বুক রিভিউ -১
বই : মিস্টিরিয়াস মুসা
লেখক : আবু আনাস
প্রকাশকাল : ২০২০
রিভিউয়ার : মোঃ মেহেদী হাসান ✍️ ( Prince Frerase )
( লেখাতে অনেক বানান ভুল হতে পারে যেহেতু অনেক তাড়াতাড়ি লেখেছি )
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
বইটই আ্যপ থেকে আমি ইবুক কিনেছিলাম দুপুরবেলা, এইমাত্র পড়া শেষ করলাম। এখন পয়েন্ট এতে আসি -
লেখক বইটার মূল চরিত্র মূসাকে হয় তো হুমায়ন আহমেদের বিখ্যাত চরিত্র ' হিমুর ' আদলে সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। মূসাকে হিমুর ইসলামিক ভার্শন বললেও ভুল হবে না।
আমি প্রথমে ভেবে ছিলাম যে বইটা হয় তো প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ বইটার মতো বিভিন্ন পার্টের গল্প আকারে জবাব দেওয়া হবে কিন্তু এখন দেখি যে বইটা উপন্যাস আকারে লেখা। ইসলামি মতাদর্শ এর উপর লেখা সাহিত্য বই । বইয়ের নাম মিস্টেরিয়াস মূসা হলেও লেখক তার বইয়ের মূল চরিত্র মূসা আহমাদকে কতটুকু মিস্টেরিয়াস করতে পেরেছে সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। বইয়ের শুরুতে একজন নাস্তিক ছেলের সাথে কথোপকথন দেখান হয় যেখানে " গাড়িতে উঠার সময় যে দোয়া পড়া হয় সেটা কেন পড়তে হয়? এর পিছনে লজিক কি? " এরকম আরও যে দোয়া দরুদ আমরা পাঠ করি সেগুলো পড়ার কারণ কি? বলা হয় যে এসব পড়লে আমাদের রক্ষা করা হয়, যেমন গাড়িতে দোয়া পড়ে উঠলে নাকি দূর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, তবে অনেক অমুসলিম যে এসব পড়ে না তাহলে তারা রক্ষা পায় কি করে? ( এরকমও টাইপেের প্রশ্নই করে সুরুজ আলি নামক চরিত্র ) কিন্তু লেখক তার চরিত্র মূসাকে দিয়ে তার শক্তিশালী কোনো জবাব দিতে পারে নি। যে কথাগুলো বলেছে আর যে যুক্তি দেখিয়েছে তা মূল প্রশ্নের সাথে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে আমার। তবে মুসলিম ভিউ থেকে প্রশ্নতার জবাব ঠিক ছিল তবে কোনো নাস্তিক সংশয়বাদীর জন্য সে জবাবটা...... ।
তারপরে লেখক তার চরিত্রকে নিয়ে চলে যায় শৈশব কালে এবং সেখানে মূসা আহমাদ এর বাবা কি করে সংশয়বাদী হয়েছিল একইসাথে মূল চরিত্র কি করে বড় হলো সেটারও একটা দৃশ্যপট অঙ্কন করে। এখানে একটা মজার বিষয় হলো মূসার মা যখন মারা যাবে তার কয়েকদিন আগে মূসা ও জরিনা নামক একটা মেয়ের বিয়ে দেখান হয় ( বাল্যবিবাহ) পরবর্তীতে জরিনার পরিবার ঢাকার শহরে চলে যায় মূসাকে রেখে...
তারপর লেখক বর্তমান সময়ে ফিরে আসে। এইখানে মূসার সাথে তার বাল্য বয়সে ( কথিত) বিয়ে হওয়া বউয়ের সাথে পরিচয়ের বিষয়টা দেখান হয়। গল্পে রোমান্টিকতা নিয়ে আসার চেষ্টা করা হলেও লেখক তা করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করি।
বইতে আমি অনেক অসঙ্গতি লক্ষ্য করি, যেমন -
১. লেখক তার বইয়ের এক জায়গাতে বলে যে ( আফরিনা ও মূসার কথোপকথন এতে পেয়ে যাবেন) -
" সাধারণ যুক্তি বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা এটা জানি যে শরীল ও মুখমন্ডল দর্শনই হলো ধ র্ষ - ণে র অন্যতম প্রধান কারণ... "
সিরিয়াসলি! শরীল আর মুখ দেখেই যে কেউ একটা মেয়েকে...? সে বিজ্ঞানের নামে একটা কথা বলেছে তবে সেটার কোনো রেফারেন্সও উল্লেখ করে নি , তিনি বিজ্ঞানের নামে এরকম কথা বলেছে, তো তার কি উচওত ছিল না পিওর রিভিউ জার্নাল এর রেফারেন্স দেওয়া? । ( উল্লেখ্য যে শরীল ও মুখ দেখেই কোনো নারীকে ধর্ ষণ করা কোনো মূখ্য কারণ নয়...)
২. তারপরের লাইন এতে আবার তিনি বলেন যে -
"বিশ্বের সবচেয়ে কম ধ র্ষ ণ হয় সৌদিতে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আমেরিকায়। পরিসংখ্যন বলছে আমেরিকাতে ধর্ষণের হার ৯১% । "
লেখক এটারও কোনো রেফারেন্স উল্লেখ করে নি। আমি ফ্যাক্ট চেকিং করে যে তথ্য পাই তা হলো -
আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি” কথাটাও সঠিক নয়। UNODC-এর পুরোনো আন্তর্জাতিক তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কয়েকটি দেশের নথিভুক্ত ধর্ষণের হার অনেক বেশি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার হার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ আমেরিকার চেয়ের অন্য দেশে এর হার বেশি।
এছাড়াও আমেরিকাতে এর হার ৯১% এটাও ভূয়া তথ্য এবং একটা ভুল ইনফরমেশন।
একটি মার্কিন Bureau of Justice Statistics-এর গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, reported rape victims-এর প্রায় ৯১% নারী এবং ৯% পুরুষ ছিল। অর্থাৎ:
৯১% = ভুক্তভোগীদের মধ্যে নারীর অনুপাত-
এটা “৯১% আমেরিকান ধর্ষণের শিকার” বা “আমেরিকায় ধর্ষণের হার ৯১%” নয় ...... । লেখক দুটো বিষয়কে এক করে ফেলেছে।
৩. লেখক বই এতে বলে যে " চারটা হাইড্রোজেন পরমানু নিউক্ললীয়ভাবে আবদ্ধ হয়ে দুটো হিলিয়াম অনুতে পরিণত হয়। একে বলে ফিউশন প্রক্রিয়া"
কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। মূল ধারণাটা ঠিক, কিন্তু “দুটো হিলিয়াম অণু” কথাটা ভুল।
সূর্যের মতো নক্ষত্রে প্রধানত চারটি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস মিলিত হয়ে শেষ পর্যন্ত একটি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস তৈরি করে।সহজভাবে ৪টি হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াস → ১টি হিলিয়াম-৪ নিউক্লিয়াস + শক্তি। আর এখানে “হিলিয়াম অণু” নয়, হিলিয়াম নিউক্লিয়াস বলা হবে। কারণ অণু হলো একাধিক পরমাণুর রাসায়নিক বন্ধনে গঠিত বস্তু, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বিষয়টি ঘটে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে।
এছাড়াও নাস্তিকদের প্রশ্নের জবাবে যে বইগুলো লেখা হয় সেগুলোকে অনেক সময় এক পাক্ষিক জবাব আসে। এই বই এতেও সেরকম একটা পয়েন্ট লক্ষ্য করলাম তা হলো -
' স্রষ্টাকে দেখি না তাই বিশ্বাস করি না '
নাস্তিকদের সাথে এই বিষয়টা আমাদের বঙ্গ দেশে যতটা সরলীকরণ করে দেখান হয় বিষয়টা ততটাও সরল নয়। আপনি একজন ইউরোপিয়ান ইন্টেলেকচুয়াল এথিস্ট এর সাথে ডিসকাস করবেন তখন বুঝতে পারবেন যে " তারা কখনো স্রষ্টাকে দেখি না তাই বিশ্বাস করি না.. " এরকম আলগা যুকক্তি প্রয়োগ করে স্রষ্টার অস্তিত্ব নাকচ করে না। মূলত আমাদের বঙ্গীয় আরজ আলির মতো নাস্তিকদদের আলগা যুক্তির জবাবেই কিছু যুক্তি নিয়ে আসা হয়।
আমার কাছে আরেকটা জিনিস একটু বিরক্তকর লেগেছে ( সব জায়গায় না তবে এক জায়গায়) তা হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে লেখতে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক অতিরিক্ত তথ্য দেওয়া। লেখক তার বই এতে শেষের দিকে ব্লাক হোল কি এরকম একটা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ব্ল্যাকহোল এর নাড়ী নক্ষত্রের অবতারণা করেছে যা দরকার ছিল না, আর এখানে আরেকটা বিষয় দৃষ্টিকটু হয় তা হলো - গল্পের নাস্তিক মাসুদ এর বাবা নিজেও বিজ্ঞানের মাধ্যমিক ছাত্র ছিল, তো সে বিজ্ঞানের সাধারণ ছাত্র হয়ে ব্ল্যাকহোক কি সেটা বুঝতে না এটা কি করে হয়? কিন্তু লেখক.... ।
যাইহোক মোটাদাগে যদি বইটা সম্পর্কে বলি তাহলে বলব যে -
লেখক সামান্য কয়েকটা বিষয়ের প্রশ্নের জবাবই দিয়েছে গল্পের মাধ্যমে ( মোটাদাগে চারটা জবাব) আর এটাকে প্যারাডক্সিক্যাল বইয়ের মতো মনে করলে তা ভুল হবে বরং সাধারণ তো হিমু চরিত্রকে কেন্দ্র করে সেই ধাঁচের একটা ইসলামি সাহিত্য।
লেখক এক সাথে অনেক কিছু নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে আর প্লট ঠিক রাখার জন্য একটু বেশিই পরিশ্রম করেছে ( যদিও এখানে প্রশ্ন থেকে যায়) ।
পার্সোনালি আমার কাছে বইটা খুব একটা ভালো লাগেনি। তবে কেউ যদি ইসলামিক সাহিত্য উপন্যাস হিসাবে পড়তে চান এবং গল্পের মাঝে একটু সংশয়বাদী জবাব চান তাহলে এটা পড়তে পারেন।
পার্সোনাল রেটিংস : ৪/১০
[ একটা কথা বলে রাখি যে এসব বিষয়ে নিয়ে আমি আগে থেকেই প্রচুর বই পত্র পড়েছি তাই আমার কাছে নতুন করে এই বই তেমন ভালো লাগেনি। আমার ভালো লাগেনি বলে যে আপনাদের ভালো লাগবে না বিষয়টা সেরকম না।
আর আমি পড়ার সময় ভালো মন্দ দুটোই পেয়েছি তবে কোনো বই সম্পর্কে গুছিয়ে লেখার অভিজ্ঞতা নেই তাই এখানে তেমন ভালো.. ]
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।