘূর্ণন—আমার মনে ও অনুভবে চিরস্মরণীয়। শুধু আমি নই! এই স্বর্গীয় জামেয়ার ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রতিটি ধুলিকণার অনুভবেও যেন আজকের দিনটি অযাচিতভাবে বিশেষায়িত। রশিদিয়ার মহলে ও মাহাউলে বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটিই—স্বপ্নের মসজিদে রশীদ।
দীর্ঘদিনের শ্রম ও ঘামের ফসল আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। মসজিদে রশীদের গ্রাউন্ড ফ্লোর ঢালাই। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে, ১৫ ইঞ্চি পুরু, ৩৬ হাজার স্কয়ারফুটের এই ফ্লোর ঢালাই এক দিনে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু মাঝিদের পক্ষে এত বড় কাজ এক দিনে শেষ করা কষ্টকর হওয়ায় তা ভাগ করে দুই দিনে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আজ সেই প্রথম দিন।
গতকাল ইশার পর হেদায়ার সাথীদের খানেকায় হাজির হওয়ার ঘোষণা এলো। তখনই ফেনীর হুজুর দা.বা. আনন্দ সংবাদ দিলেন—
“মসজিদে রশীদের প্রথম দিনের ঢালাইয়ের কাজে হেদায়ার সাথীদের নির্বাচন করা হয়েছে।”
শুনেই যেন চারদিকে হিমেল বাতাস বয়ে গেল। মুহূর্তেই দেওয়ালের রঙে প্রতিধ্বনিত হলো—
“আলহামদুলিল্লাহ!”
এই ফ্লোরটি যেহেতু একরকম ভিত্তির স্থানে, তাই জামেয়ার প্রতিটি প্রাণ চাইছিল কাজে শরিক হতে। অনেকে আগে থেকেই আবদার জানিয়েছিল। এমনকি দূরদূরান্তের মাদরাসা থেকেও এ কাজে অংশগ্রহণের অনুরোধ এসেছিল—যা আমাকে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ করে। ভাবি, রশিদিয়া ও মসজিদে রশীদের প্রতি মানুষের কত শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা থাকলে, সুদূর থেকেও এ কাজে শরিক হওয়ার আকুতি জানায়!
প্রভাতের বাতাসে, ফজরের পর জামেয়ার সবাই কাজের সফলতার জন্য মহান প্রভুর দুয়ারে হাত তুললেন। সাড়ে সাতটার দিকে, হযরত ওয়ালা দা.বা., নায়েব সাহেবসহ প্রবীণ ওস্তাদদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন হলো ঢালাইয়ের। পঞ্চাশেরও বেশি শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সাথীরা সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত হলো। ১২টি মিক্সার মেশিন, ১২টি রেল, ও ২০০-র বেশি শ্রমিকের হাত ধরে শুরু হলো দিনভর কাজ।
দুপুরের কাঠফাটা রোদ আর ভাপসা বাষ্পের মাঝেও চললো নিরন্তর প্রয়াস। মাঝে মাঝে রহমতের শীতল সমীরণ এসে ক্লান্তি দূর করছিল। প্রতিটি প্রাণ যেন অদৃশ্য শক্তিতে উজ্জীবিত, প্রতিটি আত্মা যেন ইবরাহিমি চেতনায় দীপ্ত। মনে হচ্ছিল—এ যেন কাবা নির্মাণেরই এক নবীন দৃশ্যায়ন।
ওলামা-তুলাবা সবাই নিজেদের ঘাম ঢেলে যাচ্ছিলেন মসজিদের পলেস্তরায়। শরীর যখন ভেঙে আসছিল, তখনই পরিবেশিত হচ্ছিল ঠান্ডা পানি। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল—আমরা যেন কোনো স্বপ্নলোকের অংশীদার।
সাড়ে ১১টার দিকে শরহে বেকায়ার সাথীরাও যোগ দিল ভিন্নরকম দৃঢ়তায়। সবাই মিলে এগিয়ে চললো কাজ। গোধূলির ডাকে যখন আকাশ রাঙা, তখন ঢালাইও শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল। আজকের নির্ধারিত অংশ শেষ হলো সূর্যাস্তের বেশ কিছু সময় পরে ।
রাত নামল ক্লান্তি নিয়ে, তবে তা প্রশান্তির ক্লান্তি।এখন রাত ১১টা ৩০ মিনিট। সবাই ঢলে পড়েছে অবসন্ন ঘুমে। বাইরে ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় যেন চোখে ভেসে উঠলো—এক নান্দনিক মসজিদ। আলো-আঁধারের নিস্তব্ধতায় মনে হচ্ছিল—একটি পুষ্প প্রস্ফুটিত হওয়ার অপেক্ষায়।
দিনলিপি
বিশ, আট, পঁচিশ —
বুধবার
আজকেই সেই প্রতীক্ষিত দিন—প্রত্যাশা মুখর এক মহৎ কর্মের সমাপ্তির দিন। ফজরের নামাজ শেষে দোয়া-মোনাজাতের স্নিগ্ধ আবহে সকালটা ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল। কিন্তু আকাশের কুৎসিত আবহে সবার মনে ভর করেছিল এক অদৃশ্য শঙ্কা—যেন বিষাদের কালো মেঘ আচ্ছন্ন করছে অন্তর। অথচ আল্লাহর রহমত আর বড়দের দোয়ার বরকতে, কাজ শুরুর আগেই থেমে যায় বৃষ্টি, আকাশও খুলে যায় এক স্বচ্ছ দর্পণের মতো।
আজকের কাজে অংশ নেয় বেকায়া মেশকাত ও তাকমীলের সাথীবৃন্দ। সকলে একসঙ্গে হৃদয়ের উত্তাপ ও অক্লান্ত পরিশ্রম ঢেলে মসজিদে রশীদের গ্রাউন্ড ফ্লোর ঢালাই সফলভাবে সমাপ্তির দিকে এগিয়ে নিতে থাকে।
মধ্যাহ্নে যে দৃশ্য আমি দেখেছিলাম—তা চিরদিনের জন্য হৃদয়ের ভাঁজে খোদাই হয়ে থাকবে। বিরতির ফাঁকে আমি তাকিয়ে ছিলাম নিঃশব্দ বিস্ময়ে—ধুলো উড়া, রোদ মাখা, কর্মযজ্ঞের উত্তাল তরঙ্গে। ওস্তাদদের ঘামভেজা মুখে সৌহার্দ্যের দীপ্তি, সাথীদের ধুলোমাখা চেহারায় অদম্য উৎসাহ—এসব দৃশ্য যেন আত্মার গভীরে স্থায়ী অমর স্মৃতি।
তখনই মনে পড়ে গেল মসজিদে রশীদকে ঘিরে মুফতি মুস্তাকুন নবী কাসেমী হাফিজাহুল্লাহ এর সেই হৃদয়শিহরিত ভবিষ্যৎবানী। এক নিশুতি রাতের জৌলুশপূর্ণ মাহফিলে তিনি বলেছিলেন—
“আলহামদুলিল্লাহ! জামিয়া রশীদিয়াতে যে মসজিদ হতে যাচ্ছে, তা হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। ৩৩৫ ফিট লম্বা, ৩৬ হাজার স্কয়ার ফিটের বিশাল ছাদ। শুধু এই মসজিদ দেখতেই মানুষ আসবে সারা পৃথিবী থেকে—ইউরোপ, আমেরিকা, আরব-মধ্যপ্রাচ্য সর্বত্র থেকে।”
ভাবি কখনো কখনো—পৃথিবীতে কত মসজিদই তো নির্মিত হয়, কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এমন কতগুলো মসজিদ আছে, যেগুলোর ভিত্তি গাঁথা হয়েছে নির্মেদ প্রণয়, নিখুঁত শ্রদ্ধা, অবিরাম রোনাজারী আর এক চিলতে স্বপ্নের আলিঙ্গনে?
ধুলো-ঘাম-স্বপ্নের সংমিশ্রণে ঢালাই চলতে থাকে একটানা। বড় শুকরিয়ার বিষয়—সারাদিনের আবহাওয়া ছিল পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। উত্তপ্ত রোদের মাঝেও ছিল হিমেল অনুভব। রাত দশটার ঘড়ি স্পর্শ করার মুহূর্তে ঢালাই পৌঁছায় তার শেষ সীমান্তে। শেষ দিকে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি—কিন্তু তাতেও থেমে থাকেনি কাজ। শত শত অপরিচিত শ্রমিক, ওস্তাদ-সাগরিদ মিলিত উদ্যমে বৃষ্টির ভেতরেই রচনা করেছেন এক অলেখা ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাস রচনার সাক্ষী ছিলেন জামিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা, রশিদী উদ্যান ও মালঞ্চের পুরোধা হযরত ওয়ালা মুফতি শহিদুল্লাহ সাহেব দামাত বারাকাতুহু। এশার নামাজ শেষে তিনি মাদরাসার দ্বিতীয় তলায় অবস্থান নেন। অবলোকন করেন প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি ইট-বালু-লোহার গাঁথুনি, যেন চোখের সামনে গড়ে উঠছে তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন। নিরব দর্শক নন—তিনি ছিলেন নির্মাণকর্মের অনন্ত প্রেরণা, শ্রমিক-ওস্তাদ-শিক্ষার্থী সবার হৃদয়ের সাহস। সেই রাতের বৃষ্টিঝরা ঢালাইয়ে যেন তাঁর দৃষ্টির আশীর্বাদ মিলেমিশে ছিল প্রতিটি কণিকায়।
ঢালাই শেষ। অথচ মনে হয় এখনো আত্মায় লেগে আছে মসজিদ নির্মাণের পলেস্তারা। মননে প্রশান্তির আবির, স্বপ্নে মিশে আছে পূর্ণতার অবিচ্ছেদ্য মায়া। এ যেন সহস্র হৃদয়ের লালিত স্বপ্নের সূচনা মাত্র।
দিনলিপির দুই দিনের এই দীর্ঘ লিপির শেষে হৃদয়কুঞ্জে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আল্লাহর কালামের চিরন্তন সান্ত্বনা—
“و ما تفعلوا من خير يعلمه الله”
—আর তোমরা যা কিছুই উত্তম করো, আল্লাহ তা অবশ্যই জানেন।
(সূরা আল-বাকারা: ১৯৭)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।