মহাবিশ্ব
সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করতে গত ২০২৩ সালের ১লা জুলাই মহাকাশে এক অতি উচ্চ প্রযুক্তির শক্তিশালী ‘ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ’ প্রেরণ করে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি (ইএসএ)। মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস লঞ্চ প্যাড থেকে স্পেস এক্স এর ফ্যালকন ৯ রকেটের সাহায্যে এই শক্তিশালী স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। এই মিশনের নাম দেওয়া হয় “ইএসএ ইউক্লিড মিশন”।
বর্তমানে এই মিশনে যৌথভাবে কাজ করছে আমেরিকার মহাকাশ সংস্থা (এনএএসএ) এবং ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি (ইএসএ)। ইউক্লিড টেলিস্কোপের মূল অপারেটর ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি হলেও এটি ডিজাইন ও ম্যানুফ্যাকচারিং করে থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস (মেইন) এবং এয়ারবাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস (পে-লোড মডিউল)। ৬ বছর মেয়াদি এই স্পেস টেলিস্কোপ ডিজাইন ও তৈরি করতে ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সি মোট ৬০৬ মিলিয়ন ইউরো বা ৬৫৪.৬৩ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে।
৮৫৫ কেজি ওজনের ‘ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ’ মহাকাশে প্রেরণের পর থেকে অত্যন্ত দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করা মিলিয়ন মিলিয়ন গ্যালাক্সির ছবি তুলে এই সুবিশাল মহাবিশ্বের একটি নিখুঁত ত্রিমাত্রিক মানচিত্র বা থ্রিডি ম্যাপ তৈরির কাজ শুরু করে। এই টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের থ্রিডি মানচিত্রের প্রথম অংশ হিসেবে প্রায় ১৪ মিলিয়ন গ্যালাক্সি এবং প্রায় ১০০ মিলিয়ন অন্যান্য আলোর উৎস শনাক্ত করেছেন। যা কিনা এই উচ্চাভিলাষী মহাকাশ থ্রিডি ম্যাপিং প্রকল্পের প্রায় ১% সম্পন্ন করা হয়েছে বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা।
বর্তমানে ‘ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপ’ পৃথিবী থেকে ১৭ লক্ষ ৮০ হাজার কিলোমিটার দূরে মহাকাশে স্থাপন করা হয়েছে এবং এটি মহাকাশে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লক্ষের অধিক মহাজাগতিক অবজেক্টের ইমেজ ধারণ করে নিখুঁতভাবে থ্রিডি ম্যাপিং করছে। আর আগামী ৬ বছর ব্যাপী এটি রাতের আকাশের আরও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ স্থানের ইমেজ ধারণ করে মহাবিশ্বের একটি আনুমানিক ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করবে। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হয়ত এটি আনুমানিক প্রায় ১০০ কোটি গ্যালাক্সির ইমেজ ক্যাপচার করতে সক্ষম হবে।
যা কিনা মহাকাশের দক্ষিণ আকাশে ২০৮ গিগা-পিক্সেলের ১৩২ বর্গ ডিগ্রি এলাকা জুড়ে কভার করে। ইউক্লিডের নতুন আবিষ্কৃত এসব গ্যালাক্সির বয়স হতে পারে হয়ত প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর বা তার অধিক। তাছাড়া এর ৬০০ মেগাপিক্সেলের শক্তিশালী ক্যামেরার সাহায্যে অবিশ্বাস্যভাবে লক্ষ লক্ষ গ্যালাক্সি এবং অজানা আলোর উৎসের ইমেজ ক্যাপচার করা হয়েছে।
বর্তমানে মোজাইকের খুব গভীরে জুম করে (সম্পূর্ণ দৃশ্যের তুলনায় ৬০০ গুণ বড় করা হয়েছে) একটি সর্পিল ছায়াপথের জটিল কাঠামো খুবই স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যাকে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার বা অর্জন বলেই মনে করছেন তাঁরা।
শক্তিশালী ইউক্লিড স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে আগামী ৬ বছরের মধ্যে এই দৃশ্যমান সুবিশাল মহাবিশ্বের একটি আনুমানিক থ্রিডি ম্যাপ তৈরি করা সম্ভব বলে আশা করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা এই থ্রিডি ম্যাপের সাহায্যে বর্তমানে মহাকাশে লুকিয়ে থাকা অতি রহস্যময় এবং অদৃশ্য শক্তির ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানীর মনে করেন যে, ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি নামক কথিত এই দুই মহাজাগতিক অদৃশ্য শক্তি সুবিশাল মহাবিশ্বের আকার ও বিস্তৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
যদিও বিজ্ঞানীরা ব্যাপক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এখনো পর্যন্ত মহাবিশ্বের এই রহস্যময় দুটি শক্তির কোন চিহ্ন কিংবা অস্তিত্বই শনাক্ত করতে পারেননি। এমনকি মহাবিশ্বের ৬৮% ডার্ক ম্যাটার এবং ২৭% ডার্ক এনার্জি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও বিজ্ঞানীরা কিন্তু এখনো পর্যন্ত এই দুই অদৃশ্য শক্তি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। আর অবশিষ্ট মাত্র ৫% হচ্ছে বাকি গ্যালাক্সি, নেবুলা, গ্রহ, উপগ্রহ, গ্যাস, ধুলোবালি, গ্রহ এবং অন্যান্য দৃশ্যমান মহাজাগতিক অবজেক্ট। তবে এটি কিন্তু বিজ্ঞানীদের করা একটি আনুমানিক ধারণা বা প্রেডিকশন মাত্র।
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা ইউক্লিডের তৈরি করা থ্রিডি ম্যাপ স্টাডি ও পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে চেষ্টা করবেন যে, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি আসলে কি এবং আমাদের এই সুবিশাল মহাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণে সময় ও স্থানের ওপর কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। যদিও তাদের এই গবেষণা এখনো পর্যন্ত একেবারেই প্রাথমিক স্তরে রয়েছে এবং মহাবিশ্বের একটি আনুমানিক থ্রিডি ম্যাপিং এর প্রজেক্ট সম্পন্ন হলে তাঁরা এই অদৃশ্য মহাজাগতিক শক্তির প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করতে পারবেন বলে প্রবলভাবে আশাবাদী।
সিরাজুর রহমান (Sherazur Rahman), শিক্ষক এবং লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।