রং নাম্বার
শুক্রবার মানেই আমার কাছে কুম্ভকর্ণ দিবস। সারা সপ্তাহ রাত জেগে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখে শুক্রবার বেলা ১১টার আগে আমার ঘুম ভাঙে না। আর এই নিয়েই গিন্নির অভিযোগের শেষ নেই।
আজও সকাল সাতটার দিকে বউয়ের খ্যাঁচখ্যাঁচানিতে ঘুম ভাঙল।
"সারা সপ্তাহে সংসারের কত কাজ জমে থাকে! শুক্রবারেও যদি দুপুর পর্যন্ত ঘুমান, তাহলে সংসার চলবে কীভাবে?"
আমি আধো ঘুমে চোখ না খুলেই বললাম, "চুপ... একটা সুন্দর স্বপ্ন দেখছি।"
বউ খেঁকিয়ে উঠল, "ও তাই নাকি! কোন মহারানীকে স্বপ্ন দেখছেন শুনি?"
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার? কত দিন পর তোমাকে নিয়ে এমন মিষ্টি স্বপ্ন দেখলাম!"
কথাটা শুনে গিন্নির গলার ভলিউম একটু কমল।
"হুম... স্বপ্নই দেখেন। স্বপ্ন দেখেই তো আপনার সংসার চলে। আমি একা এই সংসারের বান্দি!"
বলেই চলে গেল।
আমি মনে মনে বললাম, "যাক বাবা, প্রথম ইনিংসটা ড্র হলো।"
বালিশ জড়িয়ে আবার চোখ বন্ধ করেছি, এমন সময় ফোন বেজে উঠল।
ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বললাম, "হ্যালো..."
ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত এক নারীকণ্ঠ।
"তোমার সোনা বউ বলছি... আমাকে ক্ষমা করে দাও, জান। আর এমন হবে না। প্লিজ বাসায় আসো। সারা রাত একটুও ঘুমাতে পারিনি। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না..."
আমি থ হয়ে গেলাম।
মহিলা কাঁদতেই থাকলেন।
"প্লিজ... আমাকে আর শাস্তি দিও না। আজ যদি বাসায় না আসো, আমার মরা মুখ দেখবা..."
বলেই ফোন কেটে দিলেন।
আমি কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ভাবলাম, রং নম্বর দিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে এমন মজা করা ঠিক না।
তাই কল-ব্যাক করলাম।
ফোন বন্ধ।
মনে একটু খচখচ করতে লাগল। জানিনা কার বউ ছিলো এটা। তবে বউটা ভালো ছিলো।
ফোন রেখে ওয়াশরুমে ঢুকলাম।
আমি জানতাম না, আমার দারোগা বউ গোয়েন্দাগিরি শুরু করে দিয়েছে। সাংবাদিক মানুষ বলে ফোনে সব সময় অটো রেকর্ডিং চালু থাকে। সে পুরো কথোপকথন শুনে ফেলেছে।
ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই দেখি বউয়ের চেহারা অগ্নিমূর্তি। এখনই জরুরি অবস্থা জারি করবে।
চোখে পানি, মুখে আগুন।
"এই ছিল তোর মনে? তাই বলি, ফোনের পাসওয়ার্ড চেঞ্জ কেন?"
আমি তো হতবাক!
"আরে, রং নম্বর!"
আমি যতই বুঝাই, সে ততই কাঁদে।
শেষ পর্যন্ত ঘোষণা দিল,
"এক মুহূর্তও আর তোমার সঙ্গে থাকব না।"
এক কাপড়ে বাপের বাড়ি রওনা দিল।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরালাম।
ঠিক তখনই আবার ফোন।
আবারও একজন মহিলা।
"হ্যালো, মুকুল না?"
"হ্যাঁ..."
"কি পাইছো তুমি? সাত দিন ধইরা শুধু আসি আসি করো। আসো না ক্যান?"
আমি মনে মনে বললাম, 'আজকে বুঝি আমার সর্বনাশের দিন!'
সাহস করে বললাম, "কই যামু?"
ওপাশ থেকে মহিলা রেগে আগুন।
"কই যামু মানে? তুমারে কইতাছি না, বাসার মোটর নষ্ট! সাত দিন ধইরা পানি নাই। তুমি ছাড়া দুনিয়ায় আর মিস্ত্রি নাই নাকি?"
আমি বললাম, "আপনার বাসা কই?"
"সাদু বাজার, মণ্ডল বাড়ি। এখনই আইসো।"
আমি একটু দুষ্টুমি করে বললাম,
"আমার সকাল দশটায় বলদিয়া কলেজে ক্লাস আছে। ক্লাসটা নিয়ে তারপর আসি?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর...
"এইডা... মুকুল মিস্ত্রি না?"
"না। মুকুল স্যার।"
"আল্লাহ! সরি... রং নাম্বার!"
ফোন কেটে গেল।
আমি হেসে ফেললাম।
ঠিক তখনই আবার ফোন।
ভাবলাম, এবার বুঝি তৃতীয় কোনো বউ!
ফোন ধরতেই এক পুরুষের গর্জন,
"আপনি কি সেই লোক, যারে আমার বউ সকালে ফোন দিছে?"
আমি শুকনো গলায় বললাম, " জ্বি ভাই, আমি ভুল নম্বর।"
লোকটা বললো, ভুল নম্বর মানে? বউরে হাতে নাতে ধরছি। মিয়া আপনের খবর আছে"
ফোন কেটে গেল।
বারান্দার নিচে আমার শ্বশুরের মোটরসাইকেল।
পেছনে আমার গিন্নি।
অনেক বুঝিয়ে সব ক্লিযার করলাম।
বউয়ের চাপে আমি নম্বর বদলেছি।
কিন্তু আজও অচেনা নম্বর থোকে ফোন এলে বুক ধড়ফড় করে।
যদি আবার কোনো বউ বলে ওঠে,
"জান, বাসায় আসো..."
( বরাবরের মতো এটি আমার একটি রম্য লেখনী। কিছুটা বাস্তব বাকিটা কল্পনা। যদি কারো সাথে কিছু মিলে যায়,সেটি কাকতাল মাত্র)
বিঃদ্রঃ কপিরাইট স্বত্ব সংরক্ষিত আছে। তাই কপি করা নিষেধ।
লেখক-
মাইদুল ইসলাম মুকুল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও গল্পকার
<!-- /data/user/0/com.samsung.android.app.notes/files/clipdata/clipdata_bodytext_260716_100424_059.sdocx -->
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।