#হিন্দু_ধর্মে_বর্ণপ্রথা_জন্মগত_নাকি_কর্মগত_একটি_সংক্ষিপ্ত_পর্যালোচনা
আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
আজকাল দেখবেন যে কিছু উঠতি বয়সি হিন্দুরা বলে যে বর্ণাশ্রম প্রথা নাকি কর্মগত। অর্থাৎ কর্মের ভিত্তিতে নাকি বর্ণ ঠিক হয়। তারা তাদের কথার পক্ষে গীতার একটা শ্লোক বলে থাকে, আর তা হলো -
গীতা ৪:১৩
> “চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশঃ”
অর্থ:
“আমি গুণ ও কর্ম অনুযায়ী চার বর্ণ সৃষ্টি করেছি "
যারা এই শ্লোক দিয়ে এই দলীল গ্রহণ করে যে " কর্মের মাধ্যমে বর্ণ নির্ধারণ হয়!" তারা আংশিক বলে। এখানে কর্ম দ্বারা আসলে কোন কর্ম বুঝাচ্ছে বা গুন বলতে কি বুঝাচ্ছে তা এরা বলে না গীতার আলোকে। বরং তারা নিজেরা নিজের মতো করে অর্থ করে। গীতার এই শ্লোকে কর্ম বলতে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় এর জন্মগত বা স্বভাবজাত গুন কর্মকে বুঝিয়েছে যেটা গীতার
১৮:৪১ শ্লোক দেখলে বুঝতে পারি। সেখানে বলা হয়েছে যে-
> ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশ্যশূদ্রাণাং চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভভৈর্গুণৈঃ॥
অর্থ:
“হে অর্জুন, ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র—এই চার বর্ণের কর্ম স্বভাবজাত গুণ অনুযায়ী নির্ধারিত।”
এখানে বলা হচ্ছে “স্বভাব” দিয়ে কর্ম ঠিক হবে।
, হিন্দু সমাজ ‘স্বভাব’ বলতে জন্মগত প্রকৃতিকে বুঝিয়েছে, অর্থাৎ:
ব্রাহ্মণের সন্তান = ব্রাহ্মণ স্বভাব
শূদ্রের সন্তান = শূদ্র স্বভাব
আপনারা যদি গীতার আদি ভাষ্যগুলো দেখেন তাহলেই তা বুঝতে পারবেন। আর আমি মোঃ মেহেদী হাসান বলছি যে তাদের ভাষ্য সঠিক কেননা তাদের ভাষ্যের পক্ষে প্রমাণ আমরা গীতাতেই পায়। গীতা -
গীতা ৯:৩২
>
"মাং হি পার্থ বিপাশ্রিত্য
যে পি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্
তে পি ইয়ান্ত....
বাংলা অনুবাদ:
“হে পার্থ (অর্জুন)! যে পাপযোনিতে জন্মেছে, যেমন নারী, বৈশ্য, শূদ্ররাও...
এখানে স্পষ্ট ভাবেই শূদ্রদের বৈশ্যদের জন্মগত ভাবে বৈশ্য, শূদ্র হওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানে তারা জন্মগত ভাবেই ব্রাহ্মণ, শূদ্র ইত্যাদি বর্ণ নিয়ে জন্মলাভ করে। আর এসব জন্মের মাধ্যমেই তারা স্বভাবগত কর্ম করে থাকে যা গীতা ১৮/৪১ হয়ে ৪/১৩ শ্লোকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
কর্ম দ্বারাই যদি বর্ণলাভ হতো তাহলে এখানে কেন বলা হলো যে " নারী, শূদ্র এরা পাপযোনির লোক জন্মগত ভাবে?"।
হিন্দু ধর্মে বর্ণপ্রথা যে জন্মগত এর সুস্পষ্ট প্রমাণ আরও আছে। যেমন -
মনুস্মৃতি ১০/৫
> “ব্রাহ্মণাজ্জায়তে ব্রাহ্মণঃ, ক্ষত্রিয়াজ্জায়তে ক্ষত্রিয়ঃ... শূদ্রাজ্জায়তে শূদ্রঃ”
অর্থ:
ব্রাহ্মণের ঘরেই ব্রাহ্মণ জন্মায়, ক্ষত্রিয়ের ঘরে ক্ষত্রিয়, এবং শূদ্রের ঘরে শূদ্র।
এই শ্লোকে তো সরাসরি বলা হচ্ছে যে ব্রাহ্মনের গড়ে ব্রাহৃমণ হয় ক্ষত্রিয়ও এর ঘড়ে ক্ষত্রিও হয়। অর্থাৎ বর্ণপ্রথা কর্মগত না বরং জন্মগত....
তো বর্তমানে ধর্মগ্রন্থ সংস্কারের নামে হিন্দুরা এসব শ্লোক অস্বীকার করে এবং তাদের কথিত বিশুদ্ধ গ্রন্থ থেকে এসব মন্ত্র, শ্লোক বাদ দিয়ে থাকে দুটো মূল লজিক এর উপর ভিত্তি করে।
সেগুলো হলো -
১. বেদ বিরুদ্ধ কথা বাতিল মানে প্রক্ষিপ্ত
২. এগুলো মূল কপিতে নেই
* আমি মোঃ মেহেদী বলব যে তাদের এই দাবি অনুসারে গীতার -৪/১৩ শ্লোক বাতিল ও প্রক্ষিপ্ত, কেননা উক্ত শ্লোক শুক্লবেদ-৩৩/১১ মন্ত্রের বিরুদ্ধে, যেখানে ওইখানে সৃষ্টি আদি থেকেই চারবর্ণ জনৃমগত ভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে সেখানে গীতর এই শ্লোক বলছে তা নাকি কর্মগত করে সৃষ্টি করেছে। বেদের ওই মন্ত্রে বলেছে ব্রহ্মা মুখ থেকে ব্রাহৃমণ আর পা থেকে শূদ্র পয়দা করেছে আর এই গীতার শ্লোক বলছে যে " কর্ম দ্বারা বর্ণ নাকি সৃষ্টি হয়েছে যা বেদপর সাথে সাংঘর্ষিক । বেদের সাথে সাংঘর্ষিক হলে তা বাতিল ( ব্যাস সংহিতা -১/৪) কেননা বেদ হলো মূল ( মনুসংহিতা -২/৬) আর তাই বৈপরীত্যে পেলে বেদকেই আঁকড়িয়ে দরতে হবে জ্ঞানীদের ( মনুসংহিতা -২/১৩) তবে বেদ নিজের মধ্যে নিজে বৈপরীত্যে করলে তা সত্য বলে ধরা হবে ( মনুসংহিতা -২/১৪) আর বেদ বা শ্রুতির সাথে বিরুদ্ধে গেলে শ্রুতি মানা হবে স্মৃতি বাদ দিয়ে ( ব্রহ্মসূত্র-৩/৩/১৮) । গীতা যেহেতু শ্রুতি না বরং স্মৃতি তাই গীতার এই শ্লোক অপ্রমাণ ও অগ্রহণযোগ্য শাস্ত্র মোতাবেক ( পূর্ব মীমাংসা -১/১/৩/৪) ।
* আবার গীতার -৪/১৩ শ্লোক প্রাচীন গীতাতে নেই। আপনারা চেক করে দেখতে পারেন । লিংক -
https://archive.org/details/prachingita_202204
তো দেখুন যারা যেসব যুক্তি প্রমাণ দিয়ে তাদের মতের বিরুদ্ধে যাওয়া শ্লোক গুলোকে প্রক্ষিপ্ত বলে আমরাও সেই একই মেথড অনুসরণ করে সাবিত করে দিলাম যে গীতার-৪/১৩ শ্লোক প্রক্ষিপ্ত। অতএব তা দলীল হিসাবে অগ্রহনযোগ্য হবে না......।
আর তারা যদি এখনও বলে যে গীতা-৪/১৩ গ্রহণীও এবং সেই মোতাবেক বর্ণ ঠিক হবে কর্ম দ্বারা তাহলে সমস্যা তৈরি হবে কিছু। সমস্যা কি তা বুঝিয়ে বলছি।
আমরা হিন্দু গ্রন্থ গুলেতে দেখতে পায় যে শূদ্রের উপর বিভিন্ন জুলুম নির্যাতন এর কথা বলা হয়েছে। ওদেরকে ধর্মীও বই পড়ার অধিকার দেওয়া হয় নি ( মনুসংহিতা -১/১৫৬) তো তারা যদি ধর্মীও শাস্ত্র না পড়ে তাহলে ব্রাহ্মণ হবে কি করে? কেননা ব্রাহ্মণ হতে হলে তো বিদ্যা অর্জন করতে হবে। আর যারা শূদ্র থেকে ব্রাহ্মণ হতে চাই কর্ম করে তারা যদি জ্ঞান অর্জনে কর্ম না করতে পারে তাহলে কখনোই ব্রাহ্মণ হতে পারবে না। অর্থাৎ কর্ম দ্বারা এক বর্ণ থেকে আরেক বর্ণে যাওয়া যে শাস্ত্র মোতাবেক সম্ভব না তা এই ছোট উদাহরণ দ্বারা বুঝতে পারছেন আশা করি, তাই বললাম যে কর্ম দ্বারা বর্ণ নির্ধারন করতে গেলে সমস্যা হবে....
এখন আমরা হিন্দু শাস্ত্রের আলোকে দেখাবো যে হিন্দু ধর্ম মোতাবেক কর্ম না বরং জন্মগত বর্ণ নির্ধারন হয় যা তাদের শাস্ত্রে ইঙ্গিত করে। এই বিষয়ে শুধু রেফারেন্স গুলো এড করে দিলাম-
ঋগ্বেদ -১০/৯০/১২
শুক্ল যজুর্বেদ -৩১/১১
অথর্ববেদ- ১৯/১/৭/১
মনুসংহিতা -১/৩১
মনুসংহিতা -২/২৯ ও ৩০
মনুসংহিতা -২/৩৪
মনুসংহিতা -২/৩০,৩১,৩২,৩৩
গোপথ ব্রাহ্মণ, পূর্বভাগ দ্বিতীয় প্রপাঠক-২
( সংগৃহীত রেফারেন্স ..)
.....
তো এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা দ্বারা আমরা সহজেই বুঝতে পারলাম যে হিন্দু শাস্ত্র ও যুক্তি মোতাবেক কর্ম না বরং জন্মের মাধ্যমেই বর্ণ নির্ধারণ হয়ে থাকে।
আশা করি কথা ক্লিয়ার।
তো সবাই ভালে থাকবেন, সুস্থ থাকবেন
লেখক: মোঃ মেহেদী হাসান✍️
আল্লাহ হাফেজ, আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ
#প্রিন্স_ফ্রেরাসে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।