গল্পের নাম:অহংকারের নীল পদ্ম
লেখকঃ হিমানী হিমাদ্রি
(প্রথম পর্ব)
ভার্সিটির করিডোরে তখন গুঞ্জন—নতুন এক স্যার জয়েন করেছেন। নাম অনিন্দ্য। সবাই বলাবলি করছে তিনি নাকি দারুণ হ্যান্ডসাম, কিন্তু মেজাজটা বড্ড চড়া। ইশিতা এসব শুনে মুখ বাঁকাল। তার কাছে এধরণের 'অ্যাটিটিউড' দেখানো মানুষগুলো বরাবরই অসহ্য।
ক্লাসের প্রথম দিন। ইশিতা বন্ধুদের সাথে পেছনের বেঞ্চে বসে হাসাহাসি করছিল। ঠিক তখনই ক্লাসে ঢুকলেন অনিন্দ্য। পরনে গাঢ় নীল শার্ট, চোখে মেটালিক ফ্রেমের চশমা। তাঁর হাঁটার ছন্দে একটা রাজকীয় অহংকার ছিল। ক্লাসে ঢুকেই তিনি কোনো ভূমিকা ছাড়া বোর্ডে মার্কার দিয়ে খসখস করে লিখতে শুরু করলেন। পুরো রুম এক নিমিষেই কবরের মতো নিস্তব্ধ।
ইশিতা ভাবল, "ইশ! এতো দেমাগ কিসের?" সে ইচ্ছা করেই একটু জোরে একটা মন্তব্য করল পাশের বন্ধুকে। অনিন্দ্যর কান এড়ালো না সেটা। তিনি ঘুরে তাকালেন। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন চশমা ভেদ করে ইশিতার ওপর আছড়ে পড়ল।
"আপনি কি এখানে আড্ডা দিতে এসেছেন, নাকি পড়তে?"—অনিন্দ্যর কণ্ঠস্বর ছিল বরফের মতো শীতল।
ইশিতা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা-আমতা করে বলল, "না স্যার, আমি আসলে..."
"অজুহাত নয়। পরের বার এমন হলে আপনি আমার ক্লাসের বাইরে থাকবেন।"
ইশিতার জেদ চেপে গেল। মনে মনে ভাবল, "দেখে নেব আপনাকে। এতো বড় সাহস!" সেই দিন থেকেই অনিন্দ্যর ওপর এক ধরণের চাপা রাগ আর বিরক্তি দানা বাঁধল ইশিতার মনে। সে শপথ করল, এই মানুষের ছায়াও মাড়াবে না।
কিন্তু ভাগ্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। একদিন ক্লাসের একটা কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে ইশিতা খুব বিপাকে পড়ল। বাধ্য হয়ে তাকে ক্লাসের পর অনিন্দ্যর ডেস্কে যেতে হলো। অনিন্দ্য তখন কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু ল্যাপটপে টাইপ করছিলেন। ইশিতাকে দেখে চশমাটা টেবিলের ওপর রাখলেন।
"বলুন, কী সমস্যা?"
ইশিতা জড়োসড়ো হয়ে তার খাতাটা এগিয়ে দিল। অনিন্দ্য খাতাটা দেখতে দেখতে বললেন, "আপনার লেখায় বুদ্ধি আছে ইশিতা, কিন্তু মনোযোগের বড্ড অভাব। আপনি কি সব সময় এতো অস্থির থাকেন?"
ইশিতা এবার আর নিজেকে দমাতে পারল না। সে ঝট করে বলে বসল, "সবাই আপনার মতো এতো গম্ভীর আর পারফেক্ট হতে পারে না স্যার। আমরা মানুষ, রোবট নই।"
অনিন্দ্য অবাক হয়ে ইশিতার দিকে তাকালেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল—যেটা ইশিতা আগে কোনোদিন দেখেনি। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, "রোবট হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমারও নেই। কিন্তু এই নিষ্ঠুর দুনিয়ায় নিজেকে আড়াল করতে মাঝে মাঝে রোবট সাজতে হয়।"
সেই মুহূর্তে ইশিতার রাগটা কেন জানি এক নিমিষেই জল হয়ে গেল। সে দেখল, এই কঠোর মানুষটার চোখের গভীরতা অনেক বেশি। সেখান থেকেই ইশিতার মনের মোড় ঘুরতে শুরু করল। বিরক্তিটা কখন যে মুগ্ধতায় পাল্টে গেল, সে নিজেও টের পেল না।
সেই ঘটনার কয়েকদিন পর। রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। ইশিতা বিছানায় শুয়ে ডায়েরি লিখছিল। হুট করেই তার ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সেই পরিচিত মায়াবী কণ্ঠ।
"ঘুমালে?"—অনিন্দ্যর গলা।
ইশিতা স্তম্ভিত। "স্যার? আপনি এই সময়ে ফোন দিয়েছেন?"
"জানি সময়টা অদ্ভূত। আজ ক্লাসে তোমাকে খুব মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখলাম। শরীর ঠিক আছে তো?"
ইশিতা অবাক হলো। সে তো ভেবেছিল অনিন্দ্য তাকে লক্ষ্যই করেন না। সে কাঁপা গলায় বলল, "না স্যার, এমনিই। আপনি আমার খোঁজ নিচ্ছেন দেখে অবাক হচ্ছি।"
অনিন্দ্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আসলে ক্লাসে আমি যা দেখাই, সেটা আমি নই ইশিতা। সারাদিন শিক্ষকতার এই মুখোশটা পরে থাকতে থাকতে আমি হাঁপিয়ে উঠি। শুধু ভাবলাম, তোমার মতো এমন একটা প্রাণবন্ত মেয়ের সাথে কথা বললে হয়তো আমার বিষণ্ণতাটা একটু কমবে।"
শুরু হলো সেই জাদুকরী অধ্যায়। যে মানুষটাকে ইশিতা অপছন্দ করত, তাঁর সাথেই সে রাত জেগে কথা বলতে শুরু করল। অনিন্দ্য ধীরে ধীরে সহজ হলেন। তিনি এখন আর শুধু লেকচার দেন না, বরং নিজের একাকীত্ব আর অন্ধকারের কথা শোনান। ইশিতা বুঝল, এই মানুষটা আসলে বাইরে থেকে পাথর হলেও ভেতরে ভীষণ নিঃসঙ্গ।
অনিন্দ্য একবার হেসে বললেন, "শুরুতে তো আমাকে একদম সহ্য করতে পারতে না, তাই না?"
ইশিতা লজ্জা পেয়ে বলল, "আপনিই তো এমন খিটখিটে ছিলেন। আমার কী দোষ?"
"হয়তো তোমার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই ওটা আমার চাল ছিল।"—অনিন্দ্যর এই অগোছালো স্বীকারোক্তি ইশিতার ঘুম কেড়ে নিল।
এভাবেই বন্ধুত্বটা প্রেমে গড়াতে শুরু করল। কিন্তু ইশিতা জানত না, এই মানুষটা নিজের ইগো আর ইমেজের কাছে কতোটা অসহায়। ঝড়ের আগে সমুদ্র যেমন শান্ত থাকে, তাঁদের এই সম্পর্কটাও তখন তেমনই ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।