গল্প কথোপকথন : আল্লাহ কেন বর্তমান মুসলিমদের সাহায্য করছেন না?
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
কলেজ এর ভিতরে মেহেদী ও তার বন্ধুরা মিলে গল্প করছে। তখন শংকর দাস এসে সবার সাথে আড্ডা দিতে বসে পরলো। মেহেদী সবাইকে খালিদ বিন ওয়ালিদ এর সাহসীকতার গল্প শুনাচ্ছে তার বন্ধুদের। শংকর তখন মেহেদীকে উদ্দেশ্য করে বলল যে " মেহেদী তোমাকে একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরে করব ভাবছিলাম কিন্তু কিছু কারণে তা করে ওঠা হয় নি, আজকে যেহেতু সুযোগ পেয়েছি তাই তোমাকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। মেহেদী তখন তার হিন্দু ক্লাসমেট শংকরকে বলল " তুমি কি প্রশ্ন করতে চাও?
শংকর : আচ্ছা মেহেদী তুমি কলেজ এতে এসে তোমার মুসলিম বন্ধুদের সব সময় তোমাদের মুসলিম বীরদের গল্প শোনাও, তারা কি করে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুসলিম সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়ে কি করে বিভিন্ন ভূ- খন্ড জয় করেছে আর চারিদিকে ইসলামের বিস্তার করেছে এবং ইসলামি খেলাফত কায়েম করেছে এসব বলে থাকো। আমার প্রশ্ন হলো তোমাদের অতীতে যদি এত বীর থেকে থাকে তাহলে বর্তমানে ফিলিস্তিন গাজাতে কেন কোনো বীর আল্লাহ পাঠাচ্ছে না যে সমগ্র ফিলিস্তিন ভূ- খন্ডকে মুক্ত করবে শত্রুর হাত থেকে যেমন করে তোমাদের বীর মুজাহিদ সালাউদ্দিন আইয়ুবি আল আকসা ইহুদিদের থেকে মুক্ত করেছিল। আজ দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে তোমাদের মুসলিমদের অত্যাচার করা হচ্ছে , এত অত্যাচার হওয়ার পরেও কেন আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করছেন না? কেন তিনি আগের মতো মুসলিম বীর পাঠাচ্ছে না তোমাদের রক্ষা করতে?
শংকর মেহেদীকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো এক নাগারে বলে গেলো আর মেহেদী সহ ক্লাসে থাকা তার বন্ধুরাও শংকরের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলো!
ক্লাসের অন্যান্য মুসলিম স্টুডেন্ট এর একই প্রশ্ন যে আল্লাহ কেন আমাদের রক্ষা করছে না? কেন তিনি সালাউদ্দিন আইয়ুবি, মুহাম্মদ গজনবী, উসমান গাজি এর মতো বীরদের পাঠাচ্ছে না যারা পুরো মুসলিম জাতিকে কাফের থেকে রক্ষা করবে এবং আবার খিলাফাহ কায়েম করবে?
সবাই মেহেদী এর উত্তরের অপেক্ষাতে ছিল যে সে শংকরের প্রশ্নের জবাবে কি উত্তর দিবে।
মেহেদী কিছুক্ষণ নীরব থেকে শংকর সহ ক্লাসের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলা শুরু করল -
মেহেদী : তুমি শংকর সত্য বলেছো যে বর্তমান মুসলিমরা সকল জায়গায় নির্যাতিত। ফিলিস্তিন থেকে ভারত, ভারত থেকে মায়ানমার, মায়ানমার থেকে...... সকল জায়গায় মুসলিমরা অমুসলিমদের কাছে অপমানিত হচ্ছে । আর এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ভাবেই একটা প্রশ্ন মানুষের মনে আসতে পারে আর তা হলো " আল্লাহ কেন আমাদের ( মুসলিম) সাহায্য করছেন না? যেমনটা তোমার মনে এই প্রশ্নটা এসেছে। তুমি জানলে অবাক হবে যে আল্লাহ আমাদেরকে কোরআনে সাহায্য এর ওয়াদা করেছেন ( কোরআন: রুম-৪৭; হজ্ব-৩৮....) । এখন প্রশ্ন এটা যে আল্লাহ কেন আমাদের সাহায্য করছেন না? তো আমরা এখন এটার জবাব কোরআন এর আলোকে বুঝার চেষ্টা করব
ক্লাস এর সবার আগ্রহ আরও বেড়ে গেলো যে মেহেদী আসলে কোরআন এর আলোকে কি বলতে যাচ্ছে..... । মেহেদী তার কথাগুলো বলা শুরু করল.....
মেহেদী : আমরা যদি কোরআনের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে কোরআনে বলা হয়েছে আল্লাহ মোমিনদের সাহায্য করবেন ( কোরআন-৩০/৪৭) এখন কথা হলো আমরা কি মোমিন?? উত্তর হলো আমরা বড়জোর সামগ্রিক ভাবে মুসলিম কিন্তু মোমিন না। মোমিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন -
মুমিন তো তারাই যাদের অন্তর কম্পিত হয় যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয়, আর যখন তাদের সামনে তার আয়াত পাঠ করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা স্বীয় প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে। যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদের যা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে, তারাই হলো প্রকৃত ঈমানদার।( আনফাল-২)
তো এই আয়াতে মোমিন এর কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছি সেগুলো হলো-
১. আল্লাহর নাম নেওয়া মাত্র তাদের অন্তর কম্পিত হয়
২. কোরআন পাঠ করা শুনলে ইমান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে
৩. আল্লাহর উপর ভরসা করে
৪. নামায পড়ে
৫. হালাল থেকে ব্যয় করে
এখানে একজন ইমানদার মোমিন এর পাঁচটা গুন দেখতে পাচ্ছি।
এখন তোমরা যদি বর্তমান আমাদের মুসলিম সমাজ এর দিকে তাকাও তাহলে দেখতে পাবে যে খুব কম লোকের মধ্যে এইগুন সবগুলো পাওয়া যাবে।
মেহেদী তার মুসলিম ক্লাসমেটদের উদ্দেশ্য করে বলল-
এখন তোমরা তোমাদের বুকে হাত রেখে বল তোমাদের বা আমাদের মুসলিম সমাজের ভিতর কি বর্তমানে এই পাঁচটা গুন আছে??? যখন আজানে আল্লাহ আকবার বলা হয় তখন কি আমাদের অন্তর কম্পিত হয় আল্লাহর ভয়ে? যখন মাগরিবের বা এশার এর আজান দেওয়া হয় তখন আমরা টিভি এর সাউন্ড কমিয়ে টিভি দেখতে থাকি ( আর নারীরা মাথাই কাপড় দিয়ে দেখে...) যখন হুজুর মাইকে সেহরির সময় কোরআন তেলাওয়াত করে তখন আমরা রাগান্বিত হয়। তো এই হলো আমাদের বর্তমান মুসলিম সমাজের অবস্থা!
মেহেদী শংকর সহ আবারও সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল যে -
আমরা আল্লাহর উপর যতটা না ভরসা করি তার চেয়ে অধিক ভরসা করি জাতিসংঘে এর মতো তাগুতদের উপর। সালাত তো সপ্তাহে শুধু একদিন পড়ি। আর হালাল খাওয়া-দাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না কারণ সবাই কুফরি গণতন্ত্র এর ব্যাংক নাম সুদি কারবারের সাথে জড়িত কোনো না কোনো ভাবে। আল্লাহর বলা এই পাঁচটা গুন কি আমাদের মধ্যে আছে? উত্তর হলো না নেই। যখন এই গুন গুলোই আমার ও আমাদের মাঝে নেই তখন আমি আপনারা মোমিন হলাম কখন? আর যখন আমরা মোমিনই না তখন আমাদেরকে আল্লাহ সাহায্য করবে কেন? আল্লাহ বলছেন " আল্লাহ মোমিনদের সঙ্গে আছেন ( আনফাল-১৯) আর আমরা তো মোমিনই না তাহলে আমরা কিসের আশাতে সাহায্যের আশা করি???
মেহেদী আরও বলতে লাগল -
আমরা এই কারণে সাহায্য পাচ্ছি না কারণ -
১. আমরা মোমিন না ; নাম মাত্র মুসলিম
২. আমরা আল্লাহর রজ্জু ( কোরআন) মানি না
৩. আমরা নিজেরাই বিচ্ছিন্ন
আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন
" তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে আকড়িয়ে ধরো এবং বিভক্তি হয়ো না "( কোরআন-৩/১০৩)
এইখানে রজ্জু বা রশি বলতে কোরআনে বুঝানো হয়েছে আর বিভক্তি বলতে ' মুসলিমদের বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে যাওয়াকে বুঝানো হয়েছে '( দেখুন : উক্ত আয়াতের তাফসীর : তাফসীরে আহসানুল বয়ান)
আজ আমরা কথায় কথায় মুসলিম ভাইদের কাফের ফতোয়া দিয়ে থাকি। শিয়া, সুন্নি, কাদরিয়াসহ আরও নানা দলে বিভক্ত । আল্লাহ বলছেন বিভক্ত হয়ো না আর আমরা বিভক্ত হয়ে গেছি।
আর মুসলিম বীর আল্লাহ মুসলিমদের থেকেই তো পাঠাবে, যখন আমরা নিজেরাই নামকা ওয়াস্তে মুসলিম তখন আল্লাহ কোথা থেকে মুসলিম বীর পাঠিয়ে আমাদের সাহায্য করবে? যখন কোনো মুসলিম ছিল না তখন আল্লাহ আবাবিল পাঠিয়ে সাহায্য করেছিল, কিন্তু আজ দুনিয়াতে মুসলিম এর অভাব নেই কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন প্রকত মোমিন মুসলিম হওয়ার সেসব গুনাবলি নেই যা থাকার কথা ছিল......।
মেহেদী এক নাগারে কথাগুলো বলে গেলো.... আর এতটুকু বলার পর মেহেদী চুপ হয়ে গেলো!
মেহেদীর কথা শুনে পুরো ক্লাস নীরব হয়ে গিয়েছে
তারপর একজন ক্লাসমেট পাশ থেকে বলল যে " বন্ধু মেহেদী তুমি সত্য বলেছো। আমাদের নিজেদরই কর্মকান্ড এর জন্য আমরা আল্লাহর থেকে সমগ্র মুসলিমদের রক্ষাতে সাহায্য পাচ্ছি না। আগে আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করা উচিত তাহলে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন ইনশাআল্লাহ....
শংকর: তুমি দারুণ ভাবে বিষয়টা ফুটিয়ে তুলেছো। সত্যিই তোমার জবাবটা চমৎকার ছিল
ক্লাস এতে থাকা সবাই শংকরের কথাতে সমর্থন দিলো
মেহেদী সবাকে উদ্দেশ্য করে একটা আয়াত পাঠ করে গল্পের আসর সেখানে শেষ করে দিলো আর সেই আয়াতটা হলো-
"আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের ভেতরের অবস্থা পরিবর্তন করে।" ( কোরআন, সূরা রা'দ-১৩/১১)
অতএব আমাদের ভাগ্য প্রথমে আমাদেরই পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নিতে হবে তারপর আল্লাহ সাহায্য করবেন এবং তখন আল্লাহ আলাদা করে বীর পয়দা করবেন না বরং আমাদের এক একজনকেই বীর বানিয়ে আমাদের শত্রুদের কিতাল করে ইসলামের বিজয় দান করবেন ইনশাআল্লাহ....
লেখক: মোঃ মেহেদী হাসান
প্রিন্স ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।