নির্গূড় নিশুতি রাতের একা পথ
—রফিক আতা—
"দিনরাত্রি রক্তের ক্ষরণ /
এইখানে রাখো দেখি সিগ্ধ শাদা গভীর চরণ’—"
সারাটাদিন ধান কাটায় ব্যস্ত ছিলাম। এখন অগ্রহায়ণের রাত। সমগ্র গায়ে এক অচেনা আলসেমি বাসা বাঁধছে। বাপজান এখনো পুরোপুরি সেরে উঠেননি, তাই কাজের সব দায়িত্ব আমাদের কাঁধে। সুতা ওয়ালাদের বাড়ি পেরিয়ে আরও এক দুটি বাড়ি পার হলে পশ্চিম দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে, আমি সেই রাস্তায় একা হাঁটছি। কনকনে শীত আর কুয়াশাফুলের উষ্ণ আড়ম্বর আমার গায়ে মিশছে, যেন প্রকৃতিই আমার একাকিত্বের সঙ্গে মিল খুঁজে নিচ্ছে।
নির্গূড় রাতের একা পথ। যন্ত্রণার ভিতরে কাতরাচ্ছি, শূন্যতা ও বিষন্নতায় ভরপুর আমার জীবন। ইলমি শূন্যতা! আমলি শূন্যতা! বহুদিন ধরেই অযাচিত কারণে প্রানের প্রতিষ্ঠান থেকে আশি হাজার একশো গজ দূরে—নিশ্চল নিঃসঙ্গতার এই মুহূর্তে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো আবদুল মান্নান সৈয়দের সেই লাইন—
"দিনরাত্রি রক্তের ক্ষরণ /
এইখানে রাখো দেখি সিগ্ধ শাদা গভীর চরণ’—"
আরে বাহ!
কি অপার্থিব, কত সুন্দর! ঠিক যেন আমার অস্থির অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতম স্পন্দনকেও চিহ্নিত করেছে। কবি যেন বলছেন—আকাশের দিকে তাকাও, এই লাইনটি হৃদয়ে ঢোকাও। দেখবে, তোমার সমস্ত যন্ত্রণা বশিভূত হবে, অভ্যন্তরীণ ব্যথার রক্তপাত কিছুটা স্থির হবে, কবিরাজের নীরব মন্ত্র জলে অকিঞ্চিকর হলেও আবদ্ধ হবে।
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। দিগন্তহীন এক বিশাল নীলিমা। শুভ্র তুষারের মাঝে পাহাড়ের মতো উঁচু-নিচু মেঘের ভেলা। তারই মধ্যে পূর্ণিমা পারাপার করা ক্লান্ত একটি কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ—সিমফুলের মতো শীতল, শুভ্র আলো ছড়িয়ে অগ্রহায়ণের বুকে।
আমি চিৎকার করে পড়তে চাইলাম অস্থির অশ্বক্ষুরে আবদুল মান্নান সৈয়দ এর লেখা সেই চরণ। কিন্তু ধানক্ষেতের শীতল বাতাসে আমার গলা বাঁধা হয়ে রইল। কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো, পৃথিবী থেমে গেছে। আমি নির্বাক চিত্তে দাঁড়িয়ে আসমানে তাকালাম, আর ধীরে ধীরে বিড়বিড় করে উচ্ছরণ করলাম—
"দিনরাত্রি রক্তের ক্ষরণ /
এইখানে রাখো দেখি সিগ্ধ শাদা গভীর চরণ’—"
আকাশ যেন আমার অহর্নিশির রক্তক্ষরণ বুঝলো। আমার ব্যথা তারও অন্তরে পৌঁছে গেল। সে নীরবভাবে চাঁদকে বলল—‘একটা বুদ্ধু, ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তোমার স্নিগ্ধ অতল রশ্মি সানাই বাজাও এই বালকের গায়ে। তোমার শুভ্র চরণ রাখো পৃথিবীর বুকে।’
মুহূর্তের মধ্যে হেমন্তের হাওয়া জোসনায় স্নিগ্ধ হলো। সমগ্র সত্তা থেকে বিষাদ, বিষন্নতা ও একাকিত্বের দাগ ধুয়ে গেলো জোসনার জলে। যেন রাতের নিঃসঙ্গ কোলে, অপ্রত্যাশিত কোনো মহার্ঘ ধন খুঁজে পেয়েছি। কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ আমার বুকের ভেতর স্ফীত আনন্দের কিছু সঞ্চার করলো—এক অদৃশ্য আলোর দোল, যা অন্ধকারের সমস্ত কোণে শীতলতা ছড়িয়ে দিলো।
রাতের স্থিরতা আর চাঁদের শুভ্রতা একত্রিত হয়ে আমার অন্তরকে পূর্ণ করলো; একটি অম্লান শান্তি, যা মনে করালো, এই পৃথিবীতে, এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তেও, সৌন্দর্য এবং আলোর উপস্থিতি অনিবার্য। আমার একাকিত্ব আজ শুধু হার মানলো না, বরং এটি যেন পুনর্জীবনের এক নীরব নোট বাজালো—যে নোটে রয়েছে ধৈর্য, প্রার্থনা, এবং অস্তিত্বের ক্ষুদ্র কিন্তু অমোঘ আনন্দের প্রতিফলন।
দিনলিপি
আট, বারো, পঁচিশ ইং
সোমবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।