নিজের পিতা-মাতা ছাড়াও অন্য শ্রদ্ধাভাজন নারী-পুরুষকে আব্বু-আম্মু বলা প্রসঙ্গে
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
আমাদের সমাজে অনেক সময় নিজের আপন (জন্মদাতা) পিতা-মাতা ব্যতীতও অন্য কোনো শ্রদ্ধেয় পুরুষ বা নারীকে বাবা-মা বলে সম্বোধন করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, নিজের পিতা-মাতা ব্যতীত অন্য নারী-পুরুষকে বাবা-মা বলা জায়েজ কি? এছাড়াও অনেক সময় অন্য নারী ও পুরুষ (যেমন আমাদের খালা, খালু ইত্যাদি) আমাদের "ছেলে" বলে ডাকে। এটার ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?
এর জবাব হলো: হ্যাঁ, বলা যাবে এবং ইসলামে এটি বৈধ। কুরআন ও হাদিসে আমরা অন্য নারী ও পুরুষকে মা-বাবা বলার দলিল পাই। যেমন,
«"নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের প্রাণ অপেক্ষাও অধিক ঘনিষ্ঠ, আর তাঁর স্ত্রীরা তাদের মাতা।"
(সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৬)»
এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদেরকে আমাদের মা বলা হয়েছে, যদিও তাঁরা আমাদের জন্মদাত্রী মা নন।
কুরআনে আরও বলা হয়েছে,
«"আর তোমাদের সেই মায়েরা, যারা তোমাদের দুধ পান করিয়েছে..."
(সূরা আন-নিসা, ৪:২৩)»
এই আয়াতে দুধ-মাকেও মা বলা হয়েছে, যদিও তিনি জন্মদাত্রী মা নন।
এছাড়াও কুরআনের অন্য জায়গায় বলা হয়েছে,
«"অতঃপর তারা যখন ইউসুফের নিকট উপস্থিত হলো, তখন তিনি তাঁর পিতা-মাতাকে নিজের কাছে স্থান দিলেন এবং বললেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় আপনারা নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন।’"
(সূরা ইউসুফ, ১২:৯৯)»
এখানে أَبَوَيْهِ (আবাওয়াইহি) অর্থাৎ "পিতা-মাতা" উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ একদল মুফাসসিরের মতে, ইউসুফ (আ.)-এর জন্মদাত্রী মা তাঁর শৈশবেই ইন্তিকাল করেছিলেন। এরপর ইয়াকুব (আ.) তাঁর স্ত্রীর বোন লায়্যাকে বিয়ে করেছিলেন। তিনি ইউসুফ (আ.)-এর খালা হওয়া সত্ত্বেও পিতার স্ত্রী হওয়ার কারণে "মাতা" হিসেবে অভিহিত হয়েছেন। (দেখুন: তাফসীরে কাসীর ও তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন)
উল্লেখ্য: শক্তিশালী মত অনুযায়ী, এ আয়াতে ইউসুফ (আ.)-এর জন্মদাত্রী মাকেই বোঝানো হয়েছে, যেমনটি ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) উল্লেখ করেছেন।
এসব আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, জন্মদাত্রী মা ছাড়াও সম্মান ও ভালোবাসার অর্থে অন্য নারীকে "মা" বলে সম্বোধন করা বৈধ।
আবার কুরআনে ইবরাহিম (আ.)-কে আমাদের পিতা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
«"এটি তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত (ধর্মাদর্শ)।"
(সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৮)»
এছাড়াও হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেকে পিতৃতুল্য বলেছেন।
হাদিস:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
«"আমি তোমাদের জন্য পিতৃতুল্য। আমি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকি।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮)»
কুরআন ও হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, নিজের জন্মদাতা ও জন্মদাত্রী ব্যতীতও অন্য কোনো নারী বা পুরুষকে সম্মান ও ভালোবাসার অর্থে পিতা-মাতা বলা বৈধ। তবে কখনোই নিজের প্রকৃত পিতা-মাতাকে অস্বীকার করে অন্য কাউকে নিজের জন্মদাতা পিতা-মাতা বানানো যাবে না।
আর হ্যাঁ, অন্য নারী-পুরুষ স্নেহবশত নিজের সন্তান ছাড়া অন্য কোনো শিশুকে "হে আমার ছেলে" বা "বাবা" বলে সম্বোধন করতে পারবেন। এ বিষয়ে সহিহ হাদিসে প্রমাণ রয়েছে।
পরিচ্ছেদ: নিজের ছেলে ছাড়া অন্যকে "হে বৎস!" বলা জায়েজ এবং আদর প্রকাশের উদ্দেশ্যে তা করা মুস্তাহাব।
আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, "হে বৎস!"
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১৫১)»
উল্লেখ্য: হাদিসে بُنَيَّ (বুনাইয়্যা) শব্দটি এসেছে। এ শব্দটি নিজের জৈবিক ছেলের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। যেমন,
«يَا بُنَيَّ ارْكَبْ مَعَنَا
"হে আমার প্রিয় পুত্র! আমাদের সঙ্গে নৌকায় আরোহন কর।"
(সূরা হূদ, ১১:৪২)»
অতএব, যে শব্দ দ্বারা নিজের জৈবিক সন্তানকে বোঝানো হয়, সেই একই শব্দ স্নেহবশত অন্য শিশুর ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে।
এখানে দেখা যায়, ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর সহিহ গ্রন্থে "নিজের ছেলে ছাড়া অন্যকে 'হে বৎস' বলা জায়েজ" শিরোনামে পৃথক পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, নিজের সন্তান ছাড়াও অন্যকে স্নেহের সঙ্গে "আমার ছেলে", "খোকা" ইত্যাদি বলে সম্বোধন করা বৈধ।
জবাব: মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।