টাকার আত্মকাহিনী।
মুহাম্মদ শাহজাহান।
আমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রবর্তিত ও প্রচলিত কাগজী মুদ্রা বলছি।
১৬৬১ সালে ‘Bank of Sweden’ প্রথম আমাকে ছাপায়। এর পর থেকে আমার পূর্বপুরুষরা পশ্চিমা দেশ থেকে যে বংশধারা শুরু করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় শত শত বৎসরের ঐতিহ্য নিয়ে আজ আমি সারা বিশ্বব্যাপী আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার প্রাণের প্রিয় চাওয়া। কিন্তু আমি বাংলাদেশে আছি বলেই আজ আমার কপালে এত দুঃখ। আমার আদি বংশধরদের, তাদের জন্মস্থানসহ আশেপাশের সব উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে, আমার আত্মীয়-স্বজনদের কত আদর-কদর। শুধু আমি বেচারা বাংলাদেশে বারবার অবহেলিত, নিঃগৃহীত হয়ে আসছি। শত শত বৎসর ধরে আমার শরীরে আমি কত মহামনিষীর ছবি স্মৃতি হিসেবে বহন করে চলেছি—তার হিসাব কষা ও দুষ্কর।
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন আমার খুশী দেখে কে? কিন্তু সে আনন্দের বেলুন কখনোই আকাশে উড়েনি। কারণ বারবার আমাকে আমার বিদেশী আত্মীয়-স্বজনদের কাছে শুধু অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এর স্বপক্ষে কত কত সিভিক সেন্স দেখানো হয়েছে—তার একটা ও আমার ভালো লাগেনি। তাই প্রায়ই আমি স্ফীতি রোগে ভুগে থাকি। দুষ্কৃতিকারীরা প্রায়ই আমার ক্লোন তৈরী করে সাধারণ জনগণকে ঠকিয়ে থাকে; আমি কিচ্ছু করতে পারি না। আমার বোবা কান্না কারো কর্ণপটে প্রবেশ করে না। যদিও আমার মৃত্যু নেই, বারবার আমি নতুন রূপে আসি, তথাপি আমার বৃদ্ধ বয়সে সবাই আমাকে কত অবহেলা করে। কেউ রাখতে চায় না আমায়—যেন মানে মানে বিদায় করতে পারলেই বাঁচে। চামড়া বাজার, মাছ বাজার, ব্যাংক হয়ে হাত থেকে হাতে ঘুরতে ঘুরতে আমি ছেড়া ও ময়লা হয়ে যাই। ইদানীং আমার ছোট ভাই-বোনদের সংখ্যা (১, ২, ৫ টাকার কাগজী নোট ও মুদ্রা) কমে যাওয়ায় আমাকে ব্যবহারকারীরা প্রায়ই বিপদে পড়েন। তাই আমায় নিয়ে ঝগড়া-ঝাঁটি, তর্ক-বিতর্ক, খুনসুটি অহরহ লেগে থাকে মাঠে, ঘাটে, গাড়ীতে, বাড়ীতে। ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় বান্ডিলের ভিতর ঢুকিয়ে ও কেউ আমাকে চালাতে পারে না। ইদানীং টেপ লাগিয়ে, জোড়া-তালি দিয়ে আমাকে গছানো প্রায় মজার হাতসাফাই খেলায় পরিণত হয়েছে। পথে-ঘাটে ‘ওয়াক থু’ শুনতে শুনতে জীর্ণ-শীর্ণ শরীর নিয়ে কারো কারো মারফৎ আমি তফশীলী ব্যাংকে গিয়ে পৌঁছি। সেখানে ও আমাকে কেউ গ্রহণ করে না। তখনও চরম অবহেলায় আমি না মরে বেঁচে থাকি। মাঝে মধ্যে কোন কোন হৃদয়বান ব্যক্তির বদান্যতায় (নাকি উপায়হীন?) আমি আসল ঠিকানা ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’-এ যাওয়ার সুযোগ পাই। সেখানে ও সবাই অনাহুত ব্যস্ততা দেখিয়ে এ-ওকে বলে, ও-কে এর কাছে যেতে বলে। তখন বুঝি—এ দেশে জন্ম নেয়াই ছিল আমার আজন্ম পাপ। মহাপাপ বলে আত্মহত্যা ও করতে পারি না। হায়! “গমকা পাছানা কিস্কো শুনাইয়ে।” অথচ পার্শ্ববর্তী দেশে কেউ আমার প্রজাতিকে আমৃত্যু কোনদিন অবহেলা করেনি, করে না। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে বাংলাদেশ বাণিজ্য বৈষম্যের মাঝেও সবকিছু আমদানী করতে পারে, শুধু পারে না আমার প্রতি ভদ্র ব্যবহারের জ্ঞানটুকু আমদানী করতে। জানি না, কখনো এ দেশে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব কিনা। দেশের মানুষের যা খাসিলত, তাতে শুধু শঙ্কাই হয়—ভরসা পাই না।
তবে কিছু কিছু ঘটনায় গর্বে আমার বুকের ছাতি ৩২ থেকে ৪২ ইঞ্চিতে পৌঁছে যায়। যেমন—কোন পাগল আজ পর্যন্ত কোন টাকা ছেঁড়েনি। দুনিয়ার আর সবাইকে সে চিনতে না পারলেও আমাকে ঠিকই চিনতে পারে। জায়গায় জায়গায় আমাকে যথাযথ ব্যবহার করতে না পারলে অবস্থা—“যথা পূর্বং তথা পরং”, আর ঠিক সময়ে ক্লিক করতে পারলে অবস্থা—“জলবৎ তরলং”। যেমন—অফিসের কর্তাব্যক্তিরা সালামের চাইতে সালামী-ই পছন্দ করেন বেশি। “টাকা ছাড়া নড়েনা ফাইল—বস্ বলেন আসনে কাইল।” তাই পৌনঃপুনিক ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে আমাকে ব্যবহার করলে বস্ পই পই করে সই দেন ফাইলে। লেনদেনের সুবিধার জন্য সুধীজনরা (?) আমাকে আদর করে বিভিন্ন নামে সম্বোধন করেন। যেমন: ঘুষ, বখশিস, মাসোহারা, উপরি, তেল, ফাও, তেলপানি, সার্ভিস চার্জ, মাল, মালপানি, খুশীকরা, একটু চা-পানির ব্যবস্থা, গাড়ী ভাড়া, সম্মানী, নজরানা, উপহার, পাতা, উৎকোচ, হাদিয়া, রিশওয়াত, ক্যাশ, কাইন্ড, শুভেচ্ছা, অফিস খরচ, উপঢৌকন, স্বাস্থ্যবড়ি, সেয়ানা ট্যাক্স, ভ্যাট, ভিটামিন এম ক্যাপসুল ইত্যাদি। কিন্তু আমি যেই লাউ সেই কদুই থাকি।
প্রাসঙ্গিক কারণে সুধীমহলকে মরহুম অধ্যাপক আসহাব উদ্দিন আহমদের ভাষায় একটা সুপরামর্শ দিয়ে রাখি। তা হলো—“কোন দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ পেশের আগে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জেনে নিবেন, যার কাছে অভিযোগ পেশ করবেন সেই মহাপ্রতাপান্বিত ভদ্রসন্তানের হাত চুলকানি রোগ আছে কি না।” অবশ্য উন্নত মধ্যপ্রদেশের কারণে এদের, অর্থাৎ তথাকথিত ভদ্রসন্তানদের, চিনতে কারো কষ্ট হবার কথা নয়। যারা ইচ্ছেই হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক এসব থেকে বঞ্চিত থাকেন, তারা Honest man। এখানেও কথা থেকে যায়, তাহলো—‘Honesty is nothing but want of opportunity.’ কথায় বলে—‘বে-আক্কেলে চিনে কদু, ভোমরায় চিনে মধু।’ ঠিক আসল চালাক লোকই আমার গুপ্ত গুহার সন্ধান লাভ করতে পারে।
পৃথিবীতে আমায় নিয়ে কত ভৌতিক, আদিভৌতিক কাণ্ড ঘটেছে—তার কোন ইয়ত্তা নেই। তবু ও জ্ঞানীগুণীরা পৃথিবীতে আমাকে ‘Money is sweeter than honey’-এর সম্মান দিয়েছে। হাল আমলের ব্যাংক ব্যবস্থাপনার বাইরেও আমাকে অনেকে অনেক রকমভাবে সংরক্ষণ করে। কেউ মাটির আম-কাঁঠালের ভিতর, কিংবা মাটির কবুতর, মাটির ফুটবলের ভিতর। আবার কেউবা বাঁশের ভিতর, গাছের বাক্সে, টিনের কৌটায়, সিন্ধুকে, বালিশের তলে, বিছানার নিচে, আলমিরার ড্রয়ারে ইত্যাদি। চলমান জ্ঞানী তথা Wise Men-রা Trouser-এর উপরের অংশে ভিতরের দিকে একটা চোরা পকেটে ও Reserve হিসেবে আমাকে রাখে। এই পকেটের নাম ও Wise Pocket। অবশ্য Wise Women-রা কোথায় Reserve রাখেন, তা বলা রীতিমতো মুশকিল। তথাকথিত দুই আঙুলের মহান শিল্পকর্ম (!) থেকে বাঁচার জন্যই অবশ্য এই পকেটের সৃষ্টি।
দেশে কাগজের অভাব না থাকলেও M.A (Buft) ডিগ্রীধারীরা (Matric appeared but unfortunately failed trice) হৃদয়াবেগ প্রকাশের জন্য দ্রুততম ও সহজ মাধ্যম হিসেবে আমার শরীরে অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো ‘যদি লাইগ্যা যায়’ স্টাইলে কত কিছু লিখেছে—হারানো, প্রাপ্তি ইত্যাদি কত রকমের বিজ্ঞাপন, আহ্বান লিখেছে—তার কোন ইয়ত্তা নেই। যুগে যুগে আমায় নিয়ে পৃথিবীর বাঘা বাঘা তাবৎ কবি-সাহিত্যিকরা অনুপম সাহিত্যকর্ম রচনা করে পৃথিবীর সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। “টাকার নৌকা পাহাড়েও চলে” কিংবা “টাকায় বাঘের চোখও কিনতে পাওয়া যায়”—এ জাতীয় কথামালা কেবল আমাকে নিয়েই বলা সম্ভব। তবে সাবধান—আমাকে কেউ ধার দিবেন না, ধার নিবেন না; কারণ দুটোই আপদ ও বিপদের মহাযোগসূত্র। আমার সাথে নারীর সম্পর্ক মনে হয় একটু বেশি, তাই একটা কথা চালু আছে—“পুরুষের বেতন ও নারীর বয়স জানা দুষ্কর।”
আমার ক্ষমতার সীমা-পরিসীমা জানতে পেরে রুশ দেশে যে প্রবাদটি বহুল প্রচলিত, তা হলো—“টাকা যখন কথা বলে, সত্য তখন নীরব হয়ে থাকে।” ‘অহিংসা পরম ধর্ম’-এ বিশ্বাসী বিধায় আমি যখন যার কাছে যাই, তখন তার হয়ে যাই। মানুষের চিন্তা-চেতনা, মেজাজ-মর্জি এবং রুচি-অভিজাত্যে টাকা বিশেষ এক নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই আমাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়ত্তে রাখতে পারলেই যে কেউ নিজেকে “মুকাদ্দার কি সিকান্দার” ভাবতে পারেন এবং ধরাকে সরা জ্ঞান করতে পারেন—তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। আছে শুধু লজ্জা, কারণ আমি বড্ড নিরুপায়।
অনেকে বলে—“অর্থই নাকি অনর্থের মূল” এবং টাকার জন্য মানুষ মানুষকে খুন করে করতে পারে। তাই আমি নাকি বিজ্ঞানের নিকৃষ্টতম আবিষ্কার। এ ধরনের বেফাস কথা ও অবলীলায় বলেছেন অনেক বেরসিক। Let it be, let them tell. পারফেক্ট জেন্টলম্যান ফারকুহার-ই একমাত্র নিরপেক্ষ মন্তব্যকারী ব্যক্তি, যিনি বলেছেন—“টাকা রোজগার করতে মাথা আর খরচ করতে মন লাগে।” অবশ্য আমাকে পরশপাথর মনে করে যারা সব সময় চুরির ধান্দায় থাকে, তাদের বিশ্লেষণে আমি—Kleptomania Ability for Touch-Stone Always (TAKA)। কিন্তু যারা বাস্তবতায় প্রয়োজনে খরচের জন্য আমায় রাখতে চায়, তাদের মতে আমার যথার্থ শানে নুযুল হলো—Take And Keep Always (TAKA)। আমার ভুবনমোহিনী যাদুকরী ক্ষমতার কারণে ইংরেজ কবি বায়রণও স্বীকার করেছেন যে—“নগদ টাকা আলাদীনের চেরাগের সমতুল্য।” টাকার অভাবে টসটসে আঙুরের মতো প্রেমও কিসমিসের মতো মুমূর্ষু হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত কবি, নাট্যকার ও উপন্যাসিক শেক্সপীয়ার তো অনেক আগেই বলে গেছেন—“অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।” আসলে কে না জানে যে—“টাকা ছাড়া একজন লোক তীর ছাড়া ধনুকের মতো।” তাই আমি বলতে চাই—“সবার উপরে টাকা সত্য, তাহার উপরে নাই।” সুতরাং টাকা জিন্দাবাদ।
পুনশ্চঃ
“বকরামা হাম জুনুন মে কেয়া কেয়া কুচ
কুচ না সমঝিয়ে খোদা করে কুই।”
—মীর্জা গালিব।
(দৈনিক আজাদী পত্রিকায় বিগত ২৯/০৯/২০০২ ইং তারিখে প্রকাশিত।)
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।