বর্তমানে মহাকাশে পাঠানো মানব জাতির সবচেয়ে দূরবর্তী এবং নতুন ইতিহাস সৃষ্টিকারী কোন অবজেক্ট বা স্পেস-প্রোব হচ্ছে ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোব। এটি আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ১৯৭৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর আমেরিকার কেপ কানাভেরাল (এলসি-৪১) রকেট লঞ্চ প্যাড থেকে হেভি টাইটান-৩ই (Titan IIIE) রকেট দ্বারা উৎক্ষেপণ করে।
আজ ২০২৫ সালের ১২ই এপ্রিল পর্যন্ত ভয়েজার-১ ইতোমধ্যেই প্রায় ৪৭ বছর ৭ মাস ৬ দিন যাবত অসীম মহাশূন্যে প্রতি ঘণ্টায় ৬১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার গতিতে ভ্রমণ করছে। এটি বর্তমানে পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫.০৪ বিলিয়ন কিলোমিটার কিংবা ১৬৬.২৮৬ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরত্বে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে তারার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করছে।
এটি হচ্ছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী স্থানে পাঠানো মানবসৃষ্ট কোন অবজেক্ট বা স্পেস প্রোব। যা কিনা গত ২০১২ সালে হেলিওপজ (আমাদের সৌরজগতের সীমানা) অতিক্রম করে এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক চৌম্বক ক্ষেত্র এবং কণা সম্পর্কে অজানা তথ্য পাঠাতে থাকে। তাছাড়া এটি এখনো পর্যন্ত আমাদের সোলার সিস্টেম এবং আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাশূন্যের অজানা তথ্য উপাত্ত নাসার স্পেস কমান্ড সেন্টারে ডিপ স্পেস নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের মাধ্যমে পাঠিয়ে যাচ্ছে।
১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরুর পর ভয়েজার-১ স্পেস প্রোব গত ১৯৭৯ সালের ৫ই মার্চ প্রায় ৩ লক্ষ ৪৯ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে জুপিটার গ্রহকে ফ্লাই বাই করে চলে যায়। তাছাড়া তার পরের বছর ১৯৮০ সালের ১২ই নভেম্বর ১ লক্ষ ২৪ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে শনিগ্রহ এবং একই দিকে মাত্র ৬ হাজার ৪৯০ কিলোমিটার দূর থেকে শনির চাঁদ টাইটানকে ফ্লাই বাই করে চলে যায়। এ সময় অনেক মূল্যবান ছবি ও তথ্য পৃথিবীতে প্রেরণ করে এটি।
গত ২০২৩ সালে ১৪ই নভেম্বর ভয়েজার-১ হঠাৎ করেই কোন এক অজানা কারণে কিংবা কারিগরি ত্রুটি জনিত কারণে নাসার স্পেস সেন্টারে তথ্য প্রেরণ করা বন্ধ করে দেয়। খুব সম্ভবত স্পেস প্রোবের ফ্লাইট ডেটা সিস্টেমে ত্রুটির কারণে এটির সাথে একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফ্লাইট ডেটা সিস্টেমের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা স্পেস প্রোবের সকল বৈজ্ঞানিক ডিভাইস এবং সেন্সরের তথ্যাদি জানতে পারেন।
তবে আশার কথা হলো যে, নাসার বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত চেষ্টার পর গত ২০শে এপ্রিল ভয়েজার-১ আবারো নতুন করে তথ্য উপাত্ত পাঠাতে শুরু করে। যাকে নাসার বিজ্ঞানীরা এক মাইলফলক অর্জন হিসেবে বিবেচনা হয়। নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, মানব জাতির তৈরি ভয়েজার-১ স্পেস প্রোবের পাওয়ার ব্যাংক চলতি ২০২৫ সালের কোনও একসময় হয়ত চিরতরে কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে।
তবে ভয়েজার-১ এর সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও আসীম সময় ব্যাপী মহাশূন্যে এর যাত্রা অব্যাহত থাকবে। হয়ত কোন এক সময় আমাদের পার্শ্ববর্তী 'আলফা সেন্টরাই' সোলার সিস্টেম বা অন্য কোন নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে এটি। এই স্পেস প্রোবের বয়স প্রায় ৪৭ বছর অতিক্রম করলেও এটি কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে এখনো পর্যন্ত সচল রয়েছে এবং নাসার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে।
ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভয়েজার-১ স্পেস প্রোব নাসা মহাকাশে প্রেরণ করলেও এটি মূলত ডিজাইন ও তৈরি করে আমেরিকার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি। ৭২১.৯ কেজি ওজনের এই স্পেস প্রোব তৈরিতে মোট ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে নাসা। যা কিনা বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় ৬১,৫০০ কিলোমিটার গতিতে সোলার সিস্টেমের সীমানা অতিক্রম করে এক অজানা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে ভ্রমণ করছে।
দীর্ঘ সময় ব্যাপী শক্তি উৎপাদন এবং যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোবে একটি শক্তিশালী প্লুটোনিয়াম রেডিও অ্যাক্টিভ আইসোটোপ পাওয়ার জেনারেশন সিস্টেম ইনস্টল করা হয়। যা কার্যত ৪৭০ ওয়াটের এনার্জি/পাওয়ার জেনারেট করে। তবে দীর্ঘদিন হয়ে যাওয়ায় এর পাওয়ার জেনারেট সক্ষমতা এখন অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও বাস্তবে এটি কিন্তু আজও সচল রয়েছে।
ভয়েজার-১ স্পেস প্রোবে মানব জাতির ইতিহাস ও তথ্য সমৃদ্ধ একটি গোল্ডেন রেকর্ড স্থাপন করা হয়। যা কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ল সাগানের নেতৃত্বে একটি কমিটি নাসার জন্য গোল্ডেন রেকর্ডের বিষয়বস্তু নির্বাচন করেছে। আসলে ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডস হল একটি ফোনোগ্রাফ রেকর্ড। যাতে পৃথিবীতে টিকে থাকা মানব জাতির জীবন এবং সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে তুলে ধরতে নির্বাচিত কিছু শব্দ ও চিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিজ্ঞানীরা আসলে ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডকে উন্নত কোন এলিয়েন লাইফ কিংবা বুদ্ধিমান বহির্জাগতিক প্রাণের উদ্দেশ্যে করে তৈরি করেছিলেন। বিশেষ করে ভবিষ্যতে ভয়েজার-১ এর গোল্ডেন রেকর্ডস খুঁজে পেলে হয়ত উন্নত কোন সভ্যতা মানব জাতির অস্তিত্ব এবং পৃথিবী গ্রহ সম্পর্কে জানতে পারবে। এই ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডস-কে আবার একটি টাইম ক্যাপসুল বলা হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, ভয়েজার-১ স্পেস প্রোব আসলে কোনো সুনির্দিষ্ট সোলার সিস্টেমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না। তবে এটি আজ থেকে আনুমানিক ৪০ হাজার বছরের মধ্যে হয়ত বর্তমানে ক্যামেলোপার্ডালিস নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত গ্লিস-৪৪৫ নক্ষত্র থেকে ১.৬ আলোক বর্ষ দূরত্ব পর্যন্ত অতিক্রম করবে। যাকে মানব জাতির মহাকাশ গবেষণায় একটি মাইলফলক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র : নাসা, উইকিপিডিয়া, স্পেস ডট কম, সায়েন্স।
সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman), শিক্ষক এবং লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ। [email protected]
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।