আত্মা কি? পরকাল বলতে কি কিছু আছে? মৃত্যুর পর কি আমাদের আত্মা সত্যিই অন্য কোনো ডাইমেনশনে চলে যাবে? এরকম নানান জল্পনা কল্পনা আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করে। আস্তিক নাস্তিক সহ সকল শ্রেণির মতাদর্শে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। আজ আমরা এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে ফিলোসফি অফ সাইন্স এর দৃষ্টিকোণ থেকে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব।
প্রথমে মাথাই রাখতে হবে যে আত্মা কি। আত্মা সংস্কৃত শব্দ , আরবিতে একে রুহ বলা হয়েছে। রুহ কি এই সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে যে -
وَ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الرُّوۡحِ ؕ قُلِ الرُّوۡحُ مِنۡ اَمۡرِ رَبِّیۡ وَ مَاۤ اُوۡتِیۡتُمۡ مِّنَ الۡعِلۡمِ اِلَّا
قَلِیۡلًا ﴿۸۵﴾
" তোমাকে তারা আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বল, ‘আত্মা আমার প্রতিপালকের আদেশ বিশেষ; আর তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে" ( কোরআন-১৭/৮৫)
روح (রূহ বা আত্মা) এমন অশরীরী বস্তু যা কারো দৃষ্টিগোচর হয় না। কিন্তু প্রত্যেক প্রাণীর শক্তি ও সামর্থ্য এই রূহের মধ্যেই লুক্কায়িত। এর প্রকৃত স্বরূপ কি? তা কেউ জানে না। ইয়াহুদীরাও একদা নবী করীম (সাঃ)-কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়। (বুখারীঃ বনী ইস্রাঈলের তাফসীর, মুসলিমঃ কিতাবু সিফাতিল কিয়ামাহ--) আয়াতের অর্থ হল, তোমাদের জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় অনেক কম। আর এই রূহ (আত্মা), যে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসা করছ, তার জ্ঞান আল্লাহ তাঁর আম্বিয়া সহ অন্য কাউকেও দেননি। কেবল এতটুকু জেনে নাও যে, এটা আমার প্রতিপালকের নির্দেশ মাত্র। অথবা এটা আমার প্রতিপালকেরই খাস ব্যাপার; যার প্রকৃতত্ব কেবল তিনিই জানেন। ( তাফসীরে আহসানুল বয়ান)
কোরআনের এই আয়াত ও তাফসীর থেকে বুঝতে পারি যে রুহ হলো আল্লাহর নির্দেশ, আর এই নির্দেশের অপর নামই জীবন, আর এই জীবন হলো চেতনা সম্পূর্ণ ।
অন্য ভাবে যদি চিন্তা করি তাহলে বিষয়টা এরকম -
আল্লাহর আদেশ - শব্দ - এনার্জি
আল্লাহর আদেশ শব্দ , আর শব্দ মানেই কিন্তু তা এনার্জি। অর্থাৎ এই রুহ হলো এক প্রকার শক্তি, যাকে আমরা জীবন শক্তিও বলে থাকি আর এই শক্তির জন্যই আমরা চেতনা সম্পূর্ণ জীবন পেয়েছি। আমাদের মৃত্যুর পর এই রুহ বা শক্তিই মূলত ইহকাল থেকে পরকালে গমন করবে।
রুহ যেহেতু শক্তি বা এনার্জি তাই এর কোনো ওজন/ ভর ( দুটো আলাদা জিনিস) হবে সাধারণ ভাবে...... আর এই কারণে রুহের ওজন পরিমাপ করা মূর্খামি বৈ কিছুই না যেমনটা আগে করার চেষ্টা করা হয়েছিল...... ।
ইউনিভার্স এতে শক্তির অস্তিত্বই মূলত রুহ এর অস্তিত্বকে প্রমাণ করে কেননা রুহ নিজেও এক প্রকার শক্তি, তবে তা কোন প্রকার শক্তি তা আমরা জানি না যেমনটা কোরআনে আল্লাহ নিজেই বলেছেন যে ' এই ব্যাপারে আমাদের কমই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে...... ।
ইসলামিক ফিলোসোফি ভিউ থেকে বলতে গেলে এই রুহ কেন অবেচতন না বরং চেতন সত্ত্বা এবং এর মাধ্যমেই আমাদের জীবন সংজ্ঞায়িত হয়েছে এবং সঞ্চালন হচ্ছে ...... ।
তো আমরা রুহ এর আরেকটা অবস্থা পাচ্ছি তা হলো চেতন। তো রুহ এর যে তিন অবস্থা আমরা এখন পেলাম সেটা হলো -
প্রাণ
চেতন
শক্তি
এই তিনের সমষ্টি হলো একটা রুহ বা আত্মা। যদি এতটুকু বুঝে থাকেন তাহলে চলুন সামনে এগিয়ে যায় -
ফিলোসোফি অফ সাইন্স এতে একটা টার্ম আছে যাকে ' Biocentrism ' বলে। এখন আমাদের বুঝতে হবে যে এই বায়োসেন্ট্রিজম ' আসলে কি -
"Biocentrism বা জীবনকেন্দ্রিকতা একটি দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, যা প্রমাণিত নয় কিন্তু কোয়ান্টাম ফিজিক্স থেকে অনুপ্রাণিত। রবার্ট লানজা এবং ববি বিসওয়াসের বই Biocentrism (২০০৯) এবং Beyond Biocentrism (২০১৬)-এ এটি বর্ণিত"
এই Biocentrism এর মূল ধারণা হলো -
চেতনা মহাবিশ্বের ভিত্তি, পদার্থ নয়। সাতটি নীতি আছে, যার মধ্যে কয়েকটি:প্রথম নীতি: বস্তুবাদ ভুল কোনো বস্তু চেতনা ছাড়া অস্তিত্বশীল নয়।দ্বিতীয় নীতি: আমাদের অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের সীমিত ব্যাখ্যা; বাস্তবতা সম্ভাবনাময়।চতুর্থ নীতি: সময় এবং স্থান চেতনার "টুল", বাস্তবে নেই (যেমন কোয়ান্টামে কণা অবস্থানহীন)।এতে মৃত্যু শরীরের শেষ, চেতনার নয়, চেতনা "আপগ্রেড" হয় অন্য রিয়েলিটিতে।
সাধারণ তো এই Biocentrism এর পক্ষে কোয়ান্টাম প্রমাণসমূহও পেশ করা হয়, যেমন - লানজা কোয়ান্টামের এই ফিচারগুলো ব্যবহার করেন -
অবজারভার ইফেক্ট
ডাবল-স্লিট পরীক্ষায় (১৯২৭, ডেভিসন-জার্মার), ইলেকট্রন তরঙ্গ হিসেবে আচরণ করে যতক্ষণ না পর্যবেক্ষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণ চেতনা-নির্ভর।
সুপারপজিশন: কণা একসাথে একাধিক অবস্থায় থাকে (শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল উদাহরণ), যতক্ষণ না পর্যবেক্ষিত হয়।এনট্যাঙ্গলমেন্ট: দূরবর্তী কণা তাৎক্ষণিকভাবে যুক্ত (EPR paradox, ১৯৩৫; পরীক্ষিত ২০১৫-এ নোবেল পুরস্কার)। এটি "অনন্ত দূরত্বের যোগাযোগ" সূচিত করে, যা মৃত্যুর পর চেতনা-স্থানান্তরের মেটাফর।
ডিলেড চয়েস এক্সপেরিমেন্ট (Wheeler, ১৯৭৮): অতীতের ঘটনা বর্তমান পর্যবেক্ষণে বদলে যায় সময় চেতনা-নির্ভর।এগুলো দেখায়, অণু-পরমাণুর জগতে বাস্তবতা "অদ্ভুত" এবং চেতনা-সংযুক্ত।
মৃত্যু এবং চেতনার ভবিষ্যৎ Biocentrism-এ মৃত্যু "ইল্যুশন
যেমন স্বপ্ন শেষ হলে জাগ্রত অবস্থায় চলে যাওয়া । চেতনা মাল্টিভার্সে (অনেক মহাবিশ্ব) "লুপ" করে, সম্ভাব্যতার মধ্যে থাকে। উদাহরণ: আমাদের জীবন একটা সম্ভাব্যতার "ওয়েভ ফাংশন"; মৃত্যুতে তা কল্যাপ্স করে নতুন শাখায়। এটি শোপেনহাওয়ারের "ভিল অফ মায়া" (ভ্রান্তি) এর সাথে মিলে: জন্ম-মৃত্যু চক্র চেতনার খেলা।
আরেকটা কথা এই তত্ত্বের কিন্তু সমালোচনাও আছে, যেমন -
কোয়ান্টাম ইফেক্ট ডিকোহিয়ারেন্স (পরিবেশের সাথে মিশে যাওয়া) এর কারণে ম্যাক্রোস্কেলে (মস্তিষ্কে) অদৃশ্য হয়। নিউরোসায়েন্স বলে চেতনা নিউরনের কাজ (যেমন integrated information theory)।
তবে লানজা দাবি করেন, এটি বিগ ব্যাং ব্যাখ্যা করে মহাবিশ্ব চেতনা ছাড়া অর্থহীন।বর্তমান অবস্থা: ২০২৬ পর্যন্ত পরীক্ষামূলক প্রমাণ নেই; এটি হাইপোথেসিস। PubMed/Scopus-এ সমালোচনামূলক পেপার আছে (যেমন "Quantum Approaches to Consciousness" review, ২০২৩)।শেষ কথা: এটি বিজ্ঞান এবং দর্শনের সেতু মৃত্যুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তো আমরা পুরো আলোচনার এই বিষয়গুলো মাথাই রেখে একটা সারাংশ এখন টানতে পারি তা হলো -
ফিলোসোফি অফ সাইন্স এখনও রুহ ( চেতনা) ও পরকাল ( যাকে আমরা অন্য ডাইমেনশন ধরতে পারি) এই সম্পর্কে পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থান গ্রহণ করে না তবে যদি নিরপেক্ষ ভাবে বলতে হয় তাহলে বিজ্ঞানের দর্শন থেকে বলতে হয় যে রুহ( চেতনা) পরকাল ( ডাইমেনশন) এগুলোর কিছুটা হলেও রিয়েলিটি আছে। স্ট্রিং থিওরি মোতাবেক অনেকগুলো ডাইমেনশন ( মাত্রা) আছে আর একেক মাত্রা একেক রকম, আমরা এখনও সঠিক ভাবে এগুলোর ব্যাপারে জানি না। তো হতেও পারে যে পরকাল এর অস্তিত্ব থাকতেও পারে যা দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও আমরা কিছুটা হলেও আচ করতে পারি......
তথ্যসূত্র -
কোরআন-৭/৮৫ - তাফসীরে আহসানুল বয়ান
https://www.academia.edu/45045640/Biocentrism_Robert_Lanza
https://www.robertlanzabiocentrism.com/biocentrism-wikipedia/
https://en.wikipedia.org/wiki/Dimension
https://www.britannica.com/science/string-theory
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।