জুলাইয়ের আকাশটা সেদিন ছিল অদ্ভুত ভারী। মেঘের রঙ যেন কালো নয়, বরং রক্তের মতো গাঢ় লাল হয়ে ঝুলছিল মাথার ওপরে। আমি তখন ষোল বছরের এক যুবক, ক্লাস নাইন -এ পড়ি। শহরের অলিগলিতে হেঁটে বেড়াই, কিন্তু চারপাশে অস্বাভাবিক এক অস্থিরতা। দোকানিরা চুপচাপ, চায়ের দোকানে রাজনীতি ছাড়া আর কোনো আলাপ নেই, আর স্কুলের সহপাঠীরা বইয়ের অক্ষর ভুলে আন্দোলনের স্লোগান আওড়ায়।
ভাইয়া তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। রাতে বাড়ি ফিরে চুপচাপ বসে থাকে। মা বারবার জিজ্ঞেস করেন, “তুই রাস্তায় যাচ্ছিস না তো?” ভাইয়া শুধু হেসে বলে, “ইতিহাসের ডাক এলে ঘরে বসে থাকা যায় না মা।” আমি পাশে বসে শুনি, কিছুই বলি না। কিন্তু বুকের ভেতর কেমন ঝড় ওঠে।
সবকিছুর শুরু হয়েছিল চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে। আমাদের প্রজন্ম ভাবতে শুরু করেছিল—সমতার অধিকার কি কেবল বইয়ের পাতায় লেখা? কেন যোগ্যরা বঞ্চিত হবে? অথচ সরকার এ দাবিকে শুনল না, বরং কঠোর হাতে দমন করতে চাইল।
এতে ছাত্রজনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। রাস্তায় বের হলো হাজারো তরুণ-তরুণী। আমার ছোট্ট শহরও তখন আন্দোলনের ঢেউয়ে কেঁপে উঠছে।
আমি প্রথমবার রাস্তায় নামি ১৫ জুলাই। সেদিন আমার হাতে ছিল সাদা কাগজে কালো অক্ষরে লেখা—
“ন্যায় চাই, সমতা চাই।”
ভোরের আলোয় মনে হচ্ছিল আমরা কেবল ছাত্র নয়, আমরা যেন ইতিহাসের এক একজন সূর্য সন্তান। চারপাশে যখন স্লোগান উঠছিল—
“তারুণ্যের কণ্ঠে জুলাই জাগরণ!”
তখন আমার বুক ধকধক করছিল, যেন নিজের ভেতরেই নতুন কেউ জন্ম নিচ্ছে।
কিন্তু আনন্দের সঙ্গে ভয়ও ছিল। পুলিশের টহল গাড়ি পাশ দিয়ে গেলে সবাই কেঁপে উঠত। রাস্তায় সশস্ত্র বাহিনীর কড়া নজরদারি। শহরের বাতাসে গুলির গন্ধ মিশে ছিল আগেই। তবু তরুণরা থামেনি।
আমার মনে আছে, এক বৃদ্ধ লোক হাত তুলে বলেছিলেন—“বাবারা, ভয় পাস না। আমরা ’৭১-এ ভয় পাইনি, তোমরাও পারবে।” সেই কণ্ঠ যেন আমাদের ভিতর থেকে সাহস টেনে বের করে আনল।
১৬ জুলাই ভোরে ভাইয়া আমাকে নিয়ে গেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। সেখানে সমুদ্রের মতো মানুষের ভিড়। ছেলেমেয়ে, বৃদ্ধ-যুবক—সবাই একসাথে স্লোগান দিচ্ছে। হাতে পতাকা, পোস্টার, ব্যানার। কারও চোখে জল, কারও মুখে হাসি, আর কারও বুকভরা প্রতিজ্ঞা।
হঠাৎ বজ্রপাতের মতো শব্দ—গুলির আওয়াজ!
আমি চমকে উঠি। চোখের সামনে পড়ে যায় একজন তরুণ। তার শার্ট লাল হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই। চারপাশে চিৎকার, কান্না, দৌড়। আমার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সেই প্রথম শহীদ—আবু সাঈদ।
মুহূর্তেই বুঝলাম, এই আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কার নয়, এটি স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের আগুনে রূপ নিয়েছে।
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে ঘুমাতে পারিনি। জানালার বাইরে গুলি চলছিল, সাইরেন বাজছিল, শহর থরথর করে কাঁপছিল। আমি ডায়েরি খুলে লিখেছিলাম—
“আজ আমি ইতিহাসের জন্ম হতে দেখলাম। যদি রক্ত ঝরতেই হয়, তবে এই রক্ত বৃথা যাবে না।”
১৬ জুলাইয়ের সেই প্রথম রক্তপাত যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে আবু সাঈদের লাশ রক্তমাখা মাটিতে পড়ে থাকতেই হাজারো তরুণ বুঝে গেল—এই আন্দোলন আর পিছিয়ে যাওয়ার নয়।
পরদিন সকালে শহর যেন ঘুম থেকে উঠল না। রাস্তায় নেই চায়ের দোকানের কোলাহল, নেই রিকশার ঘণ্টা। শহরের বাতাস ভারী হয়ে আছে শোক আর ক্ষোভে। পোস্টার ছেঁড়া পড়ে আছে রাস্তায়, যেন প্রতিটি কাগজ চিৎকার করছে—
“আমরা ন্যায় চাই, মুক্তি চাই!”
কিন্তু সরকার ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে আন্দোলন থামিয়ে দেবে। ফলে ঢাকার প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি রাস্তায় পুলিশ, র্যাব আর সশস্ত্র বাহিনীর গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত। রাতে হঠাৎ গুলি ছোড়া হতো, যাতে মানুষ আতঙ্কে ঘরে বন্দি থাকে।
আমি তখনও কিশোর, তবুও সেই শব্দে বুক কেঁপে উঠত। মনে হতো—আকাশ কি এভাবে কাঁপতে পারে?
১৮ জুলাইয়ের দিনটা আমি কখনো ভুলতে পারব না। ভাইয়ার সাথে গিয়েছিলাম শোভাযাত্রায়। চারপাশে হাজারো তরুণ একসাথে গাইছিল—
“তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।”
হঠাৎ করেই পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাল। প্রথমে টিয়ারশেল, তারপর সরাসরি গুলি। মানুষ ছুটতে লাগল। আমি ভাইয়ার হাত শক্ত করে ধরেছিলাম, কিন্তু ধোঁয়ার ভেতর একসময় হাতটা ফসকে গেল।
আমি দৌড়ে একটা দোকানের ভেতর ঢুকে পড়লাম। কাশতে কাশতে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলাম—এক তরুণী পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছে, পিছু হটেনি। তার বুক ভেদ করে গুলি চলে গেল, পতাকাটা লাল হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। আমি জীবনে প্রথমবার বুক ফেটে কাঁদলাম।
সেই মেয়েটির নাম পরে শুনেছিলাম—তন্বী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। তার ছবিটা পরদিন সংবাদপত্রে বের হয়েছিল। আমার ডায়েরিতে লিখেছিলাম—
“তন্বীর রক্ত শুধু পতাকাকে রাঙায়নি, আমাদের আত্মাকেও রাঙিয়ে দিয়েছে।”
২০ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠল। সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল। ফোনে খবর পাওয়া যায় না, ফেসবুক-টুইটার অন্ধকারে তলিয়ে গেল। কেবল গুজব ভেসে আসে—“আজ ৫০ জন মারা গেছে”, “ঢাকায় রক্তের নদী বয়ে যাচ্ছে”, “চট্টগ্রামে ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করেছে”…
আমরা কিশোরেরা রাস্তায় যেতে ভয় পেতাম, কিন্তু ঘরে বসেও শান্তি ছিল না। রাতের বেলা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে চিৎকার ভেসে আসত—কেউ হয়তো গুলিবিদ্ধ, কেউ হয়তো ধরা পড়ছে।
আমার মা প্রতিরাতে দরজায় কাঁপতে কাঁপতে দোয়া পড়তেন—“হে আল্লাহ, আমার ছেলেদের রক্ষা করো।” কিন্তু বাবার কণ্ঠে ক্ষোভ—“আর কতদিন? আর কত রক্ত ঝরবে?”
ভয়ের মাঝেও তারুণ্যের সাহস থামানো যায়নি। আমি দেখেছি—যেসব ভাইয়েরা লাশ কাঁধে নিয়েছে, তারাই আবার স্লোগান দিয়েছে। যেসব বোনেরা হাসপাতালের করিডরে লাশ চিনতে গিয়ে ভেঙে পড়েছে, তারাই আবার হাতে মোমবাতি জ্বালিয়েছে।
এক রাতে, আমাদের শহরের কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে আমি দেখেছিলাম—ডজনখানেক তরুণ মশাল মিছিল করছে। চারপাশে অন্ধকার, কেবল আগুনের আলোয় তাদের মুখ জ্বলজ্বল করছে। স্লোগান উঠছিল—
“শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না!”
আগামীকালগুলো যেন শহরের প্রতিটি দেওয়ালে, প্রতিটি গলিতে শোনা যাচ্ছিল—স্বাধীনতার ডাক। ৫ আগস্টের ভোর এল আর শহর যেন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
রাত জেগে অনেকেই রাস্তায় ছিল। আমরা জানতাম—এটা শুধু আন্দোলন নয়, এটা ছিল এক প্রজন্মের শপথ। আমার ভাইয়া, সেদিনও ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। তার চোখে ছিল অগ্নি, মুখে স্লোগান—
“আমরা রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারকে চিরতরে বিদায় জানাচ্ছি!”
আমি পাশ থেকে দেখছি, হাজার হাজার তরুণ-তরুণী একই রকম দৃঢ়তায়। রাস্তায় পতাকা উড়ছে, হাতে ব্যানার, মুখে প্রতিজ্ঞা। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ শ্লোগান দিচ্ছে—সব মিলিয়ে যেন শহর এক বিশাল নদী হয়ে গিয়েছে, যার স্রোত থামানো যায় না।
আমি শহীদদের কথা মনে করছিলাম—আবু সাঈদ, শাহীন, তন্বী, আর আরও অনেক। আমি দেখেছি তাদের লাশের কাছে মানুষ মোমবাতি জ্বালাচ্ছে, চুপচাপ দাঁড়িয়ে শোক করছে। কেউ কেউ কাঁদছে, কেউ আবার হাত তুলে স্লোগান দিচ্ছে।
সেদিন আমি শপথ নিলাম—যতদিন কলম হাতে থাকবে, শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না। এই রক্ত আমাদের স্বাধীনতার আলো হয়ে উঠবে।
নুসরাত তাবাসসুম, উমামা ফাতেমাদের মুখমণ্ডল চোখে ভেসে ওঠে। তাদের সাহস, ধৈর্য এবং নেতৃত্ব আমাদের শিক্ষার এক মহান উদাহরণ। তারা শুধু রাস্তায় দাঁড়ায়নি, আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছে, বিপদে বিপন্নদের আশ্রয় দিয়েছে। আমাদের প্রজন্ম শিখেছে—স্বাধীনতার সংগ্রামে নারীর ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভোরের আলো শহরের প্রতিটি রাস্তা ভেদ করছে। ৫ আগস্টের বিজয় ভোরে বাতাসে লেগে থাকা আগুনের গন্ধ এখনও বাকি। শহর থেমে নেই, মানুষ ধীরে ধীরে রাস্তায় নেমেছে। তবে চোখে আনন্দের সঙ্গে মিশে আছে করুণ স্মৃতি—যা কখনও ভুলা যাবে না।
আমি শহীদ মিনারের দিকে হাঁটছি। চারপাশে হাজার হাজার মানুষ। হাতে ফুল, হাতে মোমবাতি। আবু সাঈদ, শাহীন, তন্বী—নামগুলো বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। কেউ কেউ কান্না থামাতে পারছে না। একজন বৃদ্ধ বললেন—“এরা শুধু মৃত নয়, এরা আমাদের মুক্তির পতাকা।”
আমি বুঝলাম, তাদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
আমাদের প্রজন্মের শপথ এখন কেবল বিজয় উদযাপন নয়। আমরা শপথ নিচ্ছি—
যে রক্ত ঝরেছে, তা বৃথা যাবে না। যে শহীদরা প্রাণ দিয়েছে, তাদের স্বপ্ন আমরা জীবিত রাখব।
শহরের সব কলেজ-স্কুলের ছাত্ররা এক কণ্ঠে আওয়াজ তুলছে—
“স্বৈরাচার আর অন্যায়ের হাত থেকে আমরা মুক্তি দেব, কলম আর কণ্ঠ দিয়ে।”
আমি জানি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই গল্প পড়বে। তারা জানতে পারবে কিভাবে একটি দেশের যুবক, যুবতী স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ইতিহাস লিখেছে। তারা জানবে, যে আন্দোলনে রক্ত ঝরেছে, সেই রক্তই স্বাধীনতার আলো হয়ে উঠেছে।
আমি চাই, তারা হেরে না যাক, থেমে না যাক। তারা বুঝবে, প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি কলম—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
আজ আমার ডায়েরি বন্ধ করছি না। বরং কলম উঁচু রেখে লিখছি—
“তারুণ্যের কণ্ঠে জুলাই জাগরণ চিরকাল বেঁচে থাকবে। আমাদের শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। আমরা সেই আগুনকে ভবিষ্যতের জন্য জীবিত রাখব।”
রাস্তায় বাতাসে স্লোগান বাজছে—
“তারুণ্যের কণ্ঠে জুলাই জাগরণ!”
এবার আর কেউ থামাতে পারবে না। শহর, দেশ, এবং আমাদের হৃদয় নতুনভাবে শ্বাস নেবে। এ ভোরই হবে আমাদের, এ রক্তই হবে আমাদের গর্ব, আর এই স্মৃতিই হবে চিরন্তন।
লেখক: মুহাম্মদ সালমান
বিবিএ (অনার্স)-১ম বর্ষ,ব্যবস্থাপনা বিভাগ
শিক্ষার্থী : চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।