প্রাচীরের পেস্টুন থেকে আত্মশুদ্ধির পাঠ
—রফিক আতা—
উদাস হেমন্তের অনুভবি মন। মারকাজুল হুদা’র অফিস কক্ষে বসে আছি—এক নিথর সত্তা। সামনে একটি আর্টিকেলের প্রুফ-সম্পাদনা, অথচ করোটির ভেতরে এলোমেলো ভাবনার ঝড়। মাঝে মাঝে মনে হয়, শব্দেরা যেন কাগজের উপর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু নির্দেশের অপেক্ষায়—কোন বাক্যে যাবে, কোন অনুচ্ছেদে বসবে। কিন্তু আমার ভাবনার ঘূর্ণি কোথায় যেন আটকে যায়। কলম হাতে থাকলেও চিন্তা তার নিজস্ব পথে হারিয়ে যাচ্ছে।
কখনো মনে হয়—জীবনের যুদ্ধে কি তবে আমি হারতে বসেছি? যে স্বপ্নগুলো বুকে নিয়ে এত দূর এসেছি, সেগুলো থেকে কি দূরে সরে গেছি? এমন কিছু কি হাতছাড়া হয়ে গেছে, যা ছিল অমূল্য, অপূরণীয়? আবার কখনো ভাবি—জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি? কীসের জন্য এই দিনরাত্রির প্রচেষ্টা, এই পথচলা, এই নিরব ক্লান্তি? কিন্তু প্রশ্নের যতোই পরত খুলতে চাই, উত্তর ততো দূরে সরে যায়। কেবল নীরবতা, উদাসীনতা আর অন্তরের নিঃসঙ্গতা সঙ্গী হয়ে থাকে এই হেমন্ত বিকেলে।
এভাবেই চিন্তার অঘোষিত ছায়ায় যখন ডুবে যাচ্ছি,ঝিমিয়ে পড়া চোখে হঠাৎই ভেসে উঠে অনেকগুলো পেস্টুন। কামরার দেওয়াল জুড়ে যা নীরবে সাঁটা। প্রতিটি পোস্টার, প্রতিটি উক্তি যেন দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিল—কখন আমার চোখ সেদিকে ফেরে। একটি পেস্টুনে হঠাৎই চোখ জোড়া স্থির হয়ে যায়। তাতে লেখা হযরত আলী (রা.)-এর এক অপূর্ব বাণী—
"মানুষের মনের মধ্যে এমনভাবে নিজের জন্য জায়গা করে নাও—যেন তুমি মরে গেলে তারা তোমার জন্য দোয়া করে, আর বেঁচে থাকলে তোমাকে ভালোবাসে।"
কী অতুলনীয় সৌন্দর্য! কী গভীর জীবনদর্শন! আর তা এসেছে সেই মহাপুরুষের মুখ নিসৃত হয়ে, যাঁকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং বলেছেন—
“আমি জ্ঞানের শহর, আর আলী তার দরজা।” (তিরমিজি)
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
মানুষের মনের মধ্যে জায়গা করে নেবো কীভাবে?
কেমন কাজ করলে মানুষ ভালোবাসবে? কী করলে মৃত্যুর পর কেউ আমার জন্য দোয়া করবে? মনোবিজ্ঞানে বলা হয়—মানুষের হৃদয় জয় করতে চাইলে ‘গুড ওয়ার্ক’ বা ‘সৎ কাজ’ করতে হবে। সৎকর্মের মধ্যেই আছে হৃদয়ের চাবিকাঠি। মানুষ যার উপকার পায়, তাকে ভালোবাসে; এবং ভালোবাসার স্মৃতি মানুষের মৃত্যুর পরও দোয়া হয়ে ফিরে আসে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন জাগে—
সৎকর্ম তো অসংখ্য! সঙ্গা ও প্রকারে। এতো এতো কাজের ভিড়ে কোন কাজে সবচেয়ে বেশি জোর দেবো? আমার বেসিক ফোকাস কোন কর্মে গিয়ে নিবদ্ধ হবে?
(একটি ব্যক্তিগত কথা—আমি যখনই কোনো স্মৃতিকথা, গদ্য বা দিনলিপি লিখতে বসি, শুরুর মুহূর্তে কোন ধারণাই থাকেনা আমি কী লিখবো। যেন শব্দরা আমার হাত ধরে পথ দেখায়। দুই লাইন লিখি, মন তখন আরো দুই লাইন এগিয়ে দেয়। ভাবনা তার নিজের ঢঙে বয়ে চলে—নিবিড়, নিরলস। এই লেখাটিও শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ শূন্য করোটি নিয়ে।)
যখন এই পর্যন্ত লিখি , তখন যেন মনে এক অদৃশ্য উত্তর আলতো করে ধরা দিল। রাসূলে কারীম (সা.) -এর একটি হাদীস হঠাৎ করেই মনের দেওয়ালে ভেসে উঠল—
"صِلْ مَنْ قَطَعَكَ، وَاعْفُ عَمَّنْ ظَلَمَكَ، وَأَحْسِنْ إِلَى مَنْ أَسَاءَ إِلَيْكَ"
(আদবুল মুফরদ, হাদীস ৪৫)
অর্থ—
“যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, তুমি তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করো। যে তোমার ওপর জুলুম করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা করো। যে তোমার প্রতি কষ্ট দিয়েছে, তার সাথে তুমি উত্তম ব্যবহার করো।”
দেখুন—এখানেই মানুষের হৃদয় জয় করার প্রশিক্ষণ। এটা কেবল মনোবিজ্ঞান নয়—এটা চরিত্র নির্মাণ, আত্মশুদ্ধির অনুশীলন, নৈতিকতার সর্বোচ্চ পাঠশালা।
কিন্তু বাস্তব জীবন এত সহজ নয়। সম্পর্ক ভেঙে গেলে মন কষ্ট পায়, ক্ষমা করতে কষ্ট হয়, অন্যায়ের জবাবে নরম থাকা আরো কঠিন। তবু মানুষ তার ভেতরেই তো পরাজিত হয়—যখন নিজের ক্রোধ, ক্ষোভ ও অহংকারকে জয় করতে পারে না। তাই প্রকৃত হৃদয় জয় শুরু হয় নিজের সঙ্গে যুদ্ধ জিতে নেওয়ার মাধ্যমে।
আমরা কেউ কেউ ভাবি—সাফল্য মানেই বড় পদ, বড় নাম, বড় পরিচয়। কিন্তু এই ছোট ঘর, এই নীরব পোস্টার—এগুলো যেন মনে করিয়ে দেয়, সাফল্যের আসল মানদণ্ড অন্য জায়গায়। মুখে হাসি এনে দেওয়ার মতো একটি সৎব্যবহার, ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের সুতো জোড়া লাগানো, অন্যের জীবন একটু আলোকিত করার প্রচেষ্টা—এসবের দাম কাগজে লেখা সনদ, সার্টিফিকেট এর চেয়ে অনেক বেশি।
উপসংহার
পেস্টুনের সেই নিঃশব্দ বাণী আমাকে যেন নতুন পথ দেখালো। মানুষের মন জয় করা বড় কঠিন নয়—তবে এর শুরু হয় নিজের উপর বিজয় থেকে। নিজের রাগকে থামানো, ক্ষমাকে প্রাধান্য দেওয়া, সম্পর্কের ছিন্ন সুতো আবার জোড়া লাগানো— এগুলোই মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়। আর যখন হৃদয়ের দরজা খুলে যায়, তখন মানুষ জীবদ্দশায় ভালোবাসা পায়, মৃত্যুর পর দোয়া পায়— আর তার অস্তিত্ব হয়ে ওঠে স্মৃতির ভেতর বেহেশতির এক সুগন্ধ।
সেই মুহূর্তে মনে হলো—
হয়তো কোনো উপাধি, কিংবা সাফল্য নয়—
মানুষের হৃদয়ে স্থান পাওয়াই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।
_____________________________________________
দিনলিপি
উনিশ, এগারো, পঁচিশ
বুধবার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।