নিশুতি রাতের আত্মদহন
—রফিক আতা—
রাত্তির নামলেই আমার মনে হয়—এই রাত বুঝি আর কোনোদিন শেষ হবে না! রিলস, মুভি, আইটেম গার্লের সং—বিনোদনের নামে সেই বিষাক্ত আবর্তে হারিয়ে যায় পুরো নিশুতি রাত। চোখের আঙিনায় ঘুমের দেখা মেলে না, অথচ জীবনের প্রতি কোনো অভিযোগও নেই তখন। যেন এভাবেই চলতে পারে সবকিছু!
ফজরের ঠিক পূর্বক্ষণে, যখন পৃথিবী আধো-আলোয় নিঃশ্বাস নেয়—তখনই হুশ ফিরে পাই। ভাবতে থাকি, আরেকটি রাত অবহেলায় অপচয় করলাম! আরেকটি রাত গোনাহের সাগরে ডুবে রইলাম! পরওয়ারদিগারের সামনে দাঁড়িয়ে আমি কী জবাব দেবো?
এই ভাবনা যখন বুকের ভেতর দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে, তখন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। বিছানা ছেড়ে উঠি। উঠোন পেরিয়ে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা জলে অযুর পানিতে আত্মা ধুই। তারপর সিজদায় পড়ে মনিবের কুদরতি পায়ের তলায় অশ্রু বিসর্জন দেই। তাওবার দরজায় কড়া নাড়ি—হে আল্লাহ! আর করবো না; তুমি শুধু মাফ করে দাও। মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে, ভোর এসে যায় শান্ত নিস্তব্ধতায়।
কিন্তু আশ্চর্য! পরের দিন আবারো আগের জায়গায় ফিরে যাই। আবারো গোনাহের কাঁদাহ্রদে ডুবে যাই, ভেসে যাই স্মার্টফোনের দূষিত হাওয়ায়! ভুলে যাই আমি তো তাওবা করেছিলাম! ভুলে যাই আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম! ভুলে যাই—একদিন সকলের মতো আমাকেও দাঁড়াতে হবে প্রভূর কাঠগড়ায়!
পরবর্তী রাত—
রাত আবারো নেমে আসে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে। অন্ধকারের পোশাক পরে পৃথিবী যখন চুপচাপ হয়ে যায়, আমার ভেতরের যুদ্ধ তখনই শুরু হয়। নফসের দৌরাত্ম্য আমাকে আবারো স্মার্টফোনের নেশায় ঠেলে দিতে চায়। স্ক্রিনের আলো যেন শয়তানের হাতছানি—একটু দেখলেই হলো, বাকি সব সে নিজেই সামলে নেবে!
আমি নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলি—
“না! আজ না। আজ অন্তত আমি হার মানবো না।”
নিজের হাতকে শাসন করি, চোখকে সতর্ক করি। তবুও আঙুলগুলো কাঁপতে থাকে—উঠিয়ে নেবে কি ফোনটা?
আমি তখন নিজেকে প্রশ্ন করি—
গতরাতে যে অশ্রু ফেলেছিলাম, তার কি কোনো মূল্য নেই?
তাওবার দরজায় যে মিনতি করেছিলাম, সে কি আজই ভুলে গেলাম?
কাঠগড়ার স্মৃতি, কবরের অন্ধকার, সিজদার সান্ত্বনা—সব কি মুছে গেলো?
এই প্রশ্নগুলো যখন মাথার ভেতর বজ্রের মতো কাঁপতে থাকে, তখন হৃদয়ও জেগে ওঠে। ফোনটা সামনেই পড়ে থাকে—আমি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেই। কুরআনের কভার ছুঁয়ে দেখি—কেমন এক শান্ত স্রোত বুকের ভেতর বয়ে যায়। মনে হয়, “এটাই তো আসল আলো।”
আমি ধীরে ধীরে সূরা মুলক তিলাওয়াত করি। প্রতিটি আয়াত যেন রাতের আঁধারে রশ্মি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে আমার অস্তিত্বে। সিজদায় পড়ে মনে মনে বলি—
رب انّي مغلوب فانتصر
“হে রব! আমি দুর্বল। তুমি শক্তি দাও।”
রাত এগিয়ে চলে। আমার ভেতরের যুদ্ধও থেমে থাকে না। কিন্তু আজ একটুখানি বিজয় আমার হয়—গোনাহের পাশে দাঁড়ানোর বদলে আমি বেছে নিই ক্ষমার দরজায় কান্না।
আর সেই মুহূর্তে বুঝি—
প্রভুর রহমত ঠিক রাতের মতোই—প্রতিবার ফিরে আসে, নতুন করে ঢেকে দেয় সব অন্ধকার।
রাতলিপি,
ছাব্বিশ, এগারো, পঁচিশ
বুধবার,
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।