*মায়া*
পর্ব ১: স্টেশনের মেয়েটা
কমলাপুর রেলস্টেশন। রাত 12টা। লাস্ট ট্রেন চলে গেছে। প্ল্যাটফর্মে শুধু কুকুর আর পাগল।
একটা 6 বছরের মেয়ে বসে আছে। পরনে ছেঁড়া ফ্রক। সামনে আধা খাওয়া পাউরুটি। নাম জানে না। কেউ "মায়া" ডাকতো - তাই ও নিজেও নিজের নাম মায়া ভাবে।
পাশে বসে আছে একটা বুড়ি। পাগল। সারাদিন বিড়বিড় করে। রাতে মায়ার মাথায় হাত বুলায়। বলে, "ঘুমা মা। দুনিয়াটা খারাপ। ঘুমাইলে খারাপ লাগে না।"
মায়া ঘুমায় না। ওর চোখে ঘুম নাই। ওর চোখে শুধু প্রশ্ন - "মা কই?"
3 বছর বয়সে মা ওরে স্টেশনে রেখে গেছিলো। বলছিলো, "মা, একটু বসো। আমি চা কিনে আনি।" মা আর আসে নাই।
---
পর্ব ২: বাসার বড় মেয়ে
18 বছর পর। মায়া এখন 24। ঢাকার একটা বস্তিতে থাকে। 3টা বাসায় কাজ করে। সকালে 5টায় উঠে, রাতে 12টায় ঘুমায়।
যে বাসায় কাজ করে, ওই বাসার আন্টির একটা মেয়ে আছে - তিতলি। 8 বছর। সেরিব্রাল পালসি। হাঁটতে পারে না, কথা বলতে পারে না। শুধু মায়ার দিকে তাকায় থাকে।
আন্টি মাসে 4000 টাকা দেয়। মায়া 3000 টাকা গ্রামে মায়ের কাছে পাঠায়। মা মানে ওই পাগল বুড়ি। স্টেশনেই থাকে এখনো। মায়া প্রতি মাসে গিয়ে দেখে আসে। বুড়ি মায়ারে চেনে না। শুধু বলে, "মা রে, তোর মতো একটা মেয়ে ছিলো। হারায় গেছে।"
মায়া হাসে। "আমি হারাই নাই খালা। আমি তোমার কাছেই আছি।"
---
পর্ব ৩: মায়ার পরীক্ষা
একদিন তিতলির জ্বর 105। আন্টি-আংকেল দুইজনই দেশের বাইরে। মায়া তিতলিরে কোলে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ায়। ডাক্তার বলে, "ভর্তি দেন। 20 হাজার টাকা লাগবে।"
মায়ার কাছে 2 হাজার টাকা। নিজের 3 মাসের জমানো টাকা। মায়ের জন্য রাখছিলো।
নার্স বলে, "টাকা ছাড়া বেড দিবো না।"
মায়া তিতলিরে বুকে জড়ায় ধরে। তিতলি কাঁপতেছে। মায়া কাঁপতেছে। ওই মুহূর্তে মায়ার মায়ের কথা মনে পড়লো। 18 বছর আগে যে মা ওরে স্টেশনে রেখে গেছিলো।
মায়া ডাক্তারকে বললো, "স্যার, টাকা কাল দিবো। আজ বাচ্চাটারে বাঁচান। ও কথা বলতে পারে না। কিন্তু ওর চোখ দিয়ে কাঁদে। আমারও মা ছিলো। উনিও আমারে এভাবে বুকে নিতো... মনে হয়।"
ডাক্তার রাজি হলো না। নিয়ম, নিয়ম।
মায়া তখন নিজের গলার চেইন খুললো। ওটা ওর মায়ের। স্টেশনে কুড়ায় পাইছিলো। সোনা না, ইমিটেশন। তবুও মায়ার কাছে জান। বললো, "স্যার, এটা রাখেন। আমার মায়ের স্মৃতি। 20 হাজার না, 20 লাখ দাম। টাকা জোগাড় করে আমি নিয়ে যাবো।"
ডাক্তার চেইনটা হাতে নিলো। কিছু বললো না। শুধু বেডের ব্যবস্থা করলো।
---
পর্ব ৪: মায়ের খোঁজ
তিতলি সুস্থ হলো 7 দিনে। আন্টি-আংকেল ফিরে এসে সব শুনলো। মায়ার পায়ে ধরে কাঁদলো। 20 হাজার টাকা দিলো। সাথে চেইনটাও ফেরত দিলো।
আংকেল বললো, "মায়া, তুমি আমাদের মেয়েরে বাঁচাইছো। আমরা তোমার ঋণ শোধ করতে পারবো না। তুমি আমাদের বাসায় থাকো। তিতলির গার্জিয়ান হয়ে যাও।"
মায়া রাজি হলো না। বললো, "আমার মা স্টেশনে আছে। উনি পাগল। আমারে চেনে না। কিন্তু আমি ওনারে চিনি। উনি আমার মা।"
সেদিন রাতে মায়া স্টেশনে গেলো। বুড়িরে খুঁজলো। পাইলো না। স্টেশনের দারোয়ান বললো, "ওই পাগলি তো 2 মাস আগে মরে গেছে। শীতে। কেউ লাশও নেয় নাই। পুলিশ মাটি দিছে।"
মায়া স্টেশনের ওই জায়গাটায় বসে পড়লো। যেখানে 18 বছর আগে মা "চা কিনতে" গেছিলো। বুকের ভিতরটা ফাঁকা। চেইনটা শক্ত করে ধরলো।
হঠাৎ মনে হলো কেউ মাথায় হাত বুলাচ্ছে। পরিচিত গন্ধ। মায়ের গন্ধ। কেউ কানে ফিসফিস করলো, "মা রে, কাঁদিস না। আমি তোর কাছেই আছি। তুই যারে মা ডাকিস, সে-ই তোর মা। রক্ত লাগে না মা ডাকতে। মায়া লাগে।"
মায়া আকাশের দিকে তাকালো। তারা গুনলো না। শুধু বললো, "মা, আমি তোমারে খুঁজি নাই। আমি তোমারে বানাইছি। তিতলির মধ্যে, স্টেশনের বুড়ির মধ্যে, হাসপাতালের ডাক্তারের মধ্যে। দুনিয়া খারাপ না মা। দুনিয়ায় মায়া আছে। তুমিই আমারে মায়া শিখাইছো - চলে গিয়ে।"
---
শেষ পর্ব: মায়ার বাসা
আজ মায়া 30। ওর নিজের একটা "মায়া আশ্রম" আছে। স্টেশনের পাশে। রাস্তার এতিম, পাগল, অসুস্থ বাচ্চাদের জন্য।
তিতলি এখন 14। হুইলচেয়ারে বসে বাচ্চাদের পড়ায়। মায়ারে "আপু" ডাকে না। "আম্মু" ডাকে।
মায়া এখনো রাতে স্টেশনে যায়। ওই জায়গাটায় বসে। প্ল্যাটফর্মে শুয়ে থাকে। আকাশ দেখে। আর মনে বলে, "মা, দেখো। তুমি আমারে ফেলে গেছিলা। কিন্তু আমি হাজারটা মায়েরে কুড়ায় নিছি।"
মায়া মানে শুধু একটা নাম না। মায়া মানে - যার নিজের কেউ নাই, সে-ই সবার আপন হয়ে যায়।
*শেষ কথা:*
দুনিয়ায় দুই ধরনের মানুষ আছে। একদল মায়া পায় না বলে পাথর হয়ে যায়। আরেকদল মায়া পায় না বলেই মায়া বিলায়। মায়া নিজেই মায়া হয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।