প্রথম কথা হলো ইসলামে ক্যাজিন ম্যারেজ জায়েজ বা মুবাহ। এখন ইসলামের কোনো জায়গাতেই বলা হয় নি যে কোনো জিনিস জায়েজ বা মুবাহ হলেই তাতে কোনো ক্ষতি থাকবে না । যদি কোনো কিছুতে গুরুতর ক্ষতি থাকে তখনই ইসলাম সেটাকে হারাম বলে। এখন আমাদের বুঝতে হবে যে নিজ চাচাতো মামাতো ভাইবোন ( ফার্স্ট কাজিন) বিয়ে করলে তা আমাদের সন্তানদের জন্য কতটুকু ক্ষতিকর! ।
সাধারণ তো নন- কাজিন ম্যারেজ গুলোতে বিয়ের পর যে বাচ্চা হয় এবং তাদের মধ্যে জেনেটিক ঝুঁকির পরিমাণ ২.৪% হলে কাজিন ম্যারেজ গুলোতে যে বাচ্চা জন্ম নেই তার জেনেটিক প্রবলেম এর রিস্ক ৬.১%, অর্থাৎ কিছুটা বেশি। যদি সাধারণ বিয়ের চেয়ে কাজিন ম্যারেজ বিয়ের পর বাচ্চাদের জেনেটিক ঝুঁকির পরিমাণ ২০-২৫ গুন ( প্রায় ৪০%-৫০% এরকম) থাকত তাহলে এটাকে গুরুতর বলা হত কিন্তু এরকম কিছুই হচ্ছে না।
আর মজার ব্যাপার হলো ফার্স্ট কাজিন ম্যারেজেে যে বেবি ( নিউবোর্ন) হয় তারা তেমন কোনো অস্বাভাবিকতা নিয়ে জন্ম নেয় না। [১]
আর আমাদের বুঝতে হবে যে ইসলাম আমাদের বলে না যে তোমরা বার বার করে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নিজেদের চাচতো, মামাতো ভাই বোনদের মধ্যেই বিয়ে করতে থাকো। কাজিন ম্যারেজ তখনই সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর ঝুঁকি সৃষ্টি করে যখন কয়েক প্রজন্ম ধরে কোনো এক গোত্রে নিজেদের মধ্যে বিয়ে করতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ আমরা হ্যাপসবার্গ রাজপরিবারের কথাটা নিয়ে আসতে পারি।
হ্যাপসবার্গ রাজপরিবার / House of Habsburgহলো ইউরোপের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী আর দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশগুলার একটা। প্রায় 650 বছর ইউরোপ শাসন করছে।Inbreeding (রক্তের বিয়ে) এর মাধ্যমে রাজবংশ টিকায় রাখতে চাচা-ভাতিজি, কাজিন-কাজিন বিয়ে দিতো। এজন্য "Habsburg Jaw" নামে চোয়াল বড় হয়ে যেতো। Spain এর Charles II এত দুর্বল ছিল যে কথা বলতে পারতো না, বাচ্চাও হয় নাই। 1700 সালে স্প্যানিশ হ্যাপসবার্গ লাইন শেষ কেননা তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম নিজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিয়ে করার জন্য এক সময় মারাত্মক জেনেটিক সমস্যার জন্য নিজেদের পরিবারের দফারফা হয়ে যায়।
বিপরীতে আমরা যদি রাসূল সাঃ এবং তাদের সাহাবীদের জীবন কাহিনীগুলো পড়ি তাহলে দেখতে পাই যে তাদের মধ্যে কাজিন ম্যারেজ এর মাত্রা ৫% ও ছিল না। উদাহরণস্বরূপ রাসূল সাঃ এর বিবাহের কথাগুলোই নিতে পারি। হযরত মুহাম্মদ সাঃ যাকে প্রথম বিয়ে করেন মা খাদিজাকে, আর তারা সম্পর্কে কোনো ভাই- বোন ছিলেন না। তার দ্বিতীয় বিয়ে হয় মা আয়েশার সাথে ( মতবিরোধ আছে) তিনিও সম্পর্কে রাসূল সাঃ এর কোনো কাজিন না। রাসূল সাঃ মোট ১১ টা বিয়ে করেন এর মধ্যে তার নিজের নিকট আত্মীয় বলতে ছিল জয়নাব বিনতে জাহশ, তিনি ছাড়া অন্য কোনো স্ত্রী রাসূল সাঃ এর কাজিন ছিল না। এখান থেকে বুঝা যায় যে নিজের কাজিনদেরকেই বিয়ে করতে হবে এরকম কোনো উসূল নেই যদি থাকত তাহলে নবীজির সব স্ত্রী সম্পর্কে হয় তো তার কাজিনই হত। এছাড়াও রাসূল সাঃ এর বাবা - দাদাও কিন্তু কোনো কাজিন ম্যারেজ করেন নি।
আর আমি আগেই বলেছি যে ফাস্ট কাজিন ম্যারেজে তেমন কোনো ঝুঁকি নেই । আর যদি নন - কাজিন ম্যারেজ এর কথা বলি তাহলে সেখানেও কিন্তু ঝুঁকির মাত্রা আছে । কাজিন ম্যারেজ এবং নন- কাজিন ম্যারেজ দু- ক্ষেত্রেই ঝুঁকির মাত্রা আছে একটাতে কম আরেকটাতে কিছুটা বেশি যদি ফার্স্ট কাজিন ম্যারেজ হয় তাহলে।
আর রাসূল সা: সামগ্রিক ভাবে ইসলামি বিয়ে ব্যবস্থার যে মূলনীতি দিয়েছেন সেখানেও বলা হয় নি যে " বিয়ের মধ্যে কাজিনদের বিয়ে করতে হবে.. " বরং এটাকে সাইট চয়েস হিসাবে রাখা হয়েছে। আর মজার ব্যাপার হলো কাজিনদের মধ্যে বিয়ে করলে যে কিছু ঝুঁকির প্রকোপ আছে এটা কিন্তু আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে। উমার রা. বলেন - নিজ আত্মীয়ের মধ্যে মধ্যে বিয়ে করলে দুর্বল সন্তানের জন্ম হয় [( আল মুগনি লি ইরাকি-২/৪২)/ এই মর্মে যেসব আছার আছে সেগুলো মুহাদ্দিসদের তাহকিকে বিশুদ্ধ না বরং দুর্বল ]
আর হ্যা আরেকটা কথা বলি। ইসলাম বিদ্বেষী ও নাস্তিকরা শুধু কাজিন ম্যারেজ এর প্রসঙ্গ টেনে এনে সব সময় এর ক্ষতিকর দিকগুলো উল্লেখ করে কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে প্রত্যেক বিষয়ের ভালো মন্দ দুটো দিকই আছে। ঠিক একই রকম ভাবে কাজিন ম্যারেজ এতেও কিছু সুবিধা আছে। যেমন - প্রথম কাজিন ম্যারেজের পরিবারে জেনেটিক্যালি হার্ট ডিজিজ এর ঝুঁকি অনেকটা কম [২] এছাড়াও আরও অনেক উপকার আছে। আর এসব বিষয়ে অনেক আগেই আমাদের দাঈয়েরা বিস্তারিত লেখালেখি করেছেন তাই আলাদা করে অতিরিক্ত কোনো তথ্য উপাত্ত পেশ করার কোনো প্রয়োজন মনে করছি না...... ।
শুধু এতটুকু জেনে রাখুন যে - বিয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কাজিন এবং নন- কাজিন দুই ম্যারেজেই আছে আর এর মাত্রা একটাতে কিছুটা কম এবং আরেকটাতে কিছুটা বেশি। যেখানে নন- কাজিন ম্যারেজগুলোতে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে দু- জন বাচ্চা জেনেটিক সমস্যাতে পড়ে সেখানে কাজিন ম্যারেজে প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে ৪-৫ জন শিশু জেনেটিক সমস্যাতে পরে। আর ইসলামও আমাদের বেশি বেশি উৎসাহ করে না যে " তোমরা নিজেদের মধ্যেই বিয়ে করতে থাকো.... "। আশা করি বিষয়টা বুঝেছেন।
[ এরকম বিষয়গুলো জানতে পড়ুন -
১.বিবাহপাঠ - শামসুল আরেফিন শক্তি
২.বিয়ের এপিট ওপিট- জাকারিয়া মাসুদ
৩.ম্যারেজ ইন ইসলাম - জাকির নায়েক
৪.Cousin Marriage in Islam - MYSA ELSHEIKH
৬.Consanguinity and its relevance to clinical genetics-Alan H. Bittles
৭.Genetic Counseling and Screening of Consanguineous Couples - Robin L. Bennett et al ]
[১] Özener, B., & Graham, J. H. (2014). Growth and fluctuating asymmetry of human newborns: Influence of inbreeding and parental education. American Journal of Physical Anthropology, 153(1), 45–51.
https://doi.org/10.1002/ajpa.22401
[২] Saleheen, D., Natarajan, P., Armean, I. et al. Human knockouts and phenotypic analysis in a cohort with a high rate of consanguinity. Nature 544, 235–239 (2017).
https://doi.org/10.1038/nature22034
©Prince Frerase -
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।