সময়টা তখন বেলা ফুরাবার পূর্বক্ষণ। ঋতুর রঙে যেন ঝরে পড়ে একঝাঁক আলসেমির অণুকণা। তবু আমি দো'তালার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকি প্রায়ই—পাহালিয়ার বুকে বয়ে চলা স্রোতের দিকে তাকিয়ে। কখনো মন হারিয়ে যায় সেই ধীরলয়ের ঢেউ-ভঙ্গিতে, কখনো নদীর তটে দুলতে থাকা কাশফুলের ঋতুর ভাঁজে, আবার কখনো রশীদি মালঞ্চে আশ্রিত পাখিদের অভয়ারণ্যে। এই সময়টাতে পৃথিবী যেন একটু ধীরে হাঁটে; আর মানুষের হৃদয় একটু বেশি শুনতে পায় নিজের গভীর শব্দ।
আজও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে। তারপর হাঁটি হাঁটি পায় যখন হযরত ওয়ালা দা. বা. এর কামরার দিকে এগোলাম, তখন মনে হচ্ছিল আমি যেন ধীরে ধীরে এক পবিত্র অঞ্চলের দিকে স্থানান্তরিত হচ্ছি—যেখানে শব্দের প্রয়োজন পড়ে কম, হৃদয়ের প্রয়োজন বেশি, আর আত্মা যেখানে কেঁপে ওঠে গোপনে।
আমি যখন হযরত ওয়ালা দা. বা. এর দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম, মনে হলো যেন—এখানে বাতাসেরও ওজন আলাদা। এটি যেন শুদ্ধির সমীরণ; হৃদয়ের মালঞ্চে নিঃশব্দে এসে ঝরে পড়া এক বরকতমাখা স্পর্শ।
লক্ষ্য করলাম—হযরত ওয়ালা দা. বা. এর মুলাকাতের কক্ষে একজন যুবক আনমনে বসে আছে। বয়স আনুমানিক একুশ–বাইশ। মুখে এক অজানা হতাশার ছাপ—জামদানি সুতোয় গেঁথে থাকা দুঃখের মতো স্পষ্ট। মাঝেমধ্যে বুকপকেট থেকে কি যেন বের করে আবার রেখে দিচ্ছে। ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম—একটি চিরকুট। পড়ছে, ভাঁজ করছে, আবার খুলছে। তার এ উদ্বিগ্ন হাতের ভাষায় যেন সম্মিলিত আবেগের ঢেউ কাজ করছে।
কিছুক্ষণ পর হযরত ওয়ালা দা. বা. কামরা থেকে বের হলেন। আমি একবার তাকাই হযরতের দিকে, ফের যুবকের দিকে। যুবকটি কম্পিত কদমে সামনে এগোল, কিন্তু কিছু বলতে পারলো না—ভয়, শ্রদ্ধা এবং এক অদৃশ্য এক শঙ্কা যেন তাকে গ্রাস করে রেখেছে।
হযরত তো হযরত! নিজের ব্যক্তিত্বের কোনো বৃহৎ ছায়া সামনে ঠেলে দেন না; বরং সরলতা, বিনম্রতা ও সুগভীর মানবিকতার এক আলোকরেখা হয়ে উপস্থিত হন। হালকা হাসির স্নিগ্ধতা ঠোঁটের কোণে ছড়িয়ে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুবকের দিকে হাত বাড়ালেন। মুসাফাহা শেষে বললেন—“কিছু বলবে?”
যুবকটি তখন বুকপকেট থেকে চিরকুট বের করে হযরতের হাতে দিল। হযরত ওয়ালা দা. বা. চিরকুটটি পকেটে পুরে নিলেন এবং মসজিদে রশীদের কাজ পর্যবেক্ষণে চলে গেলেন। আমি তখন তলিয়ে গেলাম বিচিত্র ভাবনার অথৈ সাগরে।
আহ!
যুবকটির কী অদ্ভুত সৌভাগ্য!
হযরত ওয়ালা দা. বা. তার সাথে মুসাফাহা করলেন, তার চোখে সরাসরি তাকিয়ে অমায়িক প্রশ্ন করলেন। মানুষের জীবনে এমন মুহূর্ত আসে কি—যেখানে শব্দের প্রয়োজন থাকে না, থাকে শুধু এক স্পর্শ, এক দৃষ্টি, এক পবিত্র সংযোগ? সেই মুহূর্তটাই যেন আজ যুবকটির ভাগ্যে নীরবে অবতীর্ণ হয়েছে।
মনে পড়ল—
দু-একবার এমন সৌভাগ্য হয়েছিল সত্যি,
যখন হযরত মেডিনোভা হাসপাতালে ছিলেন।
আমি তখন তাঁর মুলাকাতের আশায় বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম;
হৃদয়ে তখন ছিল কেবল প্রত্যাশার লণ্ঠন,
সব আলো নিভে গিয়ে শুধু একটি আলোর প্রতীক্ষা।
হযরতের সাথে যখন মুলাকাত করেছি, হযরত স্বয়ং যখন আমার হাত স্পর্শ করে জিজ্ঞেস করেছিলেন—“তোমার নাম কি?”
তখন আমার মনে হয়েছিলো—
এই জিজ্ঞাসা কি সত্যিই আমার জন্য?
নাকি আমার নামের আড়ালে আল্লাহর রহমতের কোনো দরজা খুলে যাচ্ছে?
আজ যুবকটিকে দেখে সেই স্মৃতি নতুনের মতো ফিরে এলো। তার কম্পিত হাত, লজ্জায় নুয়ে পড়া চোখ, আর চিরকুট এগিয়ে দেওয়ার সরলতা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, হযরতের নিকটে আসার জন্য যে অন্তরের দরজা খুলতে হয়, সেই দরজাটা আজ তার জন্য আল্লাহ খুলে দিয়েছেন।
আমার ভেতর তখন এক দহন মেশানো আরজু—
যদি এই সৌভাগ্যও পুনরায় ফিরে আসত আমার জীবনে! যদি সেই সুদিন বারবার ফিরে ফিরে আসত— হৃদয় হয়তো আবার শিশুর মতো কেঁপে উঠত।
ঠিক এই মুহূর্তে ভাবি—মানুষ কতো দূর–দূরান্ত পেরিয়ে আসে জামেয়ায়, শুধু একটিবার হযরতের মুলাকাতের আশায়। একটি চিঠি তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায়! এক ঝলক সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য! অথচ আমরা—যারা প্রতিদিন হযরতের এত নিকটে—নিঃস্পন্দ, নির্বিকার, অনুভূতিহীন হয়ে থাকি! আমাদের এ উদাসীনতার অন্ত হবে কবে? কবে মুক্তি পাবো এই গাফলতের চৌকাঠ ভেঙে? বটবৃক্ষের ছায়া হারানোর পর যদি তার মূল্য বুঝি—তবে সেই উপলব্ধি নিছক নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মাগরিবের স্পর্শে ভাবনার পাতা উল্টে যায়। রশীদি মালঞ্চ জুড়ে ভেসে আসে হৃদয় থমকে দেওয়া আযানের ধ্বনি; পাখিদের গুঞ্জরণ মিশে এক চিরায়ত সুরের জন্ম দেয়। তখন নিজেকে মনে হয়—কোনো অদৃশ্য সত্তার দিকে ছুটতে থাকা এক প্রত্যাবর্তনমান আত্মা। আমি রেলিং স্পর্শ করে দৌড়ে চলি মসজিদের দিকে—বুকে তখন নবতর সান্নিধ্য গ্রহণের তীব্র ঝড়।
আমি বুঝি—
আমরা যারা নিকটবর্তী;
বরকতের ছায়ার এত কাছাকাছি থেকেও—
প্রায়ই নিজের সৌভাগ্য চিনতে ভুল করে ফেলি।
ছায়া হারালে যেমন বৃক্ষের মূল্য অনুভব হয়,
তেমনি আমাদের হৃদয়ও জাগে বহু দেরিতে।
কিন্তু আজকের এই দৃশ্য—যুবকের কম্পিত কদম, হযরতের হাসিমাখা মুসাফাহা—এসবই যেন আমাকে আবার মনে করিয়ে দিল—
নিকটবর্তী হওয়া মানেই উপলব্ধির অধিকারী হওয়া নয়।
উপলব্ধি অর্জন করতে হয়—
হৃদয় দিয়ে, শ্রদ্ধা দিয়ে, জাগরণের ব্যথা দিয়ে।
মসজিদের সিঁড়িতে পা রাখতেই মনে হলো—
জগতের সকল শব্দ যেন বাইরে রয়ে গেল;
ভেতরে শুধু নীরব এক সুর— যা আল্লাহর দিকে টানে; স্ব–শুদ্ধি ও আত্মশুদ্ধির দিকে টানে; আর অচল হৃদয়কে করে তোলে আবারো চলমান।
দিনলিপি
সাতাইশ–আট–পঁচিশ
বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।