সে এক যুবক! নাম তার নুয়েল। বয়স একুশ থেকে বাইশের মাঝামাঝি। সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সূচনা করল। বিবিএ (অনার্স) প্রথম বর্ষের ছাত্র সে। জীবনের যে বয়সে স্বপ্নগুলো একে একে ডানা মেলে আকাশে উড়তে চায়, যে বয়সে ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারো পরিকল্পনা ঘুরে বেড়া মনের গহিনে, নুয়েল তখন এক অদ্ভুত দ্বিধা আর শৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে নিজেকে গড়ে তুলছে।
নুয়েলের বেড়ে ওঠা কড়া শাসনের ভেতর দিয়ে। মা-বাবা দু’জনেই ছিলেন নিয়মকানুনে বিশ্বাসী মানুষ। ছোটবেলা থেকেই তাকে শিখিয়েছেন—মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে নৈতিকতা আর শিষ্টাচার। এজন্যই হয়তো স্কুল-কলেজে অন্যদের মতো আবেগতাড়িত হয়ে কোনো অকারণ বেপরোয়া কাজ করেনি সে। বন্ধুরা যখন হইচই করে বেড়াত, প্রেম-ভালোবাসার উন্মাদনায় মাতত, তখন নুয়েল দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকত নিঃশব্দে।
সে জানত, এই বয়সে প্রেমে জড়িয়ে অনেকেই ভেঙে পড়ে। তার অনেক স্কুল বন্ধু কিশোর বয়সের প্রেমে সর্বস্বান্ত হয়েছে—পরীক্ষার ফল খারাপ, মানসিক ভাঙন, পরিবারে অশান্তি। এসব দৃশ্য চোখে দেখে নুয়েল প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে কখনোই এ অস্থির আবেগে নিজেকে জড়াবে না। প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তার জীবনসঙ্গী কেবল কল্পনার মানুষই থাকবে।
কিন্তু মানুষের জীবনে সবসময় নিজের নিয়ম চলে না।
অচেনা সময়, অজানা মানুষ—এরা এসে কখনো কখনো সমস্ত শৃঙ্খলা ভেঙে দিয়ে নতুন গল্প লিখে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্ত্ততি নিতে গিয়ে
প্রথমবারের মতো নুয়েল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলে। সে সময়টায় সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে ডুবে যাওয়ার মতো তেমন আকর্ষণ ছিল না তার। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনে ব্যবহার করত। কিন্তু জীবনের বাঁক যে কখন কোনদিকে ঘুরে দাঁড়াবে, তা কেউ জানে না।
একদিন হঠাৎই তার ইনবক্সে ভেসে আসে একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। প্রোফাইল ছবিতে সাদা শাড়ি পরা একটি মেয়ে, নাম নাইরা। নুয়েল প্রথমে চিনতে পারেনি। তবে প্রোফাইল ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ বুঝতে পারে—সে তো তার কলেজের জুনিয়র! তখনো কলেজে পড়ে, সামনে এইচএসসি পরীক্ষা।
“এড করব কি না?”
কিছুক্ষণ দ্বিধায় থাকে নুয়েল।
কিন্তু অবশেষে ‘অ্যাকসেপ্ট’ বাটনে ক্লিক করে দেয়।
এরপর ধীরে ধীরে তাদের পরিচয় হয়। প্রথমে আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা, তারপর বন্ধুত্ব। নাইরার সহজ-সরল কথা বলার ভঙ্গি, প্রাণবন্ত হাসি, আর পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা নুয়েলকে মুগ্ধ করে। সে বুঝতে পারে, মেয়েটা বাকি সবার মতো নয়। খুব গুছিয়ে চলতে জানে, স্বপ্ন আছে তার, আছে নিজের প্রতি বিশ্বাস।
সময় গড়িয়ে যায়। নাইরার সামনে এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসে। তখন সে পড়াশোনায় ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে নুয়েলও নিজের ইচ্ছেমতো তাকে বিরক্ত করে না। শুধু মাঝে মাঝে খোঁজ নেয়—
“পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“অল দ্য বেস্ট তোমার পরীক্ষার জন্য।”
এর বেশি কিছু না।
পরীক্ষা শেষে যখন যোগাযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, তখন নুয়েল ভেবেছিল—হয়তো এ বন্ধুত্বও ক্ষণস্থায়ী। ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে নাইরা উধাও হয়ে গেছে। মনে হয়েছিল, এই সম্পর্কের হয়তো কোনো মানেই নেই।
কিন্তু মানুষের জীবনে অনেক সম্পর্কই নিরবচ্ছিন্নভাবে টিকে থাকে না, আবার আচমকাই ফিরে আসে। নাইরাও ফিরে এলো।
এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। নাইরা জিপিএ ৫ পেল। আনন্দে ভেসে গিয়ে হঠাৎই সে নুয়েলকে মেসেজ দিল—
“হাই! আজকে আমার রেজাল্ট বের হলো। জিপিএ ফাইভ পাইলাম।”
অপ্রত্যাশিত এই বার্তায় অবাক হয়েছিল নুয়েল । এতদিন পর কথা, অথচ এমন আপন ভঙ্গিতে! সেই দিন থেকে তাদের কথোপকথনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
তবে এবার সম্পর্কটা কেবল বন্ধুত্বে আটকে থাকল না। সময়ের সাথে সাথে নাইরা বুঝল—সে আস্তে আস্তে নুয়েলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। একদিন সাহস করে বলেই ফেলল—
“জানো, আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি।”
নুয়েল প্রথমে হতবাক হয়েছিল। সে তো প্রেম থেকে দূরে থাকার অঙ্গীকার করেছিল!
কিন্তু নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলোকে আর অস্বীকার করতে পারল না। নাইরার কথা শুনে তার বুকের ভেতরে যে অজানা আনন্দের ঢেউ খেলল, তাতে পরিষ্কার হলো—তার মনও নিঃশব্দে ঠিক একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।
এভাবেই শুরু হলো তাদের প্রেমের গল্প।
প্রেমে পড়লে পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখা যায়।
আফতাবও যেন সেই রঙিন ক্যানভাসে নতুন আলো খুঁজে পেল।
নাইরা যখন তাকে জানাল—“আমি তোমার প্রেমে পড়েছি”—তখন প্রথম মুহূর্তে সে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এই তো সেই অনুভূতি, যেটা এতদিন অবচেতনভাবে লুকিয়ে রেখেছিল, অথচ স্বীকার করতে সাহস পায়নি। নাইরার চোখের দিকে তাকালে তার মনে হতো, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি যেন ধুয়ে যায়।
প্রথম দিকে দুজনেই খুব সাবধানে চলত। নিজেদের সম্পর্কের কথা খুব গোপন রেখেছিল। নাইরা তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি—মেডিকেলের ভর্তি যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আর নুয়েলও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় নতুন। তাই তারা জানত, এ প্রেমে সময় কম দিতে পারবে। তবু, অল্প কথাতেও যেন অসীম আনন্দ লুকিয়ে থাকত।
রাত জেগে পড়াশোনা করতে করতে নাইরা হঠাৎ একটুখানি মেসেজ পাঠাত—
“জেগে আছো?”
নুয়েলও সাথে সাথে উত্তর দিত—
“হ্যাঁ, পড়ছি। তুমি কেমন আছো?”
এভাবেই ছোট ছোট বাক্য দিয়ে তারা গড়ে তুলত এক অনন্ত সম্পর্ক।
পবিত্র মনে লাগল ভালোবাসার প্রথম রঙ!
প্রথমবার যখন দেখা হলো—রোদেলায়, তখন তাদের বুকের ভেতর দুরুদুরু কাঁপন চলছিল। দুজনেই যেন জানত না, কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে চোখে চোখ রাখতে হয়। নাইরা নীল সালোয়ার কামিজে, মাথায় হিজাব আর হাতে কয়েকটি বই। আর নুয়েল সাদামাটা শার্ট-প্যান্টে, কাঁধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাগ।
সে মুহূর্তে নুয়েলের মনে হয়েছিল—এই মেয়েটিই তার কল্পনার রঙিন মানুষ, যার স্বপ্ন সে এতদিন আঁকত মনের ভেতরে। নাইরার হাসি দেখে তার বুক ভরে উঠেছিল এমন এক অচেনা আবেগে, যাকে শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
অবশ্য সম্পর্ক সবসময় নিখুঁত থাকে না। মাঝে মাঝে ছোটখাটো ঝগড়া হতো।
কখনো নাইরা অভিযোগ করত—
“তুমি সময় দাও না, সবসময় পড়াশোনার অজুহাত।”
নুয়েল হাসত—
“আমি তো চাই তুমি ডাক্তার হও, এজন্যই জোর করি পড়তে।”
কখনো নুয়েল রাগ করত, যদি নাইরা দেরি করে উত্তর দিত।
তখন নাইরা অভিমান ভাঙানোর জন্য লিখত—
“রাগ কোরো না, তুমি জানো তো আমি তোমাকে ছাড়া কিছু ভাবতে পারি না।”
এইসব ছোট ছোট খুনসুটি আসলে তাদের আরো কাছে টেনে আনত। সম্পর্কের গভীরতা বাড়িয়ে দিত।
নুয়েল একসময় বুঝতে পারল—নাইরা তাকে জীবনের নতুন রূপ চিনিয়েছে। এতদিন সে প্রেমকে ক্ষণস্থায়ী আবেগ ভেবে দূরে রেখেছিল। কিন্তু নাইরার ভালোবাসা তাকে শিখিয়েছে, প্রেম মানে কেবল আনন্দ নয়—এটা দায়িত্ব, যত্ন আর একে অপরের প্রতি গভীর বিশ্বাস।
নাইরা যেমন স্বপ্ন দেখত একজন সফল চিকিৎসক হওয়ার, তেমনি নুয়েলও তার পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত। সে ভাবত, হয়তো একদিন তারা দুজন পাশাপাশি বসে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করবে। একটা ছোট্ট ঘর, যেখানে সকালবেলা জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকবে, নাইরার হাতে বই আর তার নিজের হাতে কলম—এমন দৃশ্য কল্পনা করে নুয়েল মুগ্ধ হতো।
তাদের বন্ধুত্বের এক বছর পূর্ণ হওয়ার দিনটা বিশেষ করে রেখেছিল নাইরা।
রাতে হঠাৎ নুয়েল ফোনে পেল একটি ভয়েস মেসেজ—
“তুমি জানো, আজ এক বছর হলো আমাদের পরিচয়। এই এক বছরে তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়েছো। আমি চাই, তুমি আমার জীবনে চিরকাল থেকো।”
শব্দগুলো শুনে নুয়েলের চোখ ভিজে উঠেছিল।
সে ফিসফিস করে বলেছিল—
“আমি কোথাও যাচ্ছি না, নাইরা। তুমি আমার স্বপ্নের অংশ হয়ে গেছো।”
সেদিনের পর তাদের সম্পর্ক আরো গভীর হলো। দুজনেই বিশ্বাস করত—এ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার নয়। তারা ভেবেছিল, সময় যতই কঠিন হোক, দুজন একসাথে লড়াই করবে।
কিন্তু জীবন সবসময় প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না।
যতই দৃঢ় হোক সম্পর্ক, কখনো কখনো অজানা কারণে ভেঙে যায়।
অদৃশ্য এক অস্থিরতা ধীরে ধীরে তাদের মাঝে প্রবেশ করতে শুরু করল…
প্রেম যত গভীর হয়, সম্পর্কের ভেতরে তত বেশি জটিলতা জমতে থাকে। নুয়েল আর নাইরার সম্পর্কও ধীরে ধীরে সেদিকেই এগোতে লাগল।
শুরুটা ছিল অচেনা আবেগে ভরা, ছিল কেবল মিষ্টি অনুভূতির রঙ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বাস্তবতা তাদের সামনে দাঁড় করাল ভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে।
নাইরার সামনে মেডিকেল ভর্তি যুদ্ধ। সে দিনরাত পড়াশোনায় ডুবে থাকত। অনেক সময় ফোন ধরত না, মেসেজের উত্তর দিত না। নুয়েল প্রথমে এসব মেনে নিত। ভাবত—“ও পড়ছে, তাই ব্যস্ত।” কিন্তু ধীরে ধীরে মনে হতে লাগল, সে যেন আর আগের মতো জায়গা পাচ্ছে না নাইরার জীবনে।
অন্যদিকে, নুয়েলও বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন ব্যস্ততায় জড়িয়ে পড়েছিল। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, ক্লাবের কাজ—সব মিলিয়ে তার সময়ও কমে যাচ্ছিল। তবু সে চেষ্টা করত নাইরাকে সময় দিতে। কিন্তু সে যে সম্পর্কটা হৃদয়ের গভীরে যত্নে লালন করত, সেখানে ফাঁকফোকর তৈরি হতে শুরু করল অজান্তেই।
সেই ফাঁকফোকর থেকে জন্ম নিল ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি।
কখনো নাইরা বলত—
“তুমি আমাকে নিয়ে ভাবো না, শুধু নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকো।”
নুয়েল উত্তর দিত—
“আমি তো চাই তুমি ডাক্তার হও। এজন্যই সবসময় তোমাকে পড়তে বলি।”
আবার কখনো নুয়েল রাগ করত—
“তুমি সারা দিন অনলাইনে থাকো, অথচ আমার সাথে কথা বলার সময় পাও না কেন?”
তখন নাইরা বিরক্ত স্বরে লিখত—
“সবসময় কি শুধু তোমাকেই দিতে হবে? আমার নিজেরও তো জীবন আছে।”
এইসব ঝগড়া পরে মিলেমিশে যেত। তারা জানত, একে অপরকে ছাড়া তারা পূর্ণ নয়। কিন্তু মনের ভেতর ছোট ছোট ক্ষত জমতে থাকল।
একদিন নাইরা হঠাৎ বলল—
“নুয়েল, তুমি কখনো ভেবেছো? হয়তো তুমি আমাকে যতটা ভালোবাসো, আমি ততটা পারি না।”
কথাটা শুনে যেন বজ্রাঘাত হয়েছিল নুয়েলের মনে। এতদিন যে সম্পর্ককে সে নিখুঁত ভেবেছিল, সেখানে এমন প্রশ্ন!
সে কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করেছিল—
“মানে? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?”
নাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল—
“ভালোবাসি, কিন্তু মাঝে মাঝে মনে হয়… আমি হয়তো তোমার জন্য যথেষ্ট নই। তুমি অনেক বড় স্বপ্ন দেখো, অনেক বড় আশা রাখো। আমি যদি একদিন ব্যর্থ হই?”
নুয়েল সেদিন তাকে বোঝাতে চেয়েছিল—
“তুমি ব্যর্থ হলেও আমি আছি, নাইরা। আমার কাছে তুমি শুধু সাফল্যের নাম নও, তুমি আমার জীবনের নাম।”
কিন্তু নাইরার চোখে তখন অদ্ভুত এক দ্বিধা ভাসছিল। যেন সে নিজেই নিজের সাথে লড়ছে।
ধীরে ধীরে নাইরা কম কথা বলতে শুরু করল। আগে যেখানে প্রতিদিন ছোটখাটো বিষয়ও শেয়ার করত, এখন চুপচাপ থেকে যেত। নুয়েল মেসেজ করলে অনেক সময় উত্তর পেত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে।
“কোথায় ছিলে?”
“ব্যস্ত ছিলাম।”
এই ব্যস্ততার অজুহাত যেন তাদের মধ্যে দেয়াল তুলে দিল।
তবু নুয়েল নিজেকে বোঝাত—
“ঠিক আছে, সময়ের কারণে হচ্ছে। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে বুঝছিল, কিছু একটা বদলে যাচ্ছে। সেই মিষ্টি অনুভূতি, সেই প্রথম দিনের আগ্রহ—সব যেন কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে।
এক রাতে হঠাৎ নাইরা লিখল—
“তুমি কি কখনো ভেবেছো, আমাদের সম্পর্কটা হয়তো টিকবে না?”
নুয়েল স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
সে অনেকক্ষণ কোনো উত্তরই দিতে পারেনি। তারপর শুধু লিখেছিল—
“তুমি কি আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছো?”
নাইরা উত্তর দিয়েছিল না। শুধু ‘Seen’ হয়ে রয়ে গেলো সেই মেসেজ।
সেদিন নুয়েল জানল, তাদের ভালোবাসার গল্পে এক অজানা অন্ধকার নেমে এসেছে।
যে অন্ধকারের শুরু সে বুঝতে পারলেও, শেষটা এখনো অনুমান করতে পারছিল না।
প্রেম ভাঙে কবে?
যখন দুজনের মধ্যে অভিমান জমে ওঠে?
না কি, যখন ভালোবাসা হারিয়ে যায়?
নুয়েল জানত না। সে শুধু বুঝতে পারছিল—নাইরার চোখে আর সেই আলো নেই, যেটা একসময় তার পৃথিবীকে আলোকিত করত।
এক বিকেলে হঠাৎ নাইরা ফোন করল। কণ্ঠে অদ্ভুত শীতলতা।
“নুয়েল, আমি ভেবেছি… আমাদের আর একসাথে থাকা উচিত নয়।”
কথাগুলো শুনে তার বুক কেঁপে উঠল।
“মানে? হঠাৎ কেন এ কথা বলছো?”
নাইরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তুমি অনেক ভালো। কিন্তু আমি মনে করি, আমি তোমাকে আটকে রাখতে চাই না। তোমার প্রাপ্য হয়তো অন্যরকম কিছু।”
“আমি তো তোমাকেই চাই।
নুয়েলের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“কিন্তু আমি পারছি না।”
এইটুকুই বলল নাইরা। তারপর লাইনটা কেটে দিল।
সেই দিন থেকে নাইরা আর যোগাযোগ রাখল না। ফোন ধরত না, মেসেজের উত্তর দিত না। ফেসবুক থেকেও আনফ্রেন্ড করে দিল। নুয়েল যেন হঠাৎ করে এক শূন্যতার মধ্যে ছিটকে পড়ল।
প্রথমদিকে সে বোঝাতে চেয়েছিল—
“আমি এখনো আছি, তুমি ফিরো।”
কিন্তু যখন বুঝল, নাইরা সত্যিই ফিরে আসবে না, তখন আর আটকানোর চেষ্টা করল না।
সে জানত, ভালোবাসা মানে কারো স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নেওয়া নয়। ভালোবাসা মানে প্রিয় মানুষটির ভালো থাকা। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল—নাইরা যদি মনে করে সে অন্যকিছু ডিজার্ভ করে, তবে আফতাব পেছন ফিরে তাকাবে না।
কিন্তু সত্যি বলতে কি, সিদ্ধান্ত আর বাস্তবতা এক নয়।
নাইরার অভাব তাকে প্রতিটি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াত।
রাতে ঘুম আসত না, হঠাৎ মনে হতো—নাইরা এখন কী করছে? কাকে কথা দিচ্ছে? হাসছে কি?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিড়ে থেকেও নুয়েল একা হয়ে গেল। বন্ধুরা তার হাসি দেখতে পেত, কিন্তু বুকের ভেতরের কান্না কেউ শুনতে পেত না। ক্লাস শেষে যখন সবাই আড্ডায় মেতে উঠত, সে তখন নির্জনে বসে থাকত—হয়তো ক্যাম্পাসের ঘাসের ওপর, হয়তো লাইব্রেরির কোনায়।
সে অনুভব করল, এক মানুষ কেবল আবেগ শেখায় না, বিদায় দিয়েও জীবন শেখায়। নাইরা তাকে প্রেম শিখিয়েছে, আবার হারানোর বেদনা দিয়ে শূন্যতার মানেও শিখিয়ে দিয়েছে।
প্রতিটি জায়গায় স্মৃতি ভর করে থাকত।
বইমেলায় তাদের প্রথম দেখা—সেই স্মৃতি।
প্রথম ভয়েস মেসেজে বলা “চিরকাল থেকো”—সেই স্মৃতি।
রাত জেগে পড়াশোনার ফাঁকে ছোট্ট একটি মেসেজ—“জেগে আছো?”—সেই স্মৃতি।
এসব স্মৃতি নুয়েলের মনে এমনভাবে খোদাই হয়ে রইল, যেন সময়ও মুছে দিতে পারবে না।
এক রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আফতাব হঠাৎ মনে মনে বলল—
“নাইরা, তুমি হয়তো কখনোই জানবে না, তুমি আমার জীবনের প্রথম নিখুঁত ভালোবাসা। আমি হয়তো তোমার চোখে আর ধরা দেব না, তোমার কানে আর আমার কান্নার শব্দ পৌঁছাবে না। তবু আমি জানি, আমার ভেতরে তুমি চিরকাল বেঁচে থাকবে।”
এরপর থেকে সে সিদ্ধান্ত নিল—সে আর খুঁজবে না নাইরাকে। নিজের জীবনকে নতুনভাবে সাজাবে, নতুন পথে হাঁটবে।
কিন্তু সত্যিটা হলো—তার ভেতরে সেই শূন্যতা আর কোনোদিন ভরবে না।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্ক আসে শুধু শেখানোর জন্য। শেখায় কিভাবে আবেগ জন্মায়, কিভাবে ভেঙে যায়, আর কিভাবে ভাঙার পর মানুষ নতুন করে বাঁচতে শেখে। নাইরা ঠিক তেমনই ছিল।
নুয়েল হয়তো আজীবন তাকে খুঁজে পাবে না।
কিন্তু তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি নিঃসঙ্গ মুহূর্তে নাইরার ছায়া থাকবে। অদৃশ্য এক স্মৃতি হয়ে, শূন্যতার ভেতরে লুকিয়ে।
লেখক : মুহাম্মদ সালমান।
বিবিএ (অনার্স)- ১ম বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।