আমরা সবাই জীবনে এগিয়ে যেতে চাই। চাই সফল হতে, কিছু করে দেখাতে। কিন্তু এই পথ চলার সময় আমরা অনেক সময় এক ভুল করি—আমরা প্রভাবিত হয়ে যাই। কোনো মানুষ, কোনো মতবাদ বা কোনো কাজ এতটাই আমাদের ওপর ছাপ ফেলে দেয় যে আমরা নিজের চিন্তাশক্তিকে একপ্রকার বন্ধ করে দিই। অথচ, সফলতার পথ একেবারেই ভিন্ন—সেখানে প্রভাব নয়, দরকার উৎসাহ, উদ্দীপনা আর নিজস্ব বোধের জোর।
এই বিশ্বে কিছুই চিরস্থায়ী নয়
এই মহাবিশ্বে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। কোনো মানুষ, কোনো চিন্তা বা কোনো দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই চিরস্থায়ী নয়। একজন ব্যক্তি হয়তো এক সময়ে সমাজের জন্য দারুণ অবদান রেখেছেন, কিন্তু তার প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি পথ কি আজকের দিনে এসে অক্ষত রইলো? না। সময়ের সাথে অনেক কিছুই বদলায়।
আমরা যদি মনে করি, কোনো একজন ব্যক্তিই সর্বশ্রেষ্ঠ, তার মতামতই শেষ কথা, তাহলে আমরা নিজের চিন্তাভাবনাকেই বেঁধে ফেলছি। তখন নতুন কিছু ভাবা বা সৃষ্টি করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অনুপ্রেরণার শক্তি সীমাহীন
প্রভাবিত হওয়া মানে নিজেকে কারো ছায়া বানিয়ে ফেলা। কিন্তু উৎসাহিত হওয়া মানে নিজে আলো হয়ে জ্বলে ওঠা। ধরুন, আপনি জন কিটসের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হলেন। আপনি যদি প্রভাবিত হন, তাহলে আপনি বারবার কিটসকেই অনুকরণ করতে থাকবেন। কিন্তু আপনি যদি কিটসের সৌন্দর্যবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত হন, তাহলে আপনি নিজস্ব ভঙ্গিতে আরও নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন।
অনুপ্রেরণা মানুষকে ভাবায়, চেতনায় আলো জ্বেলে দেয়। প্রেরণা থেকেই নতুন সৃষ্টির জন্ম হয়। একজন মানুষ যখন কারো ভালো কাজ দেখে উদ্দীপ্ত হয়, তখন সে ভাবে—"আমি আমার মতো করে আরও ভালো কিছু করবো।"
প্রভাবিত হলে কী হয়?
প্রভাবিত হওয়া অনেকটা নেশার মতো। আপনি যখন কোনো একটি মত বা ব্যক্তির প্রভাবে আচ্ছন্ন থাকেন, তখন আর কোনো নতুন ধারণা আপনার মন ছুঁয়ে যেতে পারে না। আপনি ভাবতে শুরু করেন, "এই একজনই ঠিক, বাকিরা কিছুই না।"
আমার এক শিক্ষক ছিলেন, যিনি এতটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রেমে মগ্ন ছিলেন যে মনে করতেন—বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ নেই। যেকোনো সাহিত্যচর্চা নিয়েই কথা বললেই তিনি রবীন্দ্রনাথের রচনার দিকে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি আধুনিক কবিদের কথা শুনতেই চাইতেন না। এমনকি পড়েও দেখেননি, অথচ আগে থেকেই বলে দিতেন: "ওসব ছাইপাঁশ।"
একসময় সেই শিক্ষককেই দেখেছি জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে এমন মোহে ডুবে গেছেন যে তিনি বলছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে কেবল বনলতা সেনই প্রেমের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। তিনি হয়তো আর নতুন কিছু কবিতা খুঁজেই দেখেননি।
বিচার বিবেচনার জায়গা থেকে গ্রহণ করা জরুরি
যখন আমরা কোনো বিষয় বা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হই, তখন সেটি যাচাই না করেই গ্রহণ করি। এখনকার প্রজন্মের অনেকেই পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতি এতটা প্রভাবিত যে তাদের পোশাক, আচরণ, কথা বলার ধরণ—সব কিছুতেই সেই সংস্কৃতির ছাপ। কিন্তু তারা যদি উৎসাহিত হতো, তাহলে খারাপগুলো বর্জন করে ভালো দিকগুলো গ্রহণ করতে পারত। সেটিই হতো সচেতনতার পরিচায়ক।
উৎসাহ মানে হলো নির্বাচন করার অধিকার থাকা। প্রভাব মানে সেই অধিকারটিকে হারিয়ে ফেলা।
সফল হতে চাইলে প্রেরণার পথেই হাঁটতে হবে
মুসা ইব্রাহিম যখন এভারেস্ট জয় করলেন, নিশ্চয়ই তিনি কারো সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই প্রেরণাই তাকে সাহস জুগিয়েছে, মনোবল দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে। কিন্তু যদি তিনি কেবল কারো মতো হবার দুঃস্বপ্নে ডুবে থাকতেন, তাহলে হয়তো নিজের স্বপ্নটাই ভুলে যেতেন।
তেমনি, পৃথিবীর যেসব মানুষ সত্যিকারের সফল হয়েছেন, তারা কখনোই চোখ বন্ধ করে কোনো কিছুকে অনুসরণ করেননি। তারা ভাবেন, বিচার করেন, এবং নিজেদের মতো করে পথ তৈরি করেন। আর সেটাই সফলতার আসল পথ।
শেষ কথায় এসে বলবো—
সাফল্যের পথে প্রভাব নয়, প্রেরণাই হোক পথপ্রদর্শক। উৎসাহ আমাদের ভাবনায় গতি আনে, কর্মে উদ্যম আনে, নতুন কিছু গড়ার সাহস দেয়। আমরা আমাদের আদর্শ মানুষদের ভালো দিক থেকে প্রেরণা নেবো, কিন্তু কোনো কিছুর অন্ধ অনুসারী হবো না।
আমরা চলবো নিজের চিন্তা, বোধ ও বিবেচনার আলোকে। কারণ সফল হতে হলে নিজস্ব পথেই হাঁটতে হয়। অন্যের ছায়ায় থেকে আলো পাওয়া যায় না। সত্যিকারের সাফল্য আসে তখনই, যখন আমরা নিজের মতো করে গড়ে উঠি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।