বড়ত্বের অহংকারের ছায়া
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরণঃ বিশ্লেষণধর্মী
পোস্টের তারিখঃ ১৮-১০-২০২৫
আমাদের চারপাশে বড়ত্বের অহংকার ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জীবনের চলার পথে অনেকেই এমন কিছু মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছেন, যখন বড়দের অহংকার কেবল দৃষ্টিনন্দন নয়, অন্তরকেও ব্যথিত করে। আমি আজ সেই অভিজ্ঞতার কয়েকটি গল্প আপনাদের সামনে তুলে ধরছি—যেখানে ঘটনা, অনুভূতি এবং মানবিক অন্তর্দৃষ্টি একসাথে ছন্দবদ্ধ হয়েছে।
চলুন শুরু করি।
একদিন কোনো ধনী আত্মীয় দাওয়াত করেছে। সামর্থ্য অনুযায়ী উপহার কিনে জনাব খলিলুল্লাহ পরিবার নিয়ে গেলেন। দরজায় পা রাখতেই চোখে পড়ল সোনালি লাস্যময় প্লেট, সুবাস ছড়ানো রান্না, চকচকে টেবিলক্লথ। চারপাশে আলো এবং ঝলমলে পরিবেশ যেন নিজের বড়ত্ব প্রমাণে ব্যস্ত। বাতাসে ভাজা মাছের সুবাস, ঝালমশলার ঘ্রাণ, এবং দইয়ের ক্রীমি সৌরভ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।
খাবার পরিবেশনের সময় ওই আত্মীয় বললেন,
"আপনাদের জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকার ইলিশ, দেড় হাজার টাকা কেজি চিংড়ি, খাসির মাংস, কাটারি ভোগ চালের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নেন, বেশি বেশি খেয়ে নিন।"
জনাব খলিলুল্লাহ চুপচাপ পাতে ভাত নিলেন। মুখে ভদ্রতা, চোখে নম্রতা, কিন্তু মনে এক অদৃশ্য চাপ। “এতো দামি খাবার আমাদের কেনার সামর্থ্য নেই, তাই খেয়ে নিলাম,” তিনি ভাবলেন। প্রত্যেকটি পদ যেন বলছে—“দেখো, আমরা তোমাদের চেয়ে বড়।” হাত ধীরে ধীরে কাপড়ে মুছে ফেলছিলেন, যেন এই বড়ত্বের ভার নিজের কাঁধে না পড়ে।
রাত এল। তিনবেলা পোলাও-কোরমা খেয়ে ঘুমের ওষুধ ছাড়াও ঘুম আসে না তাদের। অন্যদিকে, খলিলুল্লাহ পরিবার আলু ভর্তা, ডাল, ভাত খেয়ে স্বাভাবিক ঘুমে ডুবে যায়। ছোট আনন্দের মধ্যেই শান্তি—এটাই প্রকৃত সুখ।
এই গল্প শুধু বড়ত্ব নয়, মানবিক অনুভূতির দ্বন্দ্বও ফুটিয়ে তোলে। বড়ত্বের প্রদর্শন কখনো কখনো অন্যের শান্তি ছিনিয়ে নেয়। আমরা কি কখনো ভাবি, আমাদের অহংকার অন্যকে কতটা চাপ দিচ্ছে?
আরেকটি গল্প—শিক্ষার বড়ত্ব অনেককে অন্ধ করে দেয়। বুয়েট বা ঢাবির ছাত্ররা জাবি বা প্রাইভেটের ছাত্রদের ছোট করে দেখে। প্রকাশ্যেই বলে,
"জাবির সার্টিফিকেটের কোনো দাম নাই, প্রাইভেটে তো টাকা দিয়ে সনদ বেচা হয়।"
কিন্তু কর্মজীবনে দেখা যায়, বসতো জাবি থেকে পাশ করা কেউ। শিক্ষার চেয়ে প্রতিষ্ঠানের বড়ত্বকেই বড় করে দেখা—এটাই মূল ভুল। পুরো পৃথিবীই পাঠশালা, যেখানে ইচ্ছা থাকলে কেউ মেধার আলোয় উজ্জ্বল হতে পারে।
ছাত্র জীবনে যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য দেখানো হয়, কর্মজীবনে তা প্রায়শই চোখে আঙুল দিয়ে দেখা যায়। ছোট বোঝাপড়ার মধ্যে বড় শিক্ষা লুকানো থাকে—যা আমরা প্রায়শই উপেক্ষা করি।
এবার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়।
মসজিদের হুজুর থেকে শুরু করে পাড়ার মুরুব্বি, অফিসের বস—সবাই শুধু সালাম পেতে চায়, দিতে চায় না। অথচ সম্মান প্রদানের ছোট্ট অভ্যাস মানুষকে বড় করে তোলে।
জাপানির উদাহরণ অনুপ্রেরণীয়। রাস্তা পার হতে থাকা বাচ্চাদের জন্য গাড়ি থেমে যায়। বাচ্চারা মাথা ঝুঁকিয়ে ধন্যবাদ জানায়। গাড়িতে থাকা সবাই হাসি দিয়ে প্রতিত্তর দেয়। এই এক মুহূর্তের বিনিময়েই বোঝা যায়—অহংকার ক্যান্সারের মতো ছড়াতে পারে, যদি আমরা সম্মান না দিই।
একবার ভাবুন—যদি আমরা অন্যকে সম্মান না দিই, বড়ত্বের অহংকার ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়বে। কাউকে সম্মান করলে নিজে কখনো ছোট হয়ে যায় না; বরং সুনাম ও মানবিকতা বৃদ্ধি পায়।
ছোট ছোট মুহূর্ত, বিন্দু মাত্র সহানুভূতি, সদয় দৃষ্টিভঙ্গি—এগুলোই প্রকৃত বড়ত্বের পরিচয়। আজকের শিক্ষা: চারপাশের অহংকারের ছায়া যত ঘন, মানুষের অন্তরের সম্মান এবং সহানুভূতির আলো তার থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।
আজকের দিনে আমরা শিখি—বড়ত্ব শুধু পদে, ধনে, পরিচয়ে নয়; বড়ত্ব আসে আচরণে, মনের আয়তনে এবং মানুষের প্রতি সদয় দৃষ্টিতে।
আমাদের চারপাশে বড়ত্বের অহংকার ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে না পড়ুক—এই প্রত্যাশায় আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।
সবাই ভালো থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।
#বড়ত্বেরঅহংকার #সম্মান #সামাজিকশিক্ষা #জীবনেরউপদেশ #আত্মচিন্তা #সাহিত্যিকগদ্য #মানবিকঅনুভূতি #অহংকার #বড়ত্ব #enolej_idea #জীবনেরপাঠ #মোহাম্মদজাহিদহোসেন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।