মানুষ যতটা না নিজের পরিশ্রমে এগোয়, তার চেয়েও বেশি প্রভাব পড়ে—সে কাদের সাথে সময় কাটায়, কাদের কথা শোনে, আর কাদের মতামতকে মূল্য দেয়—তার উপর। একটা গাছ যেমন যত্ন, পানি আর আলো পেলে বড় হয়, ঠিক তেমনই মানুষের জীবনের শিকড়গুলো গড়ে উঠে সঙ্গদোষ বা সঙ্গগুণ থেকে। তবে একটা জিনিস আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—গাছের চারপাশে কখন যেন নিঃশব্দে গজিয়ে ওঠে আগাছা। সেগুলোরও শুরু হয় ধীরে ধীরে, কিন্তু একসময় তারাই মূল গাছটির খাবার কেড়ে নিতে চায়, এমনকি ছায়া পর্যন্ত কেড়ে নিতে পিছপা হয় না।
বন্ধুত্ব—এই শব্দটা শুনতে যতই মধুর হোক না কেন, এর গভীরতা এবং প্রকৃত রূপ বোঝা যায় কেবল সময়ের পরীক্ষায়। ঠিক যেমন বর্ষাকালে আগাছা গজিয়ে ওঠে চারদিকে, সুসময়েও তেমন কিছু মানুষ আমাদের জীবনে প্রবেশ করে। তারা আসে মুখে হাসি, হৃদয়ে স্বার্থ নিয়ে। আমরা যখন সফল, আমাদের নাম যখন আলোয় ভাসে, তখন আশেপাশে ‘বন্ধু’ নামধারীদের ভিড় লেগে যায়। কিন্তু এসব মানুষের বেশিরভাগই আগাছার মতো। সুসময়ের সঙ্গী, দুঃসময়ের নয়।
তারা কেবলই চায়—আপনার অর্থ, আপনার খ্যাতি, আপনার সুযোগ-সুবিধা। যখন তাদের প্রয়োজন মিটে যায়, তখন তারা উধাও হয়ে যায়। ঠিক যেমন খরার মৌসুমে আগাছাগুলো শুকিয়ে যায়, গাছটিকে একলা ফেলে রেখে। আপনাকে যারা ভালোবাসে, তারা কেবল সুখের সময় নয়—কষ্টের সময়েও পাশে থাকে। আর বাকিরা? তারা মৌমাছির মতো—ফুলের মধু খেয়ে চলে যায়।
সামাজিক বাস্তবতায় বন্ধুত্বের রূপ
সমাজে বসবাস করতে হলে আমাদের সম্পর্ক গড়তেই হয়। শৈশব থেকে আমরা বন্ধু বানাই, সহপাঠী, প্রতিবেশী কিংবা খেলাধুলার সঙ্গী। কিন্তু একটা বয়সে গিয়ে আমরা বুঝতে পারি—সব বন্ধু বন্ধু নয়। কেউ কেউ মুখে বন্ধুত্বের বুলি আউড়ে আমাদের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
একটি মেডিকেল কলেজের ছাত্র তার বন্ধুকে ঘুমের ওষুধ মেশানো মাদক খাইয়ে হত্যা করেছিল—শুধু টাকার জন্য! এমন বাস্তব ঘটনা শুনলে শরীর শিউরে ওঠে। আরেকটি মা, নিজের নেশাগ্রস্ত ছেলেকে হত্যা করতে কিলার ভাড়া করেছিল—কারণ, সেই ছেলে মায়ের উপর প্রতিনিয়ত নির্যাতন চালাত মাদক কেনার টাকার জন্য। এক সময় মা বুঝে গিয়েছিলেন—এই সন্তানকে আর ফেরানো যাবে না। সমাজে এমন নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—মাদক ও খারাপ সঙ্গ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে।
বন্ধু বেছে নেওয়ার বুদ্ধি
ভালো বন্ধু একজনই যথেষ্ট—সে হাজার জনের চেয়েও বেশি মূল্যবান। কারণ, ভালো বন্ধু কখনোই আপনাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে না। সে আপনার ভালো চায়, আপনার উন্নতি চায়। কিন্তু আজকের সমাজে দেখা যায়—যেসব তরুণ-তরুণীর বন্ধু বেশি, তাদের অনেকেই মাদকের পথে ঝুঁকে পড়ে। কারণ দলবদ্ধভাবে করা হয় এমন অনেক অপরাধ—যেমন ছিনতাই, চুরি, বা মাদক পাচার—যার পিছনে থাকে ‘বন্ধুদের’ প্ররোচনা।
একজন মানুষ একা একা নেশায় জড়ায় না। প্রথমে একজন ‘বন্ধু’ তাকে একবার চেখে দেখতে বলে, তারপর দ্বিতীয়বার, তারপর সে নিজেই নেশার গোলাম হয়ে যায়। তাই, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর শুরুতে থাকে ভুল বন্ধুর হাত।
বাবা-মা: জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধু
অনেকেই ভাবে—বাবা-মা তো শুধু শাসনই করে, বন্ধুত্ব কেমন করে হবে? কিন্তু বাস্তবে, বাবা-মা এমন এক আশ্রয়, যারা আপনার দুঃখ-ব্যথা কাঁধে তুলে নিতে কখনো পিছপা হন না। যদি পরিবারে বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক হয় বন্ধুত্বপূর্ণ, তাহলে সন্তানদের আর বাইরের অন্ধকার সঙ্গ খুঁজতে হয় না।
দুঃখজনকভাবে, আজও অনেক পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে শুধুই কর্তৃত্বের সম্পর্ক। সন্তান ভয় পায় কিছু বলতে, প্রেমের কথা তো দূরের কথা, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা করতে পারে না। এই মানসিক দূরত্বই অনেক সময় সন্তানকে ঠেলে দেয় ভুল পথে।
একটি কাহিনি এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যাক—করিম নামের একটি ছেলে, যার পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত এবং রক্ষণশীল। সে এক মেয়ের সাথে প্রেমে পড়ে, কিন্তু বাবা-মাকে বলতে সাহস পায় না। শেষে যখন জানায়, তারা রেগে গিয়ে পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। করিম মেনে নেয় বাবা-মার সিদ্ধান্ত, কিন্তু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এরপর সে নেশায় জড়িয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় নিজের জীবনের মূল পথ থেকে। শুধু যদি তার বাবা-মা একটু শুনতেন, একটু বন্ধুর মতো আচরণ করতেন—তাহলে হয়তো করিম আজ অন্যরকম হতো।
আপনার চারপাশে অনেক মানুষ আসবে, অনেকেই আপনার বন্ধু সেজে কাছে আসবে। কিন্তু তাদের সবাই আপনাকে ভালোবাসে না, সাহায্য করতে চায় না। তাদের অনেকেই আপনাকে ব্যবহার করতে চায়। তাই বন্ধু নির্বাচনে হতে হবে বুদ্ধিমান। অল্প কিন্তু বিশ্বস্ত বন্ধু রাখুন, অন্ধ বিশ্বাসে কাউকে কাছে টানবেন না। আর কখনোই ভুলে যাবেন না—আপনার সবচেয়ে বড় বন্ধু, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো আপনার বাবা-মা।
সাফল্যের পথে হাঁটতে চাইলে আগে নিজেকে এই আগাছা বন্ধুত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে। তবেই সত্যিকারের আলোয় পৌঁছানো সম্ভব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।