#পবিত্র_কোরআনের_বিতর্কিত_শব্দ_দাহাহা_এর_অর্থ_সমতল_নাকি_ডিম্বাকার???
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
জাকির নায়েক স্যার যিনি মুসলিম জাহানের বর্তমানে শ্রেষ্ঠ নেয়ামত ( আমার মতে) তিনি বলেছেন " দাহাহা " শব্দের অর্থ ডিম্বাকৃতির ন্যায়" বিশেষ করে উট পাখির ডিমের মতো "। তো তিনি যখন এই কথাটা বলেছেন তার পর থেকে নাস্তিকরা কিছু ভ্রান্ত অভিযোগ করেছেন। তাই আমরা যুক্তি সহকারে শব্দ বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ।
তো চলুন শুরু করা যাক।
আরবিতে দাহাহা শব্দের মূলত দুটো অর্থ হয়
১. বিস্তৃত ( সমতল)
২. ( উট পাখির) ডিম্বাকৃতি
প্রথমে আয়াতটা লক্ষ্য করুন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন
" وَ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ ذٰلِکَ دَحٰىہَا ﴿ؕ۳۰﴾
ওয়াল আর দা বা‘দা যা-লিকা দাহা-হা-।
এবং পৃথিবীকে এরপর বিস্তৃত করেছেন।
And after that He spread the earth; "( আন - নাযিয়াত -৩০)
উক্ত আয়াতে দাহাহা শব্দ আনা হয়েছে আর এর অর্থ করা হয়েছে বিস্তৃত
[ আমাদেরকে একটা জিনিস বুঝতে হবে সেটা হলো " একটা শব্দের অনেক অর্থ থাকে। যকন একটা শব্দের অনেক অর্থ থাকবে তখন শব্দটা বাক্যের মধ্যে কিভাবে অবস্থান করবে তার উপর ভিত্তি করে উক্ত শব্দের অর্থ প্রদান করা হয়। বাংলা ভাষা ইংরেজি ভাষা আরবি ভাষাসহ প্রায় সকল জীবিত ভাষার ক্ষেত্রে এই কথা প্রযোজ্য। উদাহরণস্বরূপ ( বাংলা) '১' উত্তর - পূর্ব দিক থেকে আগুন ধেয়ে আসছে " '২' আমি পরীক্ষাতে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি নি " ১ ম বাক্যে " উত্তর " শব্দটা এসেছে দিক নির্দেশ করতে আর ২ য় বাক্যে এসেছে সমাধান নির্দেশ করতে। এখানে একই শব্দ দুটো বাক্যতে নিজের অর্থ পরিবর্তন করে ফেলেছে। আবার ( ইংরেজি) '1' our live is Short Between in this world " '2' we live in Dhaka " ১ ম বাক্যে live শব্দটা এসেছে জীবন অর্থে আর দ্বিতীয় বাক্যে এসেছে বসবাস অর্থে। তো এরকম করে বিবিন্ন ভাষাতে শব্দের প্রয়োক বাক্যতে কিভাবে হবে তার উপর নির্ভর করে অর্থ প্রদান করতে হয়। ]
এইখানে অনুবাদটা সঠিক হবে না। আরবিতে "আল- আরদ " শব্দের সাধারণ তো দুটো অর্থ হয়
১. সমগ্র পৃথিবী
২. ভূ- পৃষ্ঠ ( বা জমিন /মাটি-তল)
এখন আমি যখন আরদ শব্দের অর্থ " ভূ- পৃষ্ঠ" করব তখন হাহাহা শব্দের অর্থ হবে বিস্তৃত । যখন আমরা ভূ- পৃষ্ঠ এর সাথে বিস্তৃত শব্দ বয়বহার করব তখন অনুবাদ এতে ভুল হবে না। তাফসীরে আহসানুল বয়ান এতে বলা হয়েছে যে " সমতল ও বিস্তৃত করার মানে হলো ' পৃথিবীকে সৃষ্টির বাসোপযোগী করার জন্য যেসব জিনিসের প্রয়োজন আল্লাহ তার প্রতি গুরুত্ব দিলেন। যেমন জমিন থেকে পানি নির্গত করলেন। খাদ্য সামগ্রী উৎপন্ন করলেন ইত্যাদি "। তো এই ক্ষেত্রে পৃথিবী বিস্তৃত হবে না বরং জমিন বিস্তৃত হবে ; আর জমিন আমাদের সাপেক্ষে বসবসারের জন্য সমতল করা হয়েছে। [ প্রশ্ন হতে পারে যে " পুরো জমিন তো সমতল না তাহলে এখানে পুরো জমিন সমতল হবে কেন?" তো আমি উত্তরে বলব যে " সমতল এর জায়গা সবচেয়ে বেশি আর অসমতল নগন্য । অধিক জিনিস নির্দেশ করতে গেলে আলাদা করে কিছু জিনিসকে নির্দেশ করার প্রয়োজন পরে না। উদাহরণস্বরূপঃ এক ক্লাসে ১০০ জনের মধ্যে ৯৮ জন ছাত্র আর দু- জন ছাত্রী । শিক্ষক ক্লাস এতে এসে যদি বলে ছাত্ররা দাঁড়াও তখন ছাত্রদের সাথে ছাত্রীরাও দাঁড়াবে। এখানে ছাত্রীদের আলাদা করে মেনশন করার দরকার পরে না ব্যাকরণে। টিক ওইরকম ভাবে কিছু অসমতল জায়গাকেও মেনশন করার দরকার হয় নি। মূল অংশে ওগুলোকেও ধরা হয়েছে। ] তো এই দিক বিবেচনাতে বিস্তৃত অর্থ করলে সেটা সঠিক। [ দাহাহা শব্দের অর্থ বিস্তৃত করেছে অনেক অনুবাদক ; Saheeh international, আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলি, জহরুল হক, মুজিবর রহমানসহ আরও অনেকে ] কিন্তু যখন আমি আল- আরদ" অর্থ পৃথিবী করব তখন বিস্তৃত অর্থ আসবে না। তখন অর্থ হবে ডিম্বাকৃতি । অনুবাদ হবে এমন " আর আমি পৃথিবীকে ডিম্বাকৃতি করেছি " [ ডিম্বাকৃতি অনুবাদ গ্রহণ করেছে অনেকেঃ রাশেদ খলিফা, কামাল ওমর, এস. কে.সাকির, ভিকার আহমেদ ] এখানে ডিম্বাকৃতি বলতে উট পাখির ডিম। উট পাখির ডিম দেখতে..... ।
[ একটা কথা বলে রাখি দাহাহা শব্দের দুটো সাধিত শব্দ আছে
১. আল- উদহিয়্যু অর্থ : উটপাখির ডিম
২. আল- উদহুয়্যাতু অর্থ : উট পাখির ডিমের স্থান
মনে রাখতে হবে যে
" ছড়ানো” শব্দটি কোরআনে আরো অনেক স্থানে ব্যাবহার করা হয়েছে। যেমনঃ সুরা জুমার ১০ নং আয়াতে “ফান্তাসিরু” শব্দটি দিয়ে “ছড়ানো” বুঝানো হয়েছে।
এই আয়াতে “ছড়ানো” শব্দটি আরবি “দাহাহা” শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়নি। বরং এখানে “ফান্তাসিরু” শব্দ দিয়ে বুঝানো হয়েছে।
আমি বিভিন্ন স্কলারদের ব্যাখ্যা শুনেছি সেখানে তারা বলেছে, অতঃপর তিনি জমিনকে বিস্তীর্ণ করেছেন।
এখানে অতঃপর শব্দটি আছে ,তার মানে পৃথিবী কোনো আকৃতিতে ছিলোনা, কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিলনা। (২৭-৩২ নং আয়াত পড়লেই বুঝা যাবে ) ফলে আল্লাহ পৃথিবীকে নতুন আকৃতিতে রূপান্তরিত করেছেন।অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছে ।**
উট পাখি তার ডিমের জন্য মাটিকে প্রস্তুত করে, উর্বর করে ,এই অবস্থা কে “দাহাহা” বলে। তেমনি আল্লাহ ডিম আকৃতির জন্য পৃথিবীকে প্রস্তুত করছে এই অবস্থা কে “দাহাহা” বলেছে ( প্লেজারিজম) । তো যুক্তি অনুসারে আন নাযিয়াত শব্দের দুটো সাধিত শব্দও আন নাযিয়াত -৩০ এতে প্রযোজ্য হবে। আর এতে বিজ্ঞানের সাথে কোনো সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি করবে না ]
এখন আসি মূল বিষয়ে।
প্রথম পয়েন্ট
_______________
বার বার বলে যাচ্ছি যে দাহাহা শব্দের অর্থ" ডিম্বাকৃতি " এখন প্রশ্ন হলো " দাহাহা অর্থ ডিম্বাকৃতি " এটা ডিকশনারি কোথায় বলা আছে???
তো আমি আরবি টু ইংলিশ ডিকশনারি থেকে রেফারেন্স গুলো দিয়ে দিচ্ছি কেমন
রেফারেন্সঃ [1]. Lisan Al-Arab dictionary Book 2, Pages 215-218. [2] Lisan Al-Arab dictionary , Book 8, Pages 236-238.[ 3]. Al-Muheet dictionary , Page 1179. [4]. Al-Muajam Al-Waseet dictionary , Pages 272-274. [5l. Al-Mawrid dictionary Arabic-English section , Page 537. [6] Arabic-English dictionary the Hans Wehr dictionary Page 273 ( সংগৃহীত )
এখন আসি দ্বিতীয় মূল বিষয়ে।
দ্বিতীয় পয়েন্ট
______________
এখন একটা প্রশ্ন দিয়ে লেখাটা শেষ করব। প্রশ্নটা হলো " ডিকশনারিতে থাকা সত্যেও অনেক অনুবাদক.... আর প্রাচীন তাফসীরে কি দাহাহা শব্দ ডিম্বাআকৃতি এটা নেই কেন???
প্রথম কথা দাহাহা শব্দের অনুবাদে বিস্তৃত অর্থটাও সঠিক সেটা আমরা উপরের প্রথম দিকে দেখেছি। সমস্যা হলো প্রয়োগটা ভালো করে করতে না পারাটা। এটা একান্তই অনুবাদে ভুল Not কোরআন। এখন অনুবাদের ভুলকে তো আমরা কোরআনের ভুল বলে চাপিয়ে দিতে পারি না তাই না!। অনুবাদে দাহাহা এর সঠিক অর্থটাই আনে শুধু ভেজালটা বাজে "আল- আরদ " শব্দটাতে। এখন এই টুকুর জন্য আমরা কোরআনকে বৈজ্ঞানিক ভুল কখনোই বলতে পারি না। আশা কথা ক্লিয়ার ।
দ্বিতীয় কথা
কোরআনের তাফসীর এর অভাব নেই। সবগুলো তাফসীর এক জীবনে পড়ে ফেলা সম্ভব না। এখন কোনো তাফসীরে থাকলে থাকতেও পারে ( আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম, রুহল মায়ানি আর তাফসীরে কবীর এতে দাহাহা অর্থ ডিম্বাকৃতি আছে। কথা সত্য না মিথ্যা আল্লাহ ভালো জানেন) আবার নাও থাকতে পারে। আর তাফসীরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছিও না। প্রাচীন কালের অনেক তাফসীর কারক'রা অনেক কিছুতেই ভুল করত। আর তারা বিজ্ঞান সম্পর্কে তেমন জানত না, তাই দাহাহা শব্দ টাকে হয় তো দাহাবুন শব্দের সাথে মিল রেখে অনুবাদ করেছে তাদের কাছে থাকা বিজ্ঞান এর জ্ঞান দিয়ে। এটা একান্তই তাদের ব্যাপার কারন কারো ব্যাক্তিগত ভুল আমরা ইসলামের নামে চাপিয়ে দিতে পারি না । তবে হ্যা। প্রাচীন অনেক ইসলামিক স্কলার কিন্তু গোল পৃথিবীতে বিশ্বাস রাখতেন
" বিখ্যাত ভূগোলবিদ পৃথিবীর মানচিত্র অংকন করতে গিয়ে তাঁর নিজ মানচিত্রে পৃথিবীকে গোল দেখিয়েছেন Not সমতল। এই মহান ইসলামিক ব্যাক্তির নাম হলো ' আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ আল ইদ্রিসি '। এছাড়াও তার মতো অনেকেই গোলাকার মানচিত্র অংকন করেছিলেন। এছাড়াও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম ইবনে জাওযী, ইবনে তাইমিয়া ( শামেলা) সহ অনেকেই গোলাকার পৃথিবীতে বিশ্বাস করতেন। তো এক কথায় বলতে গেলে আপনি দু- ধরনের লোকই পাবেন, যারা গোলাকার আবার সমতল দুটোতেই বিশ্বাস রাখত। তাই চূড়ান্ত রায় পাবেন না তাফসির কারক আর ইমামদের কাছ থেকে।
তো আমরা দেখতে পেলাম যে দাহাহা শব্দের দুটো অর্থই দু- দিক থেকে ঠিক এবং দাহাহা এর অর্থ অভিধানে ডিম্বাকৃতি আছে + দু- ধরনের মতই আছে স্কলারদের কাছ থেকে। অতএব নাস্তিকরা যে বলে জাকির নায়েক নিজের মতো করে দাহাহা শব্দের অর্থ প্রদান করেছে তা সম্পূর্ণ ভূয়া। আশা করি বিষয়টা ক্লিয়ার।
তো লেখাটা এই পযন্তই।
সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
কলমে: মোঃ মেহেদী হাসান ✍️✍️✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।