আল- কোরআনে বৈপরীত্য আছে বলে দাবি করা মিথ্যাচারের জবাব
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
আজকে আমি একজন নাস্তিকের কতগুলো ( কথিত) কোরআনে বৈপরীত্য আছে বলা দাবি করার খন্ডন করব ইনশাআল্লাহ । নাস্তিকরা যেসব আয়াতে বৈপরীত্য দেখায় আমি সেসব মিথ্যাচারের জবাব দিব। আজকে এই সিরিজের প্রথম পর্ব।
তো চলুন শুরু করা যাক।
দাবিঃ ১-"সৃষ্টি কত দিনে হয়েছিল!!"
আল্লাহ "৬ দিনে" সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। ― সূরা আল আ’রাফ:৫৪ (সূরা ৭:৫৪)
বৈপরীত্যঃ
আল্লাহ "৮ দিনে" সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। ― সূরা হা-মীম সেজদাহ:৯-১২ (সূরা ৪১:৯-১২)
জবাবঃ সঠিক তথ্য ছয় দিন হবে না বরং ছয় আইয়াম ( দীর্ঘ যুগ) হবে। আর হা- মীম সেজদাতে ৯-১২ তে যে আয়াতগুলো আছে ওগুলো ওভারল্যাপ করবে।
উদাহরণ স্বরুপ একটা বাড়ি ১০ দিন লাগল তৈরি করতে আর দু- দিন লাগল রং করতে, এখন প্রশ্ন হলো বাড়ি তৈরি করতে কতদিন লাগছে??? উত্তর ১০ দিন। যদি কেও বলে ১২ দিন তাহলে সে মূর্খ কারণ " ১০ দিন এর ভিতরেরই দু- দিন আছে; ঠিক ওইরকম ভাবে ৬ দিনে সব কিছু সৃষ্টি আর পৃথিবী দুই দিনে সৃষ্টি । এই দু- দিন উক্ত ছয়দিনের ভিতরেই আছে ।
দাবিঃ২- প্রথমে কি সৃষ্টি হয়েছিল!!"
আল্লাহ প্রথমে "আকাশমন্ডল" সৃষ্টি করেছিলেন তারপর "পৃথিবী" সৃষ্টি করেছিলেন। ― সূরা আন-নযিআ’ত:২৭-৩০ (সূরা ৭৯:২৭-৩০)
বৈপরীত্যঃ
আল্লাহ প্রথমে "পৃথিবী" সৃষ্টি করেছিলেন তারপর "আকাশমন্ডল" সৃষ্টি করেছিলেন। ― সূরা আল বাক্বারাহ:২৯ (সূরা ২:২৯)
জবাবঃ সূরা নাযিআত ২৭-২৯ আয়াতে এমন কথা কথা নেই যে " আকাশ আগে সৃষ্টি নাকি পৃথিবী আগে সৃষ্টি । এমনকি সূরা বাকারাতেও ( ২৯ নং আয়াতে) এরকম কোনো কথা নেই। উক্ত দু- সূরার আয়াতে " কোন জিনিস আগে সৃষ্টি আর কোন জিনিস পরে সৃষ্টি " এই বিষয়ে কোনো আলোকপাতই করা হয় নি।
[ নাস্তিক নিজের মতো করে আবোল- তাবোল বলে দিসে - বিশ্বাস না হলে চেক করতে পারেন রেফারেন্স এতে দেখবেন এরকম কোনো কথায় নেই ]
দাবিঃ কে প্রথম মুসলিম ছিলেন!!"
“নবী মোহাম্মদ" ছিলেন প্রথম মুসলিম। ― সূরা আল আন-আম:১৪ (সূরা ৬:১৪)
বৈপরিত্যঃ
“নবী মূসা" ছিলেন প্রথম মুসলিম। ― সূরা আল আ’রাফ:১৪৩ (সূরা ৭:১৪৩)
জবাবঃ৩- সূরা আনআম এর ১৪ নং আয়াতে রাসূলকে একবারও বলা হয় নি তিনি সৃষ্টি জগৎ এতে প্রথম মুসলিম। বরং উক্ত আয়াতে তিনি নিজ জাতির ( মানে তার উম্মতের মধ্যে প্রথম মুসলিম) মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ( তাফসীরে আবু বকর যাকারিয়া ) আর ৭:১৪৩ এতেও বলা হয় নি মূসা দুনিয়ার প্রথম মুসলিম বরং উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে " আমি প্রথম ইমান আনলাম " তিনি নিজ জাতির মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী।
উদাহরণ : ভারতীয় বাঙ্গালীদের মধ্যে প্রথম নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ আর বাংলাদেশের বাঙ্গালিদের মধ্যে প্রথম নোবেল বিজয়ী ড. ইউনুস। এখন কেও যদি দেশ শব্দটা বাদ দিয়ে বাঙ্গালী জাতি শব্দটা হাইলাইট করে বলে " এদের মধ্যে দু- জনে আগে নোবেল পেয়েছে বলে দাবি করছে যা একটা বৈপরীত্যে " তাহলে ওই ব্যাক্তি মূর্খ। দু- জনে নোবেল পেয়েছে নিজ দেশের মধ্যে প্রথমে। ওই রকম ভাবে মূসা আর রাসূল সাঃ নিজ নিজ জাতির মধ্যে প্রথম ইমাম আনয়নকারী, তাই এতে বৈপরীত্যেের কিছু নেই।
দাবিঃ৪- আল্লাহ কি শিরক ক্ষমা করেন!!"
আল্লাহ শিরক ক্ষমা "করেন না।” – সূরা আন নিসা:৪৮ (সূরা ৪:৪৮)
বৈপরিত্যঃ
আল্লাহ শিরক ক্ষমা "করেন।”– সূরা আন নিসা:১৫৩ (সূরা ৪:১৫৩)
জবাবঃ সূরা নিসার ৪৮ নং আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাফসীরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে যে " যে ব্যাক্তি শিরক করে মৃত্যুবরণ করবে তার ক্ষমা নেই। অর্থাৎ শিরক করে মৃত্যু বরণ করে তার মাফ নেই আর অন্যান্য পাপ করে মারা গেলে এক সময় মাফ করা হবে। তাই এতে বৈপরীত্যের কিছু নেই।
দাবিঃ৫- আরব দেশের প্রথম নবী কে ছিলেন!!"
“ইব্রাহীম" এবং "ইসমাঈল" ছিলেন আরবের প্রথম নবী [তাঁরা আরবে যান এবং কাবাঘর স্থাপন করেন।] ― সূরা আল বাক্বারাহ:১২৫-১২৯ (সূরা ২:১২৫-১২৯)
বৈপরিত্যঃ
“মোহাম্মদ" ছিলেন আরব দেশের প্রথম নবী। ― সূরা আল কাসাস:৪৬ (সূরা ২৮:৪৬)
জবাবঃ প্রথম কথা সূরা বাকারা ১২৫-১২৯ নং আয়াতে ইব্রাহিম ও ইউসুফ নবীর কাবা তৈরির বর্ণনা করা হয়েছে। তারা মক্কার প্রথম নবী এরকম দাবি করা হয় নি। আর যদি তারা মক্কার প্রথম নবী হয় তাতেও সমস্যা নেই কারণ সূরা কাসাস এর ৪৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে " রাসূল সাঃ যে সম্প্রদায় এর কাছে এসেছিল সেখানে তার আগে কোনো সতর্ককারী আসে নি। মূর্খ নাস্তিক দেশ আর সম্প্রদায় এক করে ফেলেছে। ইব্রাহিম আর ইউসুফ হলো আরবের প্রথম নবী, আর রাসূল সাঃ হলো সম্প্রদায় এর মধ্যে প্রথম সতর্ককারী। এখানে বৈপরীত্যের তো কিছু দেখছি না। কাসাস এর৪৬ নং আয়াতে একবারও দাবি করা হয় নি রাসূল সাঃ মক্কা বা আরবের প্রথম নবী।
দাবিঃ৬- কোন ধর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য!!"
“ইহুদি এবং খ্রীষ্টানদের" ভয়ের কিছু নেই, তারা আল্লাহর কাছে "পুরস্কার পাবে।” ― সূরা আল বাক্বারাহ:৬২ (সূরা ২:৬২)
বৈপরিত্যঃ
“ইসলাম" ধর্ম ছাড়া আল্লাহ কোন ধর্ম "গ্রহন করেন না।” ― সূরা আল ইমরান:৮৫ (সূরা ৩:৮৫)
জবাবঃ মূর্খ নাস্তিক দুই যুগের ঘটনা এক করে ফেলেছে। আর আয়াতের ( বাকারা-৬২) এর পুরো মানেই চেন্স করে ফেলেছে। বাকারা-৬২ নং আয়াতে ইহুদি সহ অন্যান্যদের ইমান আনলে ( অর্থাৎ ইসলাম কবুল করলে) কবুল করলে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলা হইছে। আর ইমরান -৮৫ তেও একই কথা বলা হইছে। আল্লাহর প্রতি ইমাম আনার নামই ইসলাম ( তাওহিদবাদীদ) । এতে বৈপরীত্যের কি হলো বুঝলাম না।
দাবিঃ৭- মানুষ কি দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে!!"
মানুষ "কোনোকিছু" থেকে সৃষ্টি হয় নি। ― সূরা মারইয়াম:৬৭ (সূরা ১৯:৬৭)
বৈপরীত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "জমাট রক্তপিন্ড দিয়ে।” ― সূরা আলাক:২ (সূরা ৯৬:২)
বৈপরিত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "পানি দিয়ে।” ― সূরা আম্বিয়া:৩০ (সূরা ২১:৩০)
বৈপরীত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "বীর্য দিয়ে।” ― সূরা নাহল:৪ (সূরা ১৬:৮)
বৈপরীত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "কাদা ও মাটি দিয়ে।” ― সূরা হিজর:২৬ (সূরা ১৫:২৬)
বৈপরিত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "ধূলা দিয়ে।” – সূরা আল ইমরান:৫৯ (সূরা ৩:৫৯)
বৈপরীত্যঃ
মানুষ সৃষ্টি হয়েছে "জমি" দিয়ে। ― সূরা হুদ:৬১ (সূরা ১১:,)
জবাবঃ প্রথমত মারিয়াম এর ৬৭ নং আয়াতে আল্লাহ বুঝাইছে এক আর মূর্খ নাস্তিক বুঝছে আরেকটা। আয়াতটা দেখুন
" اَوَ لَا یَذۡکُرُ الۡاِنۡسَانُ اَنَّا خَلَقۡنٰہُ مِنۡ قَبۡلُ وَ لَمۡ یَکُ شَیۡئًا ﴿۶۷﴾
মানুষ কি স্মরণ করেনা যে, আমি তাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিলনা?
" এখানে মানুষকে উদ্দেশ্য করে এটা বলা হয়েছে যে " তোমরা কি স্মরণ কর না ( অর্থাৎ আগে আমাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না এখন আছে) আমি তাকে আগে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না ( মানে " اَوَ لَا یَذۡکُرُ الۡاِنۡسَانُ اَنَّا خَلَقۡنٰہُ مِنۡ قَبۡلُ وَ لَمۡ یَکُ شَیۡئًا ﴿۶۷﴾
মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে পূর্বে সৃষ্টি করেছি যখন সে কিছুই ছিল না? [১] [১] আল্লাহ তাআলা উত্তরে বলেন, যখন আমি মানুষকে প্রথমবার বিনা কোন নমুনা ছাড়া সৃষ্টি করেছি, তখন দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা কেমন করে কঠিন হতে পারে? প্রথমবার সৃষ্টি করা কঠিন, না দ্বিতীয়বার? মানুষ কতই না বোকা ও আত্মবিস্মৃত! আর আত্মবিস্মৃতিই মানুষকে আল্লাহবিস্মৃত বানিয়েছে - তাফসীরে আহসানুল বয়ান)
দ্বিতীয় তো " আলাক -২ নং আয়াতে আমাদের মাতৃগর্ভের একটা স্টেপ এর কথা বলা হচ্ছে ।
তৃতীয় তো আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াতে ওরকম কোনো কথাই নেই, ওখানে বলা হয়েছে " প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে পানি থেকে "
চতুর্থ তো " মানুষ নুতফা বা বীর্য থেকে তৈরি, এটাও আমাদের একটা আলাদা স্টেপ। প্রথমে পিতার লিঙ্গ থেকে বীর্য বাহির হয় তারপর তা নারীর জরায়ুতে যায় তারপর আলাক... এগুলো একেকটা স্টেপ। আর একেক স্টেপকে এক করে বৈপরীত্যে বানিয়ে দিছে মূর্খ নাস্তিকরা।
শেষ কথা হলো " মানুষ মাটির তৈরি এটা শুধু বাবা আদম এর ক্ষেত্রে । আশা করি পয়েন্ট সাত এর দাবি ক্লিয়ার।
দাবিঃ৮- কিয়ামতের দিনে আল্লাহ কি সুপারিস গ্রহন করবেন!!"
আল্লাহ কিয়ামতের দিনে সুপারিস "গ্রহন করবেন” ―
সূরা ত্বোয়া-হা:১০৯ (সূরা ২০:১০৯)
সূরা সাবা:২৩ (সূরা ৩৪:২৩)
সূরা যুখরুফ:৮৬ (সূরা ৪৩:৮৬)
বৈপরিত্যঃ
আল্লাহ কিয়ামতের দিনে সুপারিস "গ্রহন করবেন না”―
সূরা আল বাক্বারাহ:১২৩ (সূরা ২:১২৩)
সূরা আল আন-আম:৫১ (সূরা ৬:৫১)
সূরা আল ইনফিতার:১৯ (সূরা ৮২:১৯)
জবাবঃ প্রকৃত কথা হলো আল্লাহ রব্বুল আলামীন যাকে অনুমতি দিবে সেই সুপারিশ করতে পারবে। উক্ত আয়াতগুলোতে একেক আয়াত একেক অবস্থার জন্য বলা হয়েছে। নাস্তিক সবগুলোকে এক করে নিজের মন মতো বৈপরীত্য ঢুকিয়ে দিয়েছে।
প্রথম সারির আয়াতগুলোতে বিশেষ শ্রেণির লোকদের কথা বলা হয়েছে যারা সুপারিশ করতে পারবে, আর দ্বিতীয় আয়াতগুলোতেও অন্য শ্রেণির কথা বলা হইছে যারা সুপারিশ করতে পারবে না। মূর্খ নাস্তিক আয়াতে কিছু অংশ হাইলাইট করে পুরোআয়াতের মানেগুলোকে চেন্স করে ফেলছে।
দাবিঃ৯- ১০."ব্যভিচারীদের শাস্তি কি!!"
ব্যভিচারীদের শাস্তি "গৃহবন্ধি করা।” ― সূরা আন নিসা:১৫ (সূরা ৪:১৫)
Williams B Sarcar
বৈপরিত্যঃ
ব্যভিচারীদের শাস্তি "১০০ করে বেত্রাঘাত।” ― সূরা আন-নূর:২ (সূরা ২৪:২)।
জবাবঃ মূর্খ নাস্তিক বাপের জন্মে নাসেখ মানসূখ এর নাম শুনে নায়। ঘরে বন্ধি করে শাস্তি দিতে হবে এই বিধান রহিত হয়ে গেছে
আর মূর্খ রহিত বিধান দিয়ে প্রচলিত বিধানে বৈপরীত্যে ঢুকিয়ে দিসে
তো এই ছিল মিথ্যা তথ্যের খন্ডন।
আশা করি লেখাটা ভালো লেগেছে
তো সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
কলমে : মোঃ মেহেদী হাসান ✍️✍️✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
প্রিন্স ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।