সেই দিনটা ছিল অন্যরকম….!
আকাশ যেন তার সমস্ত রঙ মুছে দিয়ে শুধু মেঘে'ই ভরিয়ে তুলেছিল চারদিক। হাওয়া ছিল ধীর, মাটি ছিল সিক্ত। বৃষ্টি পড়ছিল—না ঝড়ো, না হালকা—একধরনের আবেশী ধারা, যেন আকাশও সেদিন প্রেমে পড়েছে।
এক নির্জন পার্কের কোণে দাঁড়িয়ে ছিল সে—এক যুবক। চোখে ছিল কৌতূহল, অথচ মনের ভেতর কাঁপছিল কোনো অনুচ্চারিত কথা। তার দৃষ্টি আটকে ছিল একটি মেয়ের দিকে, যে বৃষ্টিতে মনের আনন্দ নিয়ে ভিজছিল, একা, চুপিসারে, নিঃশব্দে। মেয়েটির গায়ের পোশাক প্রায় ভিজে গিয়েছে, চুল জলে জড়িয়ে গেছে—তবু সে থামেনি, যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক অপার্থিব মায়াবী বন্ধনে সে জড়িয়ে আছে।
মেয়েটিকে, পার্কের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক আগে কখনো দেখেনি।
তবু কেন মনে হচ্ছিল! যেন বহুদিনের চেনা।
মেঘের মতো ধোঁয়াটে, অথচ অদ্ভুতভাবে আপন।
সে মেয়েটিকে ডাকে না।
তাকে বিরক্ত করতেও চায় না।
তবে তার চোখ সরাতেও পারে না। মেয়েটি যেন এক চলমান কবিতা, এক ছায়াময় সৌন্দর্য তার উপলব্ধিতে।
মেঘবালিকা হঠাৎ থেমে যায়। বৃষ্টির ফোঁটার নিচে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে চেয়ে দেখে ছেলেটার দিকে।
এক পলক।
তবু সেই দৃষ্টিতে ছিল সমুদ্রের গভীরতা।
কিছু না বলে, না হেসে, না কেঁদে, সে শুধু তাকিয়ে থাকে।
তখন যুবকের হৃদয়ের ভিতর বয়ে যায় ঝড়ো হাওয়া। তার মনে সাগরের জলরাশির মতে উতাল-পাতাল শুরু হয়ে যায়। মেঘবালিকার! চাহনির কি মায়াটা না কাজ করছে! সে আর নিজেকে থামাতে পারে না।
কোনো প্রস্তুতি ছাড়া, কোনো লজ্জা ছাড়াই সে বলে ফেলে—
"ভালোবাসি!"
সেই শব্দ যেন হারিয়ে যায় বৃষ্টির শব্দে।
তবু মেঘবালিকার চোখে খেলে যায় এক অমোঘ হাসি।
কোনো উত্তর দেয় না সে,
শুধু হাতটা সামান্য বাড়িয়ে দেয় বৃষ্টির নিচে...
এবং মুহূর্তেই তারা যেন এক হয়ে যায়—মেঘ, বৃষ্টি আর ভালোবাসার মাঝে।
সেদিন তাদের নাম জানা হয়নি।
কোনো কথা জমা হয়নি ফেসবুকে বা ফোনে।
তবু সেই মেঘময় বিকেল হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে সত্যি গল্প।
সেদিন চুপিসারে বৃষ্টিবিলাস করে আসার পর থেকে মেঘবালিকার মনে মেঘ জমে!
মেঘবালিকা! নাম তার সুনয়না।
নামটা রোদ্দুরের মতো হাস্যজ্জ্বোল হলেও সে বর্ষাকে ভালোবাসে। কারণ রোদের মতো হঠাৎ ঝলসে যাওয়ায় নয়, বর্ষা যেন তাকে ধুয়ে-মুছে দেয়, শান্ত করে।
সেই দিনটাও ছিল সুনয়নার প্রিয় এক বর্ষাময় দিন।
সকালেই বের হয়েছিল ছাতা ছাড়া। তার ধারণা—ছাতা বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতি থেকে দূরে রাখে।
তাই মাথা ভিজুক কিংবা না ভিজুক, তবু মন যেন এক ফসলা বৃষ্টির আনন্দে ভেজে—এই ছিল তার যুক্তি।
সে হাঁটছিল ধীর পায়ে। চারপাশে কেউ নেই, কেবল অদৃশ্য পাতার ফাঁকে বৃষ্টির বুনো সুর।
হঠাৎ তার মনে হলো, কেউ যেন তার দিকে অপলক দৃষ্ঠিতে তাকিয়ে আছে।
এবং তাকে দেখে ফেলেছে—দেখে ফেলেছে তার মেঘে হারিয়ে যাওয়া, তার অভিমান, তার নিঃসঙ্গতা।
পরক্ষনেই চোখ তুলে দেখল—এক যুবক, দূরে দাঁড়িয়ে।
চোখে ছিল কেমন এক চুপচাপ উন্মাদনা।
সুনয়না থেমে গেল, তাকাল এক পলক।
দেখল—চোখে তার ভয় নেই, সংকোচ নেই, কেবল সত্যি কথা বলার সাহস আছে।
তখনই শুনতে পেল সেই চিরচেনা আকুলময়ী শব্দ—
"ভালোবাসি!"
সুনয়না চমকে গেল না।
বিস্মিতও হলো না।
শুধু একবার নিজেকে জিজ্ঞেস করল—
“কেন যেন মনে হচ্ছে, এই কথাটা আমি বহু বছর ধরে শুনে আসছি? বহু জন্ম ধরে?”
সে কিছু বলল না।
তবে তার চোখে এক বিনয়ী হাসি খেলে গেল—
"তুমি বুঝেছো? আমি ভিজতে ভালোবাসি, কারণ কেউ আমার অশ্রু আর বৃষ্টির পার্থক্য করতে পারে না। আজ প্রথম কেউ পারলো।"
সে হাত বাড়াল।
যুবক এগিয়ে এল ধীরে, পা টিপে টিপে, যেন ভেঙে না ফেলে সেই ক্ষণটির জাদু।
সেই এক পলকের সম্পর্কের বীজ পুঁতেছিল ভালোবাসার জমিতে।
তারা তাদের মধ্যে কেউ কারো নাম জানেনি, ঠিকানা জানেনি।
তবু তাদের হৃদয় চিনে নিয়েছিল হৃদয়কে,বুঝে ফেলেছিল নিজেদের মনের অব্যক্ত অনুভূতি।
এরপরও তাদের মধ্যে কথা হয়ে ওঠে নি। দুজন দুই ভিন্ন পথে হেঁটে গিয়েছিল।
নাম না জেনে, কিছু না বলেই...
তবু তাদের হৃদয়ে সেই এক পলকের মুহূর্ত এমনভাবে গেঁথে ছিল যেন বহু বছরের বন্ধন।
সুনয়না, বাড়ি ফিরে আয়নায় নিজেকে দেখেছিল।
ভেজা চুল, লাজুক চোখ—কিন্তু মনে ছিল এক নতুন আলো।
প্রথমবারের মতো কেউ তার ভেতরের বেদনা পড়ে ফেলেছে, ভাষা ছাড়াই।
অন্যদিকে, সেই যুবক—নাম তার সুহৃদ—সারারাত ঘুমাতে পারেনি।
সে বুঝে গিয়েছিল, এ কোনো হঠাৎ আবেগ ছিল না।
সে মেয়েটিকে ভালবেসেছে, সেই প্রথম মায়বী দৃষ্টিতে।
পরদিন থেকে সে প্রতিদিন সেই পার্কে যায়।
আবার বৃষ্টি হলে, আবার যদি আসে মেঘবালিকা...
কিন্তু সে আর আসে না।
একদিন, দুদিন, এভাবে সাতদিন… সময় চলে যায়।
সুহৃদের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—
"আমি কি তাকে হারিয়ে ফেললাম? এই শহরে কোটি মানুষের ভিড়ে আমি কাকে খুঁজব?"
অপরদিকে সুনয়নাও! সুহৃদ কে ভুলতে পারেনি।
তার মনের গভীরে বসে আছে সেই এক পলক।
সে চুপচাপ তার ডায়েরির পাতায় লিখে রাখে সেদিনের অনুভবগুলো,
একটা পাতায় লেখে—
“যদি ফের দেখা হয়, আমি নাম জিজ্ঞেস করব। আর বলব, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”
একদিন! একটি নতুন সকালের আগমন ঘটল…
আকাশ আড়মোড়া ভাঙছে, মেঘ নেই।
কিন্তু সুহৃদের মন অস্থির।
সে আজও গেল সেই পুরনো জায়গাটায়—এমনকি বৃষ্টি না হলেও।
আর ঠিক তখনই—
পেছন থেকে এক নারীকণ্ঠ:
"তুমিই কি সেই পাগল যুবক, যে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ভালোবাসি বলেছিলে?"
সুহৃদের গাঁ কেঁপে উঠল।
সে ঘুরে দাঁড়ায়।
দেখে—তারা চিরচেনা সুনয়না দাঁড়িয়ে, চোখে সেই পুরনো মেঘ... কিন্তু এবার ঠোঁটে দোল খাওয়া মৃদু হাসি।
সুহৃদ ধীরে বলে—
“তুমিই কি সেই মেঘবালিকা?”
সুনয়না উত্তর দেয় না। শুধু এগিয়ে এসে বলে—
“আজ আর চুপ থাকব না। আমিও ভালোবাসি।”
তারা তখন জানত না, এই শহরে কোটি মানুষ থাকলেও, কেউ কেউ শুধু একটার জন্যই বেঁচে থাকে।
তাদের আবার দেখা হয়েছিল। এবার হারানোর নয়, থাকার গল্প শুরু হলো তাদের।
বাস্তবের আর মেঘের পুনর্মিলনের পর দিনগুলো যেন তাদের স্বপ্নের মতো কেটেছিল। সুহৃদ আর সুনয়না অবশেষে একে অপরের নাম জানল, পছন্দ-অপছন্দ, হাসি-কান্না, ছোট ছোট অভিমান।
বৃষ্টি এলেই তারা ছুটে যেত সেই পুরনো পার্কে—যেখানে ভালোবাসার গল্পের শুরু হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তব! তো কেবল প্রেমের জায়গা নয়।
তার পায়ে শিকল, হাতে নিয়ম, আর চোখে ঠান্ডা হিসাব।
সুনয়নার পরিবার রক্ষণশীল, বিয়ের ব্যাপারে তাদের নিজের পছন্দ আছে।
সুহৃদের নাম শুনেই তারা বলল,
“ভালোবাসা দিয়ে সংসার হয় না।”
তার চাকরি নেই, স্বপ্ন আছে, কিন্তু আয়ের পথ স্থির নয়।
অন্যদিকে, সুহৃদের বন্ধুরা তাকে উপহাস করে বলে,
“মেয়েটা তো একদিন ভিজে এসেছিল, তাই বলে জীবন ভিজিয়ে দেবে?”
তাদের প্রেমের মেঘে একটানা বৃষ্টি নামে—এবার আর শুধু প্রেমের নয়, চিন্তার, দুঃশ্চিন্তার, ভয় আর দ্বিধার বৃষ্টি।
এক সন্ধ্যায় কান্নার সুরে সুনয়না বলে ওঠে—
“সুহৃদ", যদি আমাকে নিয়ে তোমার স্বপ্ন ভেঙে পড়ে? যদি আমায় ধরে রাখার সাধ্য না থাকে?”
সুহৃদ চুপ করে থাকে, তারপর চোখে দৃঢ়তা এনে বলে—
“ভালোবাসা যদি হার মানে বাস্তবের কাছে, তবে সেটা কখনোই সত্যিকারের ভালোবাসা ছিল না।”
প্রতিজ্ঞা
এবার তারা দু'জনেই সিদ্ধান্ত নেয়—
কোনো পালিয়ে বিয়ে নয়, কোনো নাটক নয়।
সময় দেবে একে অপরকে গড়ে তোলার জন্য।
সুহৃদ চাকরির জন্য লড়াই করে।
সুনয়না, নিজের স্বাধীন মতামত গড়ে তোলে, পরিবারের সঙ্গে যুক্তি করে।
সময়ের ধৈর্য, বিশ্বাস আর একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা—
এই তিনে গড়ে ওঠে তাদের ভালোবাসার নতুন ভিত্তি।
তিন বছর পর...
এক বর্ষার দিনে, ঠিক সেই পার্কে, যেখানে তারা প্রথম দেখা করেছিল..!
সুনয়না, এসে দাঁড়ায় বৃষ্টিতে ভিজে।
হাতে ছিল ছাতা, কিন্তু খোলা ছিল না।
পেছন থেকে সুহৃদ এসে বলে—
“আজ ছাতা এনেছো, খোলো না কেন?”
সুনয়না হেসে বলে—
“কারণ আজ আমার চোখে আর অশ্রু নেই। শুধু বৃষ্টির ভালোবাসা।”
সুহৃদ একটি ছোট বাক্স বের করে বলে—
“তবে এবার আমি কিছু বলতে চাই... বৃষ্টির সঙ্গে তোমাকে চিরদিনের জন্য চাই।”
কিছুদিন পর পারিবারিক সম্মতিতে তাদের শুভক্ষণ সম্পন্ন হয়।বিয়ের পর তাদের জীবন যেন নতুন এক ঋতুর মতো।তাতে কখনো ঝলমলে রোদ, কখনো কালো মেঘ, আবার কখনো নিঃশব্দ বৃষ্টি।
সুহৃদ আর সুনয়না এখন একসাথে থাকে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে।
বড় কিছু না—আছে তাদের একটা বইয়ের তাক, একটা বারান্দা, আর মাঝখানে দুটো হাত, যা একে অপরকে ঠিক আগলে রাখে।
সুহৃদ এখন একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করে।
তার লেখা কবিতাগুলো আজ বই হয়ে বের হয়।
তার প্রকাশিত প্রথম বইয়ের নাম?
"মেঘবালিকা"।
অন্যদিকে সুনয়না এখন স্কুলে পড়ায়। শিশুদের শেখায়—
"ভালোবাসা মানে শুধু হৃদয় নয়, মাথাও।
ভালোবাসা মানে শুধু কথা নয়, অপেক্ষাও।"
তাদের ভালোবাসার গল্প আজ আর শুধু তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তাদের এক কন্যাসন্তান হয়েছে—নাম রেখেছে “মেঘলা”।
যেদিন মেঘলা জন্ম নেয়, আকাশে আবারও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ে।
সেদিন সুহৃদ মুচকি হেসে বলেছিল—
“আকাশও যেন চেনে আমাদের দিনটাকে।”
রাতে সুনয়না,তার মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলে—
“একদিন তুমি যখন বড় হবে, আমি তোমাকে সেই গল্পটা বলব…
যেদিন এক অচেনা যুবক আমাকে বৃষ্টিতে ভিজে বলেছিল—ভালোবাসি।”
সময় তার আপন গতিতে গড়িয়ে যায়।
"মেঘলা বড় হয়, তার চোখে মায়ের মেঘ, বাবার কবিতা।
এক সন্ধ্যায় সে জিজ্ঞেস করে—
“মা, বৃষ্টি মানে কী?”
সুনয়না একটা চুমু দিয়ে বলে—
“বৃষ্টি মানে শুধু জল না মা…
বৃষ্টি মানে একটা মুহূর্ত,
যা থেকে জন্ম নেয় চিরদিনের গল্প।”
লেখক : মুহাম্মদ সালমান।
বিবিএ (অনার্স)- ১ম বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।