ঢাকা শহরের সব গল্প কোলাহলে শুরু হয় না। কিছু গল্প জন্ম নেয় বইয়ের গন্ধে, পুরোনো পাতার ভাঁজে, কিংবা টিএসসির বিকেলের এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের পাশে।
আরিফের একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল। নতুন বইয়ের চেয়ে পুরোনো বই তার বেশি ভালো লাগতো। সে বিশ্বাস করতো, পুরোনো বই শুধু গল্প বহন করে না, বহন করে অচেনা মানুষের স্পর্শ, সময়ের দাগ আর না-বলা অসংখ্য স্মৃতি। তাই মাসে অন্তত দু-একবার সে চলে আসতো নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোতে। সরু গলি, মাথার ওপর ঝুলে থাকা বইয়ের স্তূপ, ধুলোমাখা তাক আর পুরোনো কাগজের সেই গন্ধ সব মিলিয়ে অন্য এক পৃথিবী।
সেদিনও সে একটি পুরোনো সংস্করণের উপন্যাস খুঁজছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দোকানের এক কোণে হাত বাড়াতেই আরেকটি হাত একই বইয়ের দিকে এগিয়ে এলো। দুজনেই হাত সরিয়ে নিলো। আপনি নিন, ছেলেটি মৃদু হেসে বললো। মেয়েটিও হেসে বললো, না আপনি আগে দেখুন। বইটির নাম ছিল শেষের কবিতা।
দোকানদার হেসে বললেন, আরেকটা কপি আছে। দুজনেরই হবে। দুজনেই একটু লজ্জা পেল।
সেদিনের পরিচয় সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো। কিন্তু শহরের কিছু গল্প হয়তো অন্যভাবে লেখা থাকে।
বই কেনা শেষ করে আরিফ হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল ভিসি চত্বর হয়ে টিএসসির দিকে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। গাছের নিচে কেউ গান গাইছে, কোথাও কবিতা আবৃত্তি হচ্ছে, কেউ আবার গিটার হাতে বসে আছে। টিএসসি প্রতিদিন নতুন করে তরুণদের স্বপ্ন সাজিয়ে দেয়। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা নিতে গিয়েই আবার সেই মেয়েটিকে দেখলো। মেয়েটিও বেশ অবাক। আবার দেখা!
মনে হচ্ছে ঢাকা শহরটা আজ খুব ছোট হয়ে গেছে। দুজনেই হেসে উঠল। সেদিন প্রথমবার তারা নিজেদের নাম বললো। ছেলেটির নাম আরিফ। মেয়েটির নাম ফারিস্তা।
কথা শুরু হলো বই নিয়ে। কে কোন লেখকের বই পড়ে, কার কবিতা ভালো লাগে, কোন উপন্যাস বারবার পড়া যায় এসব বিষয় নিয়েই চলতে লাগলো দীর্ঘ আলাপ।
ফারিস্তা বললো, আমি পুরোনো বই কিনি শুধু লেখার জন্য নয়। বইয়ের ভেতরে যদি কারও পুরোনো নোট, শুকিয়ে যাওয়া ফুল, কিংবা নাম লেখা থাকে, সেগুলো পড়তেও ভালো লাগে। মনে হয় বইটারও একটা জীবন ছিল।
আরিফ মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সে বললো, আমিও তাই ভাবি। পুরোনো বই কখনো একা থাকে না।
সেদিনের পর থেকে তাদের দেখা হওয়া অভ্যাস হয়ে গেল। কখনো নীলক্ষেতের কোনো দোকানে। কখনো টিএসসির চায়ের দোকানে। আবার কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির সামনে। কখনো শুধু হাঁটতে হাঁটতে, একদিন তারা নীলক্ষেতের একটি দোকানে খুব পুরোনো একটি ডায়েরি পেল।
ডায়েরির ভেতরে লেখা -
যদি কখনো এই ডায়েরি কেউ পড়ে, তবে জেনে রেখো, ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু মানুষ বদলে যায়।
দুজনেই দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলো। ফারিস্তা বললো, দেখুন না, মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার লেখা থেকে যায়। আরিফ উত্তর দিল, হয়তো এ কারণেই আমি বইকে এতো ভালোবাসি।
তারপর থেকে তারা যখনই কোনো পুরোনো বই কিনত, প্রথমে পাতার ভাঁজগুলো খুলে দেখতো। কোথাও শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার ফুল। কোথাও এক টুকরো সিনেমার টিকিট। কোথাও কারও হাতের লেখা, বইটা ফেরত দিও।
আবার কোথাও শুধু একটি নাম আর একটি তারিখ।
প্রতিটি বই যেনো আরেকটি অজানা জীবনের দরজা খুলে দিতো। এক বর্ষার দিনে প্রবল বৃষ্টি নামলো। টিএসসির চত্বর ভিজে একাকার। দুজনেই ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে। আরিফ ব্যাগ থেকে একটি বই বের করে বললো, আজ এটা আপনার জন্য। ফারিস্তা অবাক হয়ে দেখলো, পুরোনো সংস্করণের পদ্মা নদীর মাঝি।
বইটির প্রথম পাতায় আরিফ লিখেছে :
নতুন বই কিনে দেওয়া সহজ। কিন্তু যে বই সময়ের পরীক্ষায় টিকে গেছে, সেটাই হয়তো সবচেয়ে মূল্যবান। বন্ধুত্বও তেমনই হোক।
ফারিস্তা কিছু সময় বইটির দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর ব্যাগ থেকে একটি বুকমার্ক বের করলো।
বুকমার্কে লেখা :
কিছু মানুষ বইয়ের মতো। একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে থাকা যায় না।
সেদিন প্রথমবার তারা একসঙ্গে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটলো। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর টিএসসির ভেজা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুজনেই বুঝলো, সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো হয়তো কোনো বড় আয়োজনের মধ্যে নয়, বরং একটি পুরোনো বই, এক কাপ চা, আর একজন মন দিয়ে শোনার মানুষের মাঝেই লুকিয়ে থাকে।
বহু বছর পরে আরিফ আবার নীলক্ষেতে গেল।
দোকানগুলো আগের মতোই আছে। পুরোনো বইয়ের গন্ধও বদলায়নি। একটি দোকানে ঢুকে সে হঠাৎ একটি পরিচিত বুকমার্ক দেখতে পেল।
পেছনে ছোট করে লেখা -
যদি কোনোদিন আমরা হারিয়েও যাই, টিএসসি আর নীলক্ষেত আমাদের গল্প মনে রাখবে। কারণ ভালোবাসা সব সময় মানুষের হৃদয়ে নয়, কখনো কখনো পুরোনো বইয়ের পাতার ভাঁজেও বেঁচে থাকে।
আরিফ বুকমার্কটি হাতে নিয়ে মৃদু হেসে ফেলল। বাইরে তখন বিকেলের আলো পড়ছে। টিএসসির দিকে হেঁটে যাওয়া মানুষের ভিড় আগের মতোই। নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোও আগের মতোই নতুন পাঠকের অপেক্ষায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।