#অন্ধকারে_আলো
#অবন্তী_শ্রীয়া
#পর্ব_০১
নীড়পাড়া গ্রামের কবরস্থানের কিছুদূরে দাঁড়িয়ে আছে কেয়া।প্রায় ২০ মিনিট ধরে সে দাঁড়িয়ে তিনটা কবর তাকিয়ে দেখছে,মনে মনে অনেক কথা বলছে।হয়তো মনের মধ্যে যত কষ্ট,অভিমান জমে আছে সব প্রকাশ করছে।হঠাৎ তার হাতে থাকা ফোনটা বেজে ওঠে।ফোনের শব্দে তার ধ্যান ভাঙ্গে।ফোনে তাকিয়ে দেখে তার স্বামী কল করছে।অনেকক্ষণ হয়েছে বের হয়েছে তাই হয়তো চিন্তা করছে।সে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রাগান্বিত স্বরে বলে উঠল_
-এই অসময়ে একা কোথায় চলে গিয়েছো অসুস্থ শরীর নিয়ে?
-একটু হাঁটতে বেরিয়েছি।সারাদিন ঘরে শুয়ে বসে থাকতে ভালো লাগছিলো না।
-কোথায় আছো এখন বলো,আসছি আমি।
-তোমার আসতে হবে না,আমি বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি।
-ঠিক আছে,আসো।
-হুম।
বলেই ফোনটা কেটে দিলো।আরেকবার কবরটার দিকে তাকিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরলো।কেয়ার ৮মাস ২৩ দিন চলে গর্ভাবস্তার।ডেলিভারির বেশি দেরি নেই।শরীর প্রায়ই দূর্বল থাকে তার।বমি হয় অনেক।ডাক্তার বলেছে রক্ত শূণ্যতা আর অতিরিক্ত চিন্তার কারণে দূর্বল থাকে বেশি।শহরে একা থাকার কারণে আজেবাজে চিন্তা ভাবনা করায় এমন হয়েছে ভেবে তার হাসবেন্ড তাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছে।তাহলে ডেলিভারির সময় একা থাকবে না।
কেয়া বাড়িতে আসতেই তার শ্বাশুড়ি তাকে বকতে শুরু করলেন অসময়ে বাইরে যাওয়ার কারণে।তাকে হাত-মুখ ধোয়ে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে বলে।কেয়া ধীরে ধীরে ঘরের দিকে যায়।ঘরে গিয়ে তার স্বামীকে পায়না হয়তো বাইরে গিয়েছে।সে সোজা বিছানায় গিয়ে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে।শুয়ে শুয়ে সে অতীতের কিছু স্মৃতি স্নরণ করতে থাকে,,,,,
অতীত-----
তিনদিন যাবত একাধারে বৃষ্টি হচ্ছে।কখনো কম না বেশি।কিন্তু থামার নাম নেই।বারান্দায় চৌকির উপর বসে কেয়া আচার খাচ্ছিলো আর বৃষ্টি দেখছিলে।এই বৃষ্টির মধ্যে আব্বা কলেজ দিয়ে আসেনি।আম্মা রান্না ঘর পরিষ্কার করছেন দুপুরের রান্না শেষে।হঠাৎ কুহু এই বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে বাড়িতে ঢুকে হাতে অনেকগুলো শাপলা নিয়ে।পায়ে কাঁদা দিয়ে মাখামাখি।কেয়ার সামনে গিয়ে বললো,
-আপা দেখ শাপলাগুলো কি সুন্দর ফুটে আছে।তোকে মালা বানিয়ে পরিয়ে দেই।
কেয়া কিছু বলার আগেই ফাতেমা আক্তার রেগে বলেন,,,
-একদম ওর কাছে যাবি না।কখন পাঠাইছি তোকে মন্টুর বাড়ি থেকে দুধ নিয়ে আসতে।এতক্ষণ লাগে।
-আম্মা আমি....
কুহু কথা শেষ করার আগেই ফাতেমা রেগে গলা ছেড়ে বলেন,
-কতদিন বলছি আমি তোর মা না।আমাকে আম্মা ডাকবি না।কথা কী কানে যায় না তর।তর মা অন্য বেডার সাথে পালাই গেছে।নষ্টা মার নষ্টা মেয়ে।
কেয়া বিরক্ত হয়ে বলল-আম্মা...!কী সমস্যা তোমার।
-সমস্যা তো এই মেয়ে।কে জানে কার সাথে শুয়ে জন্ম দিছে।কেউ শুনলে তো আমার কথা।
-আম্মা।তোমার মুখে কী কিছুই আটকায় না?
ফাতেমা বেগম আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে যায়।কেয়ার খুব রাগ লাগে যখন আম্মা কুহুর সাথে খারাপভাবে কথা বলে।কিন্তু মায়ের মুখের উপর তো বেশি কথা সে বলতে পারে না।এদিকে কুহু শাপলাগুলো বারান্দায় রেখে দৌড়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়।কেয়া,জানে কুহু এখন কোথায় যাবে।তাই সে ছাতা নিয়ে কুহুর পিছনে যায় আস্তে ধীরে।
---------
-মা,তুমি আমাকে একা রেখে কেন গেছো?তুমি ও কী আমাকে দেখতে পারোনা?যাওয়ার আগে আমাকে মেরে যেতে পারলে না?তুমি জানতে না তোমার একটা অংশ এখানে পড়ে আছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করে-তারা তোমাকে সহ্য করতে পারতো না,এটা একবারো ভাবলে না তোমার অংশকে কীভাবে সহ্য করবে?এই ছোট মেয়েটা কীভাবে থাকবে একবার ভাবতে পারলে না।স্বার্থপরের মতে অন্যের কাছে চলে গেছো।তুমি নিজের সুখটা দেখলে শুধু।তুমি খুব খারাপ মা।তুমি অনেক স্বার্থপর।
কুহু বাড়ির পিছনের বড় কাঁঠাল গাছের নিচে বসে কান্না করছে।তার মায়ের জন্য জমে থাকা অভিমানের কথা বলে।কিন্তু তার মা উত্তর দেয় না।দিবে কীভাবে সে তো এখানে নেই।কেয়া নিঃশব্দে কুহুর পিছনে এসে দাঁড়ায়।কিছুক্ষণ কুহুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
-এভাবে বৃষ্টিতে আর ভিজিস না।ঠান্ডা লেগে যাবে।বাড়িতে চল।
-তুই যা আপা।আম্মা আমার সাথে তোকে দেখলে আবার বকবে।
-বকুক,তুই চল আমার সাথে।
কেয়া জোর করে কুহুকে বাড়িতে এনে গোসলে পাঠায়।সে যে বোনটাকে খুব ভালোবাসে।মা আলাদা তো কি হয়েছে বাবা তো এক।রক্ত তো এক।আর কি চাই।
-----------
নীরপাড়া গ্রামে মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে একটি শেখ পরিবার।কামরুল শেখ বাড়ির বড় কর্তা।তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম।কামরুল শেখের পিতা বড় বাড়ির মেয়ে দেখে ফাতেমার সাথে বিয়ে দেন।কিন্তু সে পছন্দ করতো কুহুর মা জান্নাতকে।জান্নাত ছিলো কৃষকের মেয়ে।কামরুল শেখের পিতা মারা যাওয়ার কয়েক মাস পরে তিনি জান্নাতকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।একে তো জান্নাত কৃষকের মেয়ে আবার শ্যামলা তাকে কেউ পছন্দ করতো না বাড়ির।কামরুল শেখের মা জহরুন্নেসা ছিলেন লোভী।সেও টাকা,ধন সম্পদের জন্য ফাতেমাকে পছন্দ করতেন।কামরুল শেখ ফাতেমাকে অবহেলা করতেন এমনটা না।তিনি চাইতেন ফাতেমা আর জান্নাত বোনের মতো মেনে নিক।কিন্তু বাঙালী মেয়ে কী আর সতীনের সংসার করতে চায়?সবসময় জান্নাতকে দিয়ে খাটাতেন।কটুকথা বলতেন।এভাবেই চলছিলো সময়।হঠ্যাৎ একদিন জানতে পারে জান্নাত গর্ভবতী।সে এক ছেলের জন্ম দেন।কামরুল এতে খুব খুশি হয়েছিলো।কিন্তু তাদের এই খুশি বেশিদিন টিকে থাকেনি।আকিকার আগের দিন রাতে হঠ্যাৎ করে বাচ্চাটির মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে থাকে শরীর নীল হওয়া শুরু করে।কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই বাচ্চাটির শরীর নিরব হয়ে যায়।৬ দিনের বাচ্চা দুনিয়া থেকে চলে যায়।এতে শেখ পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে।ফাতেমা ও বাচ্চাটা মায়া যাওয়ায় অনেক কেঁদেছিলো।তার তখনও কোনো সন্তান ছিলো না বলে হয়তো।এর বছর খানেক পরে ফাতেমার কোলজুড়ে আসে তাদের বড় ছেলে কাব্য।সে পড়ালেখা শেষ করে এখন বাবার মিলের দেখাশুনা করে।আরও ৫ বছর পর জন্ম হয় কেয়ার।সে এখন কলেজে পড়ে।আর তার ১বছর পর আবার জান্নাত এর কোলে আসে এক মেয়ে,যার নাম রাখা হয় কুহু।ফাতেমা কুহুকে দেখতে না পারলে ও তেমন পাত্তা দিতেন না।
একবার কামরুল শেখ কয়েকদিনের জন্য শহরে যান কিছু জরুরি কাজে।কিন্তু কাজ শেষে বাড়িতে এসে শুনতে পান জান্নাত নাকি অন্য পুরুষের সাথে পালিয়ে গেছে।তিনি কারো কথা বিশ্বাস না করে আশে পাশের কিছু গ্রামে জান্নাতের খোঁজ করেন।কিন্তু কোনো খোঁজ পায়না।তখন কুহুর বয়স ৩ বছর।মেয়েটা সারাদিন মায়ের কোল খুজতো,আদর খুজতো।কামরুল মেয়েকে বুকে নিয়ে সান্তনা দিতেন।সে ছাড়া যে মেয়েটার আপন বলতে আর কেউ নেই।কুহুকে দেখে ৪ বছরের কেয়া কিছু বুঝতে না পারলে ও তার খুব কান্না পেতো।তখন থেকে সে কুহুকে আগলে রেখেছে।সব বিপদ থেকে যতটুকু পেরেছে আগলে রেখেছে।
-----------
দুপুরে কামরুল শেখ নিজের হোন্ডা গাড়িটি চালিয়ে ধানের মিল থেকে বাড়ি ফেরেন খাবার খেতে।এসে দেখতে পায় কুহু বারান্দায় মন খারাপ করে বসে আছে।তিনি কুহুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাস করেন কী হয়েছে।কুহু তারাতারি চোখ মোছে বলে,
-কই!কিছু নাতো আব্বা।
-দুপুরে কিছু খেয়েছিস?
-না,পরে খাবে।তুমি যাও হাত-মুখ ধোয়ে আসো।আমি আম্মা আপাকে ডেকে আনি।
কামরুল শেখ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন।কুহুর যাওয়ার দিকে কিছুক্ষণ অপরাদী চোখে তাকিয়ে ছিলেন।মেয়েটাকে তিনি কোনো সুখ দিতে পারলেন না।কুহু চলে যেতেই তিনি ক্লান্ত শরীরে উঠে ঘরের দিকে পা বাড়ান।
----------
খাবার টেবিলে কামরুল শেখ,কাব্য,জহুরুন্নেসা,কেয়া এবং কুহু খেতে বসেন।ফাতেমা খাবার বেড়ে তিনিও বসে পড়েন।খাওয়ার মাঝে কামরুল শেখ সবার উদ্দেশ্যে বলেন-পরশুদিন আমার বন্ধু আহসান তার পরিবার নিয়ে আসবেন কেয়া কে দেখতে।তারা কিছুদিন এখানে থাকবে।গ্রামটা ঘুরে দেখবে।আর কেয়াকে পছন্দ হলে বিয়ের কথাবার্তা সেরে ফেলবে।
এবার কেয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন-কেয়া তোমার কেনো আপত্তি আছে বিয়ে করতে?
কেয়া একটু ইতস্ত হয়ে বলল,
-আসলে আব্বা মাত্র তো কলেজে উঠলাম।এখনই যদি বিয়ে না দিতে ভালো হতো।
-চিন্তা করো না তারা শুধু আকদ্ করে রাখবে।তোমার কলেজ শেষ হলে তুলে নিয়ে যাবে।
কেয়া আর কিছু বলল না।কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে কান্না করে দিচ্ছে।কামরুল শেখ আরো কিছু কথা বলে খাওয়া শেষ করলেন।খাওয়া শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে কাব্যকে নিয়ে আবার মিলে চলে গেলেন।আজকাল ব্যবসায় লস যাচ্ছে খুব।
বিকেলের দিকে বৃষ্টি কিছুটা থামলে কেয়া আর কুহু বাইরে বের হয়।ফাতেমা ঘরে বসে বাংলা সিনেমা দেখছেন।কুহু বের হতে চায়নি এই কাঁদার মধ্যে।কেয়া জোড় করে নিয়ে এসেছে।তার যে এখন একজনের সাথে দেখা করাটা খুব জরুরি।হাঁটতে হাঁটতে দুজন এসে পৌঁছায় স্কুলের পিছনে বড় একটা কদম গাছের নিচে।এদিক দিয়ে বিল বয়ে যাওয়ায় জায়গাটা আরো সুন্দর লাগে।এসে দেখতে পায় তুহিন আগে থেকেই সেখানে বসে আছে।তুহিনকে দেখে তারা সেদিকে যায়।কেয়া আর তুহিনের সম্পর্ক ২বছর যাবত।তুহিনের বাবার কাঁচা সবজির ব্যবসা।নিজের ক্ষেতে সব মৌসুমি সবজি চাষ করেন এবং বাজারে বিক্রি করেন।মোটামুটি ভালো পরিবারের ছেলে তুহিন।তুহিনরা তিন ভাই বড় ভাই বিদেশ থাকে।মেজো ভাই বাবার সাথে সবজির কাজ করে।আর তুহিন আপাদত কিছু করেনা।পড়ালেখাও কলেজের পরে আর করেনি।সারাদিন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়।কেয়া তুহিনের কাছাকাছি এসে বলে,
-আব্বা আমার বিয়ে ঠিক করেছে তার বন্ধুর ছেলের সাথে।শহরের শিক্ষিত ছেলে।
-সে তো ভালো কথা।তা কবে হচ্ছে বিয়ে?
-মজা করছ এখনো।তুমি কী আমাকে ভালোবাসো না?বিয়ে করতে চাও না আমাকে?
-ভালোবাসি বললেই কী ভালোবাসা হয়!আর ভালোবাসলেই কেনো পেতে হবে?
তুহিনের কথা শুনে কেয়া অবাক হয়ে যায়।এসব কী উল্টা পাল্টা বলছে তুহিন।সে কী এতদিন তাহলে কেয়ার সাথে শুধু সমা কাটিয়েছে।ভালোবাসেনি কেয়াকে?এসব প্রশ্ন মাথার ভিতর ঘুরাঘুরি করছে।তক্ষুণি তুহিন কেয়ার কপালে আঙ্গুল দিয়ে টোকা দিয়ে তার ধ্যান ভাঙ্গায় আর বলে,
-তুমি আগে সাহস করে তোমার বাপের কাছে আমাকে চাও,বাকিটা আমি দেখে নিবো।রাজি হলে তো ভালো আর না হলে
-না হলে কী?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।