জীবন সত্যিই ভীষণ বৈচিত্র্যময়।
এই লেখাটা কোনো কল্পনার গল্প না, কোনো সাজানো অনুভূতিও না। এগুলো আমার বাস্তব জীবন—আমি সত্যিই এভাবেই বেঁচেছি, এভাবেই অনুভব করেছি, আর এই মানুষগুলোর ভেতরেই বড় হয়েছি।
পড়াশোনার তাগিদে কিছুদিন পর শহরে যেতে হবে। অথচ এখনই মনটা কেমন হাহাকার করে ওঠে। বাড়িতে ক’দিন ভালো করে ঘুরছি—এখানে সেখানে—আর অজান্তেই স্মৃতিগুলো চোখ ভিজিয়ে দেয়।
বাগানে বসে কত বিকেল ছাগলের বাচ্চার সাথে বকবক করেছি।
বিছানার পাশে জানালার গ্রিল ধরে বাচ্চাদের মতো ঝুলে থাকতাম—ঠাস করে বিছানায় পড়ে যেতাম, আবার উঠে দাঁড়াতাম, আবার বাইরে তাকিয়ে গাছগুলো দেখতাম। কখনো ভাবতাম, এই ছোট্ট বেল গাছে কি জিন আছে? নাহলে রাতে আমাকে বিড়ালের মতো “মিউ মিউ” করে কে ভয় দেখায়? তবু আমি ভয় পেতাম না—কিছুক্ষণ পর শব্দ থেমে যেত।
আমার এলোমেলো টেবিলটা…
সে জানে আমি কতবার চুপচাপ তার সামনে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি। কতবার নীরবে, কণ্ঠহীন চিৎকারে কেঁদেছি। বাড়িতে কতবার বকা খেয়েছি—“নোংরা করে রাখো কেন? বড় হচ্ছো, পরিষ্কার থাকতে শেখো না?”
দেখতে দেখতে বাবা বা মা একদিন গুছিয়ে দিতেন। বাবা অফিস করে এসে রাতে আমার টেবিল গোছাতে গোছাতে বলতেন, “তুমি বোঝো না।” আমি চুপ করে থাকতাম। তারপর হেসে বলতেন, “এইটা আমার পাগলি মা—এখনো বুদ্ধিশুদ্ধি হয়নি।”
জীবনে প্রথম মাছ কাটতে বসেছিলাম একবার। শেষমেশ মাছটাকে এমনভাবে ধরেছিলাম যে ছোট মাছটা মরেই গেল। তবু বাবা খুশি হয়ে বলেছিলেন, “যেমনই হোক, চেষ্টা তো করেছো।” সেই খুশিতে মিষ্টি নিয়ে এসেছিলেন।
মাকে বলতেন, “ওরা তো ছোট—বুঝিয়ে বলতে হয়।”
রাস্তার ধারের টগর গাছে পানি দিতাম। বকা দিয়ে বলতাম, “রোজ রোজ রাস্তার ময়লায় সৌন্দর্য নষ্ট করো কেন? শেষমেশ তো আমাকেই এসে বিকেলে তোমাদের গোসল করাতে হয়।”
ছাগলের বাচ্চাটাকে বলতাম, “তুমি তো আমার ছোট। আমার ছোটদের খুব ভালো লাগে। চলো, আমরা বন্ধু হই।” তারপর সত্যিই তাকে বন্ধু বানিয়ে গল্প করতাম।
একবার ১৩০০ টাকা জমিয়েছিলাম—ঈদের বোনাস জমিয়ে। ভাবতাম, একটা ছোট্ট বোন কিনে আনবো। তখন তো বুঝতাম না।
সবাই যখন ক্ষেপিয়ে বলত, “তুই তো আসলে ভূত—তোর বাড়ির সামনের বটগাছে আকাশ থেকে একটা ভূত হাত বাড়িয়ে গাছের কোটরে রেখে গিয়েছিল”—আমার সরল মন সেটাই সত্যি ভেবে নিত। লুকিয়ে গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। দুটো কাক উড়ে কোথায় যায়, আবার আসে—ভাবতাম, ইস! কেন আমাকে এখানে রেখে গেলে? তোমাদের কাছেই রাখতে পারতে। তখন একসাথে আকাশ দেখতাম।
একবার লুকোচুরি খেলতে গিয়ে পিঁপড়ে কামড় দিয়েছিল। কেঁদে কেঁদে বড় ভাইয়াকে খুঁজে বের করেছিলাম। আমার জন্যই সেদিন ভাইয়া ধরা পড়ে গিয়েছিল। তখন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে আগে ভাইয়াদের কানে কানে বলতাম—“এখন কী করবো আমি?”
এক সময় ভাবতাম, মাইকিং হচ্ছে মানেই দুনিয়া বুঝি শেষ—কেয়ামত বুঝি কালই।
আল্লাহকে প্রশ্ন করতাম, “আমাদের মানুষ বানালে কেন? আল্লাহ বানিয়ে দিলে না? তাহলে তো অনন্তকাল একসাথে থাকতে পারতাম।”
কিছু বছর আগেও ভাবতাম মানুষ হয়তো ১০০ দিন বাঁচে।
এখন একটু বড় হয়েছি—তবু প্রিয় মানুষ আর প্রিয় জিনিসের সাথে বাচ্চাদের মতো স্বভাবগুলো যায়নি।
হঠাৎ আজ দেখি—শহরে যেতে হবে।
তারপর হয়তো ক’দিন বাড়ি আসবো, আবার চলে যাবো। কিছু বছর পর হয়তো বিয়ে হয়ে যাবে। যে বাবা আজ বলে, “ময়নাকে ছাড়া বাড়িটা ফাঁকা,” সেই বাবাই একদিন ফোন করে বলবে, “তোমরা সবাই মিলে বাড়িতে এসো।”
তখন বাড়িটা হবে আত্মীয়ের বাড়ির মতো। আমার জন্য বলবে, “এতদিন পর এসেছে”—কত রকম রান্না করবে, যেন আমি অতিথি।
আর হয়তো জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে বিছানায় পড়ে একা হাসবো না।
ঘরের কোণে অদৃশ্য বন্ধু ভেবে কারও সাথে গল্প করবো না।
হেসে ফেলি… 🙂
কত কিছু ভেবে ফেলেছি, তাই না?
কিছুক্ষণের মধ্যেই কেমন সেই ছোট্ট মেয়েটা বড় হয়ে গেল। কতদূর চিন্তা করে ফেলল।
তবু আমি তো এখনো আমার বর্তমানেই আছি। এখনো ছোট—তবে এতটাও ছোট না, যতটা মাঝে মাঝে
আমার স্বভাব করে তোলে। 🙂
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।